সব মানুষের বঙ্গবন্ধু

ঢাকা, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২০ | ২৩ চৈত্র ১৪২৬

সব মানুষের বঙ্গবন্ধু

রহিম আব্দুর রহিম ৬:৫২ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৫, ২০২০

print
সব মানুষের বঙ্গবন্ধু

পাখ-পাখালির কুহুতান, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, হালধরা মাঝির ভাটিয়ালি সুর, প্রত্যন্ত গ্রামের বুক চিরে প্রবাহিত মধুমতির শাখা, বাইগার নদী। এই নদীর তীর ঘেঁষে সাজানো গোছানো গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। আজ থেকে শত বছর আগের কথা। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ (বঙ্গাব্দ ১৩২৭-এর ২০ চৈত্র) মঙ্গলবার শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়রা খাতুনের ঘরে জন্ম নিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাবা মায়ের আদরের ‘খোকা’ শৈশব থেকেই দুরন্ত, ডানপিটে, নদীতে লাফ-ঝাঁপ, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা, ধুলো কাদায় মাখা-মাখি, বাবুই পাখির বাসা খোঁজা, মাছরাঙার মাছ শিকার অবলোকন, দোয়েল পাখির সুর শোনাই ছিল খোকার শৈশবের বড় নেশা। গ্রামের সব শিশুদের সঙ্গে দলবেঁধে ঘুরে ফিরে প্রকৃতিকে সে আপন করে নেন। শালিক ও ময়না পাখির ছানা ধরে এনে তাদের সঙ্গে কথা বলা, শিষ দেওয়া, বানর ও কুকুর পোষাই ছিল দুরন্ত ডানপিটে টুঙ্গিপাড়ার এই প্রকৃতিপ্রেমী খোকার।

খোকাদের বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে একটি সরু খাল চলে গেছে মধুমতি ও বাইগার নদীর সংযোগ লক্ষ্য করে। এই খালের পাড়ে বাবা লুৎফর রহমানের ‘কাচারিঘর’। আর এই কাচারিঘরের পাশেই ছিল খোকার মাস্টার, পণ্ডিত ও মৌলভী সাহেবদের থাকার ঘর। এরাই গৃহশিক্ষক হিসেবে খোকাকে আরবি, বাংলা, ইংরেজি ও অংক শেখাতেন। শেখ মুজিবের শৈশবকালের কর্মকা-ই প্রমাণ করে তিনি ছিলেন মাটি মানুষের প্রিয়জন, পশু-পাখি, গৃহপালিত প্রাণীদের পরম বন্ধু। তার পশুপ্রেম প্রমাণ করে সেই অমর বাণী, ‘যেজন সেবিছে পশু, সেজন সেবেছে ঈশ্বর।’

শেখ মুজিব ছোট থেকেই ছিলেন যেমন দুরন্ত, চঞ্চল তেমনি দুষ্টুমিতে পরিপূর্ণ। তবে তিনি কোনোদিনই তার শিক্ষকদের অবাধ্য হননি। শিক্ষকদের তিনি প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতেন, কখনো মাথা উঁচু করে কথা বলেননি। নিচু হয়ে বিনম্র ভাষায় স্যারদের সঙ্গে কথা বলতেন। একদিনের ঘটনা। খোকা পড়া শেখেনি বলে তার শিক্ষক কষে এক থাপ্পড় দিয়েছিলেন। এতে খোকা মাটিতে পড়ে যায়। এই শিক্ষক তাদের বাড়ি থেকে অন্য জায়গায় যেদিন চলে যান। সেই দিন খোকা নামের আদর্শ শিশুটি ওই শিক্ষকের বিছানাপত্র ও প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় নিজে মাথায় বহন করে তিন কিলোমিটার দূরে ওই শিক্ষকের নতুন কর্মস্থলে দিয়ে আসেন। আসার পথে শিক্ষকের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদও নেন। খোকা ছোট থেকেই নামাজ পড়েছেন, রেখেছেন রোজা, আবার গ্রামের হিন্দু পরিবারের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করেছেন, তাদের পূজা-পার্বণে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে প্রসাদ নাড়ু খেতে ভোলেনি। ফলে তিনি অসাম্পদায়িক চেতনায় ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। তিনি কখনই বাবা-মার অবাধ্য হয়নি। বাবা-মা যা বলেছেন, তাই তিনি শুনেছেন, করেছেন।

ছোটকালেই তিনি ব্রতচারী নৃত্য শেখেন। যে নৃত্য মানুষকে দেশপ্রেমী করে গড়ে তোলে। সন্ধ্যা নামলেই তিনি পাড়ার সব ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে গ্রামের পালাগান, যাত্রাগান শুনতে যেতেন। লুকিয়ে আবার ঘরেও আসতেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি, ফুটবল খেলায় পারদর্শী ছিলেন। গ্রাম থেকে মধুমতি নদী পার হয়ে চিতলমারী ও মোল্লারহাটে যেতেন ফুটবল খেলতে। এতে করে শেখ মুজিবুর রহমানের বাবা-মা খুবই খুশি হতেন, তাকে অনুপ্রেরণাও দিতেন।

বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় শেখ মুজিবুর রহমান শৈশব থেকেই ভালো ফুটবল খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। মাঠে ময়দানে খেলাধুলা করায় মানুষের সঙ্গে তার পরম বন্ধুত্ব এবং দেশপ্রেমিক হওয়ার আদর্শিক শিক্ষা ও প্রকৃতিগত শিক্ষায় শিক্ষিত হন। খেলাধুলা যে শুধু শারীরিক যোগ্যতার পাথেয় তা নয়, মাটি মানুষের প্রতি পরম প্রেমবোধ জাগিয়ে তোলে, তার অকাট্য প্রমাণ শেখ মুজিব। যে কারণে তিনি বাঙালির আদি সংস্কৃতি রক্ষায় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিল্পকলা একাডেমির কর্মকাণ্ডে বাঙালির আদি সংস্কৃতি লালন-পালন এবং সংরক্ষণের নীতিমালা সংযুক্ত করে যান।

সংস্কৃতিমুখী করে যান। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি বায়তুল মোকাররম মসজিদ জাতীয়করণ এর সম্প্রসারণ করেন। তিনিই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন ইসলামি ফাউন্ডেশন। তাবলীগ জামায়াতের জন্য তিনি কাকরাইল মসজিদ নির্ধারণ এবং বিশ্ব ইজতেমার জন্য টঙ্গীতে জায়গা নির্ধারণ করেন।

শেখ মুজিব গ্রামের শিশু-কিশোরদের সঙ্গে দলবেঁধে পথচলায় হয়ে ওঠেছিলেন শৈশবের জনপ্রিয় মানুষ। তিনি অন্যের কষ্টে ব্যথিত হতেন। একবার দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিল। কৃষি মাঠে ভালো ফসল হয়নি। শেখ মুজিব তখন গোপালগঞ্জে থাকেন। গ্রামের বাড়িতে গেলেন বেড়াতে।

এলাকার মানুষ অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। চতুর্দিকে দুর্ভিক্ষ, মুজিব আর স্থির থাকতে পারলেন না। সেদিন বাড়িতে কেউ নেই। বাবা লুৎফর রহমান গেছেন পাটগাঁও পোস্ট অফিসে। ফিরতে অনেক দেরি হবে। এই সুযোগে তিনি গ্রামের লোকজনদের ডেকে নিজেদের গোলার ধান বিলিয়ে দেন। বাবা বাড়ি এসে সবকিছু জানলেন, শেখ মুজিবের ওপর মনে মনে ক্ষেপে গেলেন, কিন্তু কিছুই বললেন না। এতে করে প্রমাণ হয়, আদর্শ বাবা-মা’রাই পারেন একজন দেশদরদি মানবপ্রেমী মানুষ সৃষ্টি করতে। পরিবেশ, প্রতিবেশের বাস্তবতায় ব্রিটিশ পাকিস্তানের অত্যাচার, অনাচার, নিপীড়ন, নির্যাতনের হাত থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্তি দিতে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দেন- এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। শৈশবের খোকা হয়ে ওঠেন, ‘জাতির পিতা, অমর ইতিহাসে গ্রন্থিত হয় ‘বঙ্গবন্ধু’ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এই জাতির পিতার ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তার ৫২তম জন্মদিনে এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচেয়ে বড় ও পবিত্র কামনা কী?’ এই প্রশ্নের জবাবে, বঞ্চিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি’।

এরপর তিনি বেদনাবিধুর কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না, আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এদেশে মানুষের নিরাপত্তা নেই, অন্যের বেখেয়ালে যে কোন মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে, আমি জনগণের একজন, আমার জন্মদিনই কি আর মৃত্যুদিনই কী? আমার জনগণের জন্যই আমার জন্ম-মৃত্যু।’ তার এই বক্তব্যই প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু বিশাল হৃদয় ও মহৎ গুণ ও মনের অধিকারী ছিলেন, দেশের মানুষকে তিনি প্রচ- ভালোবাসতেন।

বঙ্গবন্ধুর ৫৪তম জন্মদিনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মনি সিংহ বলেছিলেন, ‘১৯৫১ সালে কারাগারে বসেই শেখ মুজিব বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরিকল্পনা করেছিলেন।’ স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে কুলাঙ্গাররা চেয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে। তা হয়নি, বরং পৃথিবীর ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের প্রতিটি সদস্য বিশাল জায়গায় স্থান পেয়েছেন।

রহিম আব্দুর রহিম : শিক্ষক, নাট্যকার ও শিশু সংগঠক