শিশু মন ও তার স্বাস্থ্য

ঢাকা, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২০ | ২০ চৈত্র ১৪২৬

শিশু মন ও তার স্বাস্থ্য

ড. ফারাহ দীবা ৯:৪২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২০

print
শিশু মন ও তার স্বাস্থ্য

প্রায় এক দশকের বেশি সময় মানুষের মন বিষয়ক জ্ঞানাহরণ করতে গিয়ে লক্ষ করেছি, কোনো এক অজানা কারণে আমাদের মাঝে একটি প্রবণতা কাজ করে। তা হলো- বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ভুলে যেতে থাকি শিশুদের ‘মন’ বলে একটা কিছু থাকতে পারে। চোখ বন্ধ করে এক মিনিট নিজের শিশুকালের কোনো একটি ঘটনা মনে করুন তো। ৫-৬ বছরের আপনি। একা অন্ধকারে থাকার কষ্ট, বন্ধুদের কাছে পাত্তা না পাওয়া, শিক্ষকের কাছ থেকে বিনা অপরাধে শাস্তি পাওয়া ইত্যাদি। আজও মনে হলে নিজের জন্য কি কষ্ট হয় না আপনার? এমন ছোট ছোট অনেক স্মৃতি, দুঃখ-কষ্ট-বেদনাই দিনে দিনে তৈরি করেছে আজকের আপনার ভেতরকার আপনাকে। মানব জীবনে শিশুকাল তাই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

যেহেতু শিশুকালের অভিজ্ঞতাসমূহ থেকেই ধীরে ধীরে একজন মানুষের সকল ধরনের সামাজিক, মানবিক, বিবেক, বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতাটি নির্দিষ্ট ধরনের হয়ে প্রতিষ্ঠা পায়, তাই খুব সহজেই অনুমেয়, এ সময় শিশুর চারপাশে, ভালো অনুভূতি সৃষ্টির আবহ থাকার প্রয়োজনীয়তা কতখানি। আর আমাদের মতো অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশে এর প্রয়োজনীয়তা আরও অনেক বেশি। এর কারণ ব্যাখ্যা করার আসলে খুব বেশি প্রয়োজন নেই, সেগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত আছি। তবুও কিছু বিষয় এই লেখায় অবতারণা করছি। ধরুন- রিকশা, অটোরিকশা বা গাড়িতে আপনি কোথাও বের হয়েছেন। আপনি গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত ‘সড়ক দুর্ঘটনা’র আশঙ্কা ছাড়াও কতগুলো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে পুরোটা পথ আতঙ্কিত থাকেন। (আবার গন্তব্যে পৌঁছে বিষয়টা আপনাআপনিই ভুলে যান)! যেমন- কোনো সিগন্যালে দাঁড়ানো মাত্র কিছু শিশু আপনাকে ঘিরে ধরতে পারে চকলেট বিক্রির নামে, গাড়ি পরিস্কারের নামে প্রথমে তার অসহায় শৈশবকে ব্যবহার করে আপনাকে দুর্বল করতে চাইবে। আপনি যদি তাকে আশানুরূপ প্রতিদান না দেন তবে সে এমন একটা কিছু করে বসবে যা আপনার দিনের বাকি সময়টার মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নিতে পারে। হয়ত অবাক হয়ে ভাবছেন- একই বয়সী নিজ পরিবারের শিশুদের প্রতি চারপাশের সবাই তার শিশুতোষ সারল্যেই আকৃষ্ট হই। তাহলে কেন ওইসব শিশু সারল্য হারাচ্ছে।

এর উত্তর সবাই জানি। ওরা আসলে পরিস্থিতির শিকার। ওরা ভালো বিষয় যত না দেখে, শোনে নির্মম কথা, আচার-আচরণের অভিজ্ঞতায় পূর্ণ হয় তার চেয়ে বেশি। সেটাই তাদের মানসিকতায় ছাপ ফেলছে এবং দিনের পর দিন তাদের মনের এ অবস্থাগুলো যখন এভাবেই চলতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এরা বড় হয় অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি-মায়া-দয়াহীন এক একজন মানুষ হয়ে।

আজ ১২ বছরের শিশুটি আপনার কাছে কিছু চেয়ে না পেয়ে (আপনি যদিও দিতে বাধ্য নন) আপনাকে হয়ত ভেঙচি কেটে একটা বাজে কথা বলে চলে যাচ্ছে। সামনে শিশুটি যখন ১৫-১৭ বছরে হয়ে আমার বা আপনার টাকার ব্যাগটি কেড়ে নিতে গলায় ছুরি ধরবে না বা ধরাটা তার জন্য অস্বাভাবিক হবে তার নিশ্চয়তা কী?

আমরা ভাবি, তাহলে হয়ত ঘরের শিশুরা ভালো আছে। কিন্তু আসলে কি আছে? হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। আমাদের অনেককেই শিশুদের ঘরে রেখে যেতে হয়- কাজের লোকের কাছে। স্কুল-কলেজ-কোচিং ইত্যাদি নিয়ে যেতে বা আসতে ছেড়ে দিতে হয় ড্রাইভারের ভরসায়। কখনও রেখে আসতে হয় প্রতিবেশীর বাড়িতে। কিশোরী মেয়েটিকে প্রয়োজনেই কিনে দিতে হয় মোবাইল ফোন, রাত জেগে যে কারো সঙ্গে ফ্রি অফারে কথা বলার ভয় থাকার পরেও। কলেজ-পড়ুয়া ছেলেটিকে কিনে দিতে হয় ল্যাপটপ, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় এক নিমেষে পর্নোগ্রাফির জগতে প্রবেশের দরজাটি খোলা জেনেও। এগুলো খুব সাদামাটা ঘটনা প্রাত্যহিক জীবনে কিন্তু আমাদের অগোচরে প্রতিদিন এসব বিষয়ের ভেতর দিয়েই কোনো না কোনো মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটে যাচ্ছে অনেক সাবধানে রাখা শিশুদের জীবনে। শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ঘটে যায়, হয়ত আমরা জানতেও পারি না। আমাদের সঙ্গে পরিবারের শিশুটির বয়স উপযোগী সত্যিকার সম্পর্ক আসলে আছে কি বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে? ভালো জামা-কাপড়, ভালো স্কুল, ভালো অবস্থা শিশুর জীবনে সুনিশ্চিত করাই তার পরিপূর্ণ বিকাশকে সুরক্ষিত বা সুসংগঠিত করা নয়।

উদাহরণস্বরূপ ২০১১ সালে দেশের ৬টি জেলার ৫৮১ জন স্কুলগামী শিশুদের নিয়ে আমার করা একটি ছোটখাটো গবেষণার কথা বলতে চাই। শতকরা ১৫.৩ শতাংশ মেয়ে এবং ৬.৬ শতাংশ ছেলে শিশুরা (৯-১৭ বছরের) নানাধরনের (স্পর্শহীন থেকে স্পর্শযুক্ত) যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে (স্কুলপড়ুয়া শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। প্রথম আলো, ১৭.০৮.২০১১)। এবার হয়ত মনে হতে পারে, সে জন্যই আসলে মায়েদের উচিত শিশুদের সঙ্গে সারাক্ষণ সময় দেওয়া। কারণ সমাজে আরেকটি অদ্ভুত ধারণা প্রচলিত- যে লেখাপড়া শেখা, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা উচিত মেয়েদের কিন্তু যখনই ১টি সন্তান তার জীবনে আসে সবকিছু ছেড়ে তাকে ঘরের ভেতর সমগ্র পৃথিবী বানানো উচিত। কিন্তু তাই যদি ঠিক হতো তবে কেন গ্রামাঞ্চলে ১০.৫ শতাংশ মেয়ে ও ৫.৭ শতাংশ ছেলেশিশুরা এসব নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। যেখানে শহরের একই বয়সী ৪.৮ শতাংশ মেয়ে এবং ০.৯ শতাংশ ছেলেরা এ সকল নির্যাতনের শিকার হচ্ছে (উক্ত গবেষণায় প্রাপ্ত)! তবে কি আজকাল গ্রামীণ মায়েরা সব বাইরে কাজে চলে যাচ্ছেন? বাবা-মা দুজনের সঙ্গে শিশুর বন্ধনের প্রকৃতিই মূলত তাকে একজন মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আমাদের সবকিছুর ওপরে শিশুদের গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানে শুধু আমাদের শিশুটি নয়। ১৪ কোটি বাংলাদেশির ৬ কোটি শিশুই নিজেদের পরিবারের এবং আমাদের বিশাল নিম্ন আয় পরিবারের ভবিষ্যৎ। তাই আমরা যারা শিক্ষার কারণে জীবনের ভালো কথাগুলো জানতে পারি তাদেরই দায়িত্ব এসব এক দুজন করে ওদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ তারা এসব মানসিক বিষয় নিয়ে ভাবে না, ভাবার মতো অবস্থা তাদের নেই।

আবারও বলতে চাই, শিশুর সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। শিশুর পরিপূর্ণ সুস্থতা তথা শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক বিকাশে শুধু উপস্থিত থাকাটাই সব নয়। প্রয়োজন প্রকৃত মনোযোগের এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের। যার মাধ্যমে সন্তানের সঙ্গে আপনি বন্ধু হয়ে উঠতে পারেন এবং নানারকম সমস্যা থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হতে পারেন।

ড. ফারাহ দীবা : সহযোগী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
farahdeeba@du.a.bd