বঙ্গবন্ধুর রচনা পাঠে মানসিক শক্তি

ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২০ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বঙ্গবন্ধুর রচনা পাঠে মানসিক শক্তি

অমিত গোস্বামী ১:৩২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৪, ২০২০

print
বঙ্গবন্ধুর রচনা পাঠে মানসিক শক্তি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী আজ রোববার রাত নয়টায় নয় মিনিটের জন্যে ঘরের আলো বন্ধ করে ব্যালকনিতে বা বারান্দায় আলো, সে প্রদীপ বা মোমবাতি বা টর্চ বা মোবাইলের ফ্ল্যাশ যাই হোক, জ্বালাতে দেশবাসীকে অনুরোধ করেছেন। দেশের অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে অভূতপূর্ব প্রস্তাব। স্বাভাবিক নিয়মে সমর্থন ও সমালোচনা চলছে। দিন দুয়েক আগে ভারতের জনৈক মনোবিজ্ঞানী এক আলোচনায় বলেছিলেন, গৃহবন্দি মানুষের এখন একটা ‘চিয়ার আপ’ দরকার। বিশ্বের এক চতুর্থাংশ মানুষ এখন লকডাউনের কবলে।

প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। ভারতেই শুধু ১৩০ কোটি। বাংলাদেশ ১৮ কোটি। এছাড়া ব্রিটেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, জর্ডান, আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম লকডাউনের কবলে। সৌদি আরব তার রাজধানী ও দুইটি পবিত্র শহরে লকডাউন ঘোষণা করেছে। আমেরিকা, জার্মানি, মালয়েশিয়া, ইসরাইল ও অস্ট্রেলিয়া আংশিক লকডাউন কার্যকর করছে। এই লকডাউনে দেশের লোকেরা কেউ ভালো নেই। তাদের মানসিক বৈকল্য কাটাতে ‘চিয়ার আপ’ দরকার। কী ধরনের ‘চিয়ার আপ’? তিনি বললেন, যেমন কোনদিন সকাল ন’টায় দেশের সব চ্যানেলে রেডিওতে জাতীয় সঙ্গীত প্রচারিত হতে পারে, দেশবাসীকে অনুরোধ করা যেতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী সেই ডাক দিলেন একটু অন্যভাবে। ঘরে ঘরে ডাক পাঠালেনÑ ‘দীপালিকায় জ্বালাও আলো,/ জ্বালাও আলো, আপন আলো, সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।’ পদ্ধতি ঠিক না ভুল, বলা মুশকিল। পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কিছু বলাই যায়। কিন্তু এই ভালো না থাকার সময়ে এটা মানুষকে কিছুটা জাগানোর প্রচেষ্টা। 

আসলে, ভালো নেই আমরা কেউই। আমি-আপনি। আর তারই ছাপ পড়ছে আমাদের রোজনামচায়। বিশ্বজুড়ে করোনা আতঙ্কের সঙ্গে লড়তে যোগ হয়েছে সোশ্যাল ডিসট্যান্স বা দূরে দূরে থাকার নিদান। আর এতেই ভয়ের হাত ধরেছে একাকিত্ব ও বিষাদ। মানুষ সিনেমা ভুলেছে, খেলা ভুলেছে, রাজনীতিও ভুলেছে। ভুলেছে তার নিজস্ব পরিসর। একমুখী করোনা চিন্তায় জীবন কাটাতে কাটাতে ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী মানসিক চাপ। সবাই সারাক্ষণ নিজের প্রতি কড়া নজর রাখছেন, এই বুঝি একটু নাক কি চোখ চুলকাল, কি একটা হাঁচি এল বা শুরু হল খুসখুসে কাশি, গা কি একটু গরম লাগছে- এসব মাথার মধ্যে ঘুরছে। এ তো অনিশ্চয়তার উদ্বেগ। এই ধরনের স্ট্রেস যে সকলকেই রাতারাতি অসুস্থ করে ফেলবে তা নয়। তবে এই স্ট্রেস দিনের পর দিন চলতে থাকলে তা ক্রনিক মানসিক অসুখ সৃষ্টি করবে। মানসিক চাপ বেড়ে গেলে, শরীরে ক্ষতিকর রাসায়নিকের রমরমা এতই হয় যে তার দাপটে প্রতিরোধ যোদ্ধাটি চলে যায় ব্যাকফুটে। সবে মিলে প্রতিরোধ ক্ষমতার অবনতি হয়। এই উদ্বেগের উৎস হচ্ছে অজানা শঙ্কা।

সাধারণ মানুষ কিন্তু এই ভাইরাসের চরিত্র কীভাবে বদলাচ্ছে বা এটির রাসায়নিক উপাদান নিয়ে অত চিন্তিত নন, তাদের চিন্তার দিকগুলি খুব স্পষ্ট। এটা এমন একটি অসুখ যাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তা অজানা। তাই, আমি ও পরিজনরা নিজে সেই অসুখের শিকার হব কিনা, এর কোনও ওষুধ বেরুলো কিনা, মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা কত, এগুলোই মূল ভাবনা। যা চাপ ফেলছে মনে। তাই ঘনঘন টিভি চালিয়ে বা ইন্টারনেটে চোখ রেখে মৃতের সংখ্যা, আক্রান্তের সংখ্যা জানার ইচ্ছে, কোথাও সংবাদপত্রে চোখ রেখে খুঁটিনাটি জানতে চাওয়া, এগুলো মানসিক উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ। এই যে জিনিসপত্র কিনে ফেলার হিড়িক, খাবার-দাবার মজুত করে রাখার প্রবণতা, এগুলোও ওই অনিশ্চয়তার উদ্বেগ থেকেই হয়। আজ এক আলোচনায় এই সকল প্রসঙ্গ উঠে এল। কথা প্রসঙ্গে আমি বললাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। ৫৪ বছর বয়সের জীবনে বঙ্গবন্ধু ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন, যা তার মোট জীবনের সিকিভাগ। তার জীবনের শেষ কারাগারবাস পাকিস্তানের মিয়ানালি কারাগারে একটি কনডেম সেলের মধ্যে, এখানে তিনি ছিলেন ২৮৮ দিন।

তখন কি তার মানসিক চাপ আসেনি? এসেছিল, সে কথা তিনি লিখেছেন তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে যা তার বন্দিজীবনের গল্প, তার একাকিত্বের গল্প।

তিনিও মাঝেমধ্যেই তীব্র ভয় পেয়েছেন, নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, ‘আর কত অত্যাচারিত হব আমি? আমি হাল ছেড়ে দিব?’। শেখ মুজিবকে পুরো সময়জুড়েই রাখা হয়েছিল একদম বিচ্ছিন্ন করে আলাদা কক্ষে, একাকিত্বের যন্ত্রণায় তিনি বারবার ভেঙ্গে পড়েন। অসহায়ের মত তিনি লেখেন, ‘আমি একা থাকি, আমার সাথে কাহাকেও মিশতে দেয়া হয় না। একাকী সময় কাটানো যে কত কষ্টকর তাহা যাহারা ভুক্তভোগী নন বুঝতে পারবেন না। ...ফুলের বাগানটিকে নতুন করে সাজাইয়া গোছাইয়া করতে শুরু করেছি। বেশ সুন্দর হয়েছে। আজকাল সকলেই প্রশংসা করে। নতুন জীবন পেয়েছে ফুলের গাছগুলি।’ (৬ জুন ১৯৬৬)।

এই জেলজীবনে বঙ্গবন্ধু নিত্যসঙ্গী করে নিলেন বইকে। সেই সঙ্গে খবরের কাগজ পড়া, সময় কাটানোর জন্য কখনও কখনও নিজেই করেছেন নিজের রান্না, কখনওবা করেছেন বাগান পরিচর্যা। সুন্দরের পূজারি বঙ্গবন্ধু তো ফুলই ফোটাবেন। কারাগারের বাগানেও ফোটালেন ভালোবাসার ফুল। বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য থেকে উদ্ধৃত করছি-

‘একটা মাত্র বন্ধু ফুলের বাগান। ওকে আমি ভালো বাসতে আরম্ভ করেছি। যাদের যাদের ভালোবাসি ও স্নেহ করি তারা তো কাছে থেকেও অনেক দূরে। ইচ্ছে করলে তো দেখাও পাওয়া যায় না। তাই তাদের কথা বারবার মনে পড়লেও মনেই রাখতে হয়। স্ত্রী ছেলে মেয়েদের সাথে তো দেখা করারও উপায় নাই। শুধু মনে মনে তাদের মঙ্গল কামনা করা ছাড়া উপায় কি!’ (পৃষ্ঠা ১২৩)।

একাকিত্বের বেদনাকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাকে একবাক্যে অনন্য বলা যায়। জেল জীবনের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত বিষয় হচ্ছে, স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। তৎকালে রাজবন্দিদের পনের দিনে একবার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হত। তাও মাত্র বিশ মিনিটের জন্য। স্বল্প সময়ের এই সাক্ষাৎ উল্টো ব্যথাতুর করে তুলত বঙ্গবন্ধুকে। তাই তো তার কাছ থেকে আমরা অভিমানভরা কণ্ঠে শুনতে পাই- ‘আরম্ভ করতেই ২০ মিনিট কেটে যায়। নিষ্ঠুর কর্মচারীরা বোঝে না যে স্ত্রীর সাথে দেখা হলে আর কিছু না হউক একটা চুমু দিতে অনেকেরই ইচ্ছে হয়, কিন্তু উপায় কি? আমরা তো পশ্চিমা সভ্যতায় মানুষ হই নাই। তারা তো চুমুটাকে দোষণীয় মনে করে না। স্ত্রীর সাথে স্বামীর অনেক কথা থাকে। কিন্তু বলার উপায় নাই। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো স্ত্রীকে নিষেধ করে দেই যেন না আসে।’

মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ একাকিত্ব হলো নিজেকেও ভালো না লাগা’। জার্মান সাইকায়াট্রিস্ট ফ্রম্ম রিচম্যানের মতে, নিঃসঙ্গতা একটি আবেগের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা। অসুখী, বিষণœতা, উদ্বেগ, শূন্যতা ও একঘেয়েমি অনুভূতি। বঙ্গবন্ধু কি এই তত্ত্বকথা জানতেন না? অবশ্যই জানতেন। কিন্তু পরোয়া করেননি। আঁকড়ে ধরেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। জাপটে ধরেছিলেন নজরুলকে। জেলের ঘানি টানতে টানতে যখন তার নাভিশ্বাস উঠার অবস্থা তখন শক্তি সঞ্চয়ে উচ্চারণ করেছেন- ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।’ একবার নয়, একাধিকবার রবি ঠাকুরের এই পঙ্ক্তিগুলো লিপিবদ্ধ আছে কারাগারের রোজনামচায়। পাকিস্তানের মিয়ানইল কারাগারে শেষ কারাবাসের সময় তিনি নিশ্চিত ছিলেন মৃত্যু বা ফাঁসি তার ভবিতব্য। কিন্তু তিনি তবুও মাথা নোয়াননি। দীপ্ত কণ্ঠে সেলজুড়ে আবৃত্তি করতেন- মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত। যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ, ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত।

ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, ‘আমার জীবনই আমার বাণী’। একই কথা প্রযোজ্য বাঙালির জাতির পিতা প্রসঙ্গে। আজ পৃথিবীর এই অভূতপূর্ব সময়ে মানুষ ক্রমাগত নিজের মানসিক ধৈর্য্য হারাচ্ছেন, অসুস্থ হয়ে পড়ছেন মানসিকভাবে তখন তো বাঙালির হাতের সামনে আছে বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি অমর গ্রন্থ। যা পড়লে বোঝা যায় যে অনিত্য এই জগতে আমাদের করোনাভীতি একটি অতি তুচ্ছ বিষয় যা শুধু সাবধানতা মেনে চললে নিরাময় সম্ভব, কিন্তু যে মানুষকে নিয়ে আমরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি অকৃপণভাবে সেই মানুষের কাহিনী তো আমাকে অটল শক্তি জোগাবে।

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের কথা এপারের হিন্দু বাঙালিরা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্মরণ করেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে বাঙালি আশ্রয় নেয় জীবনের যে কোনো লগ্নে, কিন্তু পৃথিবীর এই সংকটকালে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’ যে মানসিক উত্তরণের কত বড় সোপান তা নিয়ে গবেষণা হয়ত ভবিষ্যতে মনোবিজ্ঞানের বিষয় হবে, কিন্তু এই বই তিন যে কোনো মানুষের মানসিক শক্তি তীব্র করে সংকটের কল্পনা থেকে নতুন আলোর দিকে নিয়ে যাবে তা নিশ্চিত বলা যায়।

অমিত গোস্বামী : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক
agoswami441@gmail.com