করোনা ভাইরাসে বাড়ছে উদ্বেগ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২০ | ২৩ চৈত্র ১৪২৬

করোনা ভাইরাসে বাড়ছে উদ্বেগ

মোহাম্মদ নজাবত আলী ৯:২৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০২০

print
করোনা ভাইরাসে বাড়ছে উদ্বেগ

ভয় ও আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। সত্যিই আমরা ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে আছি। এ ভয় শুধু শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা পৃথিবীর। কেননা মরণব্যাধি এ করোনা ভাইরাস গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে এ ভাইরাস ১৫০টির অধিক দেশে বিস্তার লাভ করেছে। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষ করোনা ভাইরাসের অক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরণ করেছে।

আমাদের ভয় আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না। আমরা ছাত্রজীবনে ভয়, আতঙ্ক ও রক্তপাতের ইতিহাস পড়েছি। চেঙ্গিস খান, হালাকু খানের বাগদাদসহ মানবসভ্যতার ধ্বংসের ইতিহাস পড়েছি। বাগদাদের রক্তের বন্যা দেখেছি। ঘরে ঘরে মানুষের কান্নার আওয়াজ শুনেছি। নদির খানের দিল্লি অভিযানের কথা জেনেছি। ভয়ে মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। নিকট ইতিহাস বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের আক্রমণের ইতিহাস পড়েছি। কিন্তু সেই যুদ্ধ ছিল সীমাবদ্ধ শুধু ইউরোপে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের বিস্তার ব্যাপক। এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশের অনেক দেশে ছড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়েছে। এ যেন এক মহামারি পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে চলেছে। করোনা এমন এক ভাইরাস যা স্থান, কাল, শত্রু-মিত্র, ধর্ম-বর্ণ কিছুই মানছে না। চীনের উহান প্রদেশ থেকে শুরু হয়ে আমেরিকা, ইতালি, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ পৃথিবীর বহু দেশে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রথম দিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনা ভাইরাসকে আমলে নেননি। উল্টো তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, এ রোগ এমন কিছু নয়, চলে যাবে। কিন্তু চলে যায়নি এ প্রাণঘাতী রোগ গোটা বিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে। বর্ষা বাদলে কালবৈশাখীতে মেঘের ডাক মাথায় পড়লে বলি বজ্রপাত, না পড়লে বলি মেঘের ডাক।

সত্যিই যখন করোনা ভাইরাসে আমেরিকা আক্রান্ত হলো তখন ট্রাম্প সাহেবের চৈতন্য হল। এটা মেঘের ডাক নয়, বজ্রপাত। এ ভাইরাসের ছোবল থেকে গোটা বিশ্ব যে দ্রুত বাঁচবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ এ ভাইরাসের ভ্যাকসিন টিকা বা ওষুধ এখনও তৈরি হয়নি। তবে গবেষকরা এ ভাইরাসের জেনেটিক কোডিং নিয়ে কাজ শুরু করেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য করোনা ভাইরাসের বিপদ কতটা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কয়েকজন করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে। যার সত্যতা স্বীকার করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করেছে। তবে আমাদের বাংলাদেশের আশার কথা, ব্যাধিটি এখনও বাংলাদেশে মহামারির রূপ নেয়নি। সারা বিশ্বে আক্রান্ত হয়েছেন কয়েক লাখ ব্যক্তি। মৃত্যুবরণ করেছেন কয়েক হাজার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভয়ের কোনো কারণ নেই। অতীতে ইবোলা, সোয়াইন ফ্লুসহ অন্যান্য ভাইরাসের চেয়ে করোনা ভাইরাসের মৃত্যুর হার খুব কম। গড়ে মৃত্যুর হার ০.৩ শতাংশ। তবে কিছু নিয়ম-কানুন বিধিবিধান মেনে চলাও সতর্কতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর কতগুলো লক্ষণ রয়েছে- সর্দি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, গলাব্যথাসহ সমস্ত শরীরে ব্যথা ইত্যাদি। এ লক্ষণগুলো অতি সাধারণ। শিশু ও বয়স্কদের এ ভাইরাসের প্রার্দুভাব বেশি, শুধু মাস্ক পরলেই চলবে না ঘনঘন মাস্ক পরিবর্তন করতে হবে। বহু লোকের সমাগম এড়িয়ে চলা, গা ঘেষাঘেষি ও করমর্দন কোলাকুলি না করা। খাদ্যদ্রব্যাদি যেমন ডিম, মাছ, মাংস ভালোভাবে সিদ্ধ করে রান্না করতে হবে। জীবাণু দূর করে এমন সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা। হাঁচি কাশিতে রুমাল বা টিস্যু দিয়ে মুখ ডাকা। সর্বোপরি সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা। এ নিয়মগুলো মেনে চললে এ ভাইরাসের আক্রমণ থেকে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন। তবে মাস্ক পরা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

মুখে মাস্ক কখন রোগ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে না। তবে যারা প্রকৃতপক্ষে আক্রান্ত হয়েছে তাদের অবশ্যই মুখে মাস্ক পরতে হবে। এতে তাদের মুখ বা নাক থেকে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা এক জটিল প্রক্রিয়া। দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভাইরাসটির শনাক্তের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনশক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নেয়। তাই কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বা সন্দেহ হলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হবে। অথচ করোনা বা কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ করার প্রধান কাজ হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে রাখা। এ কারণেই আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। যারা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের প্রতিটি হাসপাতালে এ রোগ শনাক্তকরণের ক্ষমতা নেই। তবে উপসর্গ দেখা দিলেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। যে সব দেশে করোনা দেখা দিয়েছে সেসব দেশ থেকে ফেরত আসা মানুষ যদি ১৪ দিন ঠাণ্ডা জ¦রে ভোগে তাহলে দ্রুত সরকারি স্বাস্থ্য দফতরে জানানো উচিত। সরকারের এ স্বাস্থ্য দফতর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। যেহেতু ভাইরাসটি বাংলাদেশেই শুধু নয় সারা পৃথিবীতে ভয়ভীতি, আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে তাই করোনার হাত থেকে বাঁচতে অবশ্যই সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

করোনা ভাইরাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে দেখছেন। সংস্থাটির পরিচালক বলেন, প্রার্দুভাব বিস্তারের বিপজ্জনক মাত্রা ও তীব্রতা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আর এ কারণেই কোভিড-১৯ ভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে বাংলাদেশ সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বিদেশ থেকে ফেরা নিষেধ, বিদেশি শিক্ষার্থীদের দেশে না ফেরার অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাওয়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যে সরকার ১৭ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর মূল আয়োজন স্থগিত, সংক্ষিপ্ত আকারে উদযাপন, ২৬ মার্চ কুচকাওয়াজ স্থগিতসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেখানে বহু লোকের সমাবেশ ঘটবে সেখানে ভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় সরকার জাতীয় ও স্মরণীয় অনুষ্ঠানগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে উদ্যাপন করার সিদ্ধান্তকে আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই। কারণ সবার আগে মানুষ। করোনা শুধু মানুষের প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে না এর প্রভাব পরেছে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনীতিতে।

সবার ওপর মানুষ, সবার ওপর মানবতা। সর্বদিক থেকে বিশ্ব মানবতাকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বর্তমান করোনা ভাইরাস বিশ্ব মানবতাকে, বিশ্ব মানবকে খেয়ে ফেলছে। হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। শুধু করোনাই নয়, যুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধে বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। উপরন্তু নিত্য নতুন রোগ-ব্যাধিতে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। বিশে^র পরাশক্তি ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এসব বিষয়ে কোনো নজর নেই।

করোনা রোধে ইতোমধ্যে সার্কভুক্ত দেশগুলো ঐক্যমতে পৌঁছেছে। প্রাণ সংহারক করোনা ভাইরাস মোকাবেলাই সার্ক তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ ব্যাপারে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে আমরা সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি করোনা ভাইরাস গোটা দুনিয়া থেকে উঠে যাক। করোনা নিয়ে কোনো রাজনীতি নয়। কারণ, কোনো রোগ-ব্যাধি রাজনীতির বিষয় নয়।

প্রাণঘাতী করোনা এখন বিশ্ব আতঙ্কের নাম। আমাদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছে। এ বৈশ্বিক সমস্যা থেকে উত্তোলনের কোনো উপায় কার্যত আমাদের জানা নেই। করোনার বিস্তার, মৃত্যু আমাদের শঙ্কিত করে। তাই সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই।

মোহাম্মদ নজাবত আলী : সহকারী শিক্ষক চামরুল উচ্চ বিদ্যালয়, দুপচাঁচিয়া, বগুড়া