রাগ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ

ঢাকা, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২০ | ২৪ চৈত্র ১৪২৬

রাগ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ

এম মনসুর আলী ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০

print
রাগ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ

রাগ আর ঝড় দুটি একই জিনিস। থেমে যাওয়ার পর বোঝা যায় কতটা ক্ষতি হয়েছে কিন্তু ততক্ষণে কিছুই করার থাকে না। উত্তেজিত অবস্থা কখনও ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না। রাগ এমনই একটা বিষ যা আপনি নিজে পান করলেন আর ভাবলেন মারা যাবে আপনার প্রতিপক্ষ। বিষ পান করলেন আপনি আর মরবে অন্যজন! এটা কি হয়? ২০০৬ সালের বিশ^কাপ ফুটবলের প্রায় হিরো হয়ে যাওয়া জিনেদিন জিদান মাতারাজ্জির ওপর চড়াও হয়ে পেলেন লাল কার্ড, হারালেন নিজের সুযোগ, দলের সুযোগ। মাইক টাইসন প্রতিপক্ষ হলিফিল্ডের কান কামড়ে হারিয়েছিলেন শিরোপা। মনে রাখবেন, রাগ যা ক্ষতি করার আপনারই করবে। রাগে মুক্তি নেই। মুক্তি আছে যুক্তিতে।

আপনি পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে রাগারাগি করবেন। চিৎকার, চেঁচামেচি, হট্টগোল করবেন। সুযোগ পেলেই কটাক্ষ করে কথা বলবেন, তাদের সম্মানে আঘাত করবেন। মানুষের সঙ্গে এই সব করে আপনি কখনও ভালো থাকতে পারবেন না। শান্তিতে থাকা তো দূরের কথা, একটি তৃপ্তির ঢেকুরও গিলতে পারবেন না। কারণ ইতিহাস বলে, শোষক কখনও শান্তিতে থাকতে পারে না। মহামানবদের জীবনে কিন্তু রাগ করার অনেক বিষয় ছিল। তাঁরা রাগ করেননি। কারণ, তাঁরা জানতেন রাগ একটা ক্ষতিকারক আগুন যা শুধু রাগান্বিত ব্যক্তিকেই পোড়ায়।

আপনি নামের আগে হাজী সাহেব উপাধি লাগাবেন আর বিনা কারণে অন্যের সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি করবেন, অন্যকে বিষিয়ে তুলবেন, কষ্ট দেবেন। আপনার এই সব আচরণে মানুষ আপনাকে ভয় পাবে ঠিক কিন্তু মনে মনে তারা আপনাকে ঘৃণা করবে। আপনার দুর্দিনে সুযোগ পেলে আপনার বিরুদ্ধে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামবে। আপনার শত্রুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকবে। রাগ শুধু শত্রু বাড়ায়, কমায় না।

রাগ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। অন্যের কাছে নিজেকে অপ্রিয় করে তোলে। পরিবারের সদস্য, বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী বা যে কোনো মানুষই একজন রাগী মানুষকে এড়িয়ে চলতে চায় এবং পছন্দ করে না। রাগে বা ক্রোধে রয়েছে স্বাস্থ্যগত অনেক খারাপ দিক যা শরীরে বিশেষ বিশেষ রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাগের কারণে অনেক ধরনের ক্রনিক রোগ হতে পারে। যেমন- ইনসমনিয়া, হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, আলসার, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, মৃগীরোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাইগ্রেন, ব্যাকপেইন, ফুসফুসের অসুখ এমনকি ক্যান্সার। টানা দুই ঘণ্টা যদি কেউ রাগান্বিত অবস্থায় থাকে তাহলে তার হার্টঅ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায় আটানব্বই শতাংশ। রাগ মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণে। বেশীক্ষণ রাগান্বিত অবস্থায় থাকলে শরীর ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়ে। হজম শক্তির ব্যাঘাত ঘটে, শ্বাস প্রক্রিয়া দ্রুত হয়। আয়ুস্কালের ওপরও রাগের প্রভাব আছে। বদরাগী মানুষদের মৃতুর হার শান্ত প্রকৃতির মানুষদের চেয়ে ৫ গুণ বেশি।

শুধু তাই নয়, রাগের কারণে মানুষ কোন কোন সময় মহামূল্যবান জিনিসও হারায়। বহুদিন আগে মায়ের কাছে শোনা গল্পটা বলছি- এক জমিদারের একমাত্র সুন্দরী কন্যা ছিলো। মেয়ের যখন বিয়ের বয়স হলো বাবা তাকে বললেন, এখন তো তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বলো তোমার কাকে পছন্দ। যাকে পছন্দ তার সঙ্গেই তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করবো। মেয়ে পছন্দ প্রকাশে অপারগতার কথা জানালো। বাবা চিন্তায় পড়ে গেলেন। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে বুদ্ধি বেরিয়ে এলো। প্রতিযোগিতা হবে।

প্রতিযোগিতায় যে প্রথম হবে তাকেই মেয়ে বিয়ে করবে। প্রতিযোগিতার দিন দেখা গেল শতাধিক যুবক সুন্দর পোশাকে পরিপাটি অবস্থায় জমিদারের বাড়িতে এসে উপস্থিত। জমিদার সবাইকে বাড়ির সুইমিং পুলে নিয়ে গেলেন। সুইমিংপুলের পাশে সবাইকে দাঁড় করিয়ে বললেন, দেখো, প্রতিযোগিতা খুব সহজ। সাঁতার প্রতিযোগিতা হবে। সাঁতারে যে প্রথম হবে তার সঙ্গেই আমার মেয়ের বিয়ে দেব। তবে সুইমিং পুলে ঝাঁপ দেওয়ার আগে ভালো করে খেয়াল করো। পানির নিচে বহু কুমির অপেক্ষা করছে। আর এই কুমিরগুলোকে এক মাস ধরে কোনো খাবার দেওয়া হয় নি। ধনকুবেরের কথা শেষ হতে না হতেই দেখা গেল যে, এক যুবক পানিতে পড়ে চোখ বন্ধ করে দুই হাত পা নাড়ছে। কুমিররা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই যুবক ভাগ্যক্রমে কিছুক্ষণের মধ্যেই সুইমিংপুলের ওপারে গিয়ে উঠেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতবাক। বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই জমিদারের মেয়ে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো যুবককে। বিস্ময়াবিষ্ট কন্ঠে বলল, তোমার মত বীরকেই আমি চাচ্ছিলাম। তুমিই আমার স্বামী হওয়ার একমাত্র উপযুক্ত। এদিকে যুবকের রাগ তখনও থামে নি। উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপছে। এক ঝটকায় মেয়েটিকে দূরে ঠেলে দিয়ে যুবক চিৎকার, চেঁচামেচি করে বলতে লাগলো, কোন ..., কোন ... আমাকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিয়েছিলো, তাকে আগে দেখে নেই। যুবকের মুখে এই কথা শুনে জমিদারের মেয়ে ও জমিদার তাকে প্রতিযোগিতার আসর থেকে বের করে দিল। সুন্দরী মেয়ে ও জমিদারের সম্পদ ঐ যুবকের হাতের মুঠোয় চলে এসেছিলো। ধাক্কা যে-ই দিক, সে সুইমিং পুল অতিক্রম করে সবার চোখে বিজয়ী বীর বলে গণ্য হয়েছিলো কিন্তু শুধু রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে সৌভাগ্য এসেও তা হাতের নাগালের বাইরে চলে গেল।

নিজের জীবন অনুসন্ধান করলেও আপনি হয়তো দেখতে পাবেন অনেক সুযোগ নষ্টের পেছনে রয়েছে আপনার রাগ, ক্ষোভ ও অভিমান। তাই সব সময় স্মরণ রাখুন- রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। আপনি হয়তো বলতে পারেন রাগ না করে কি থাকা যায়? একজন অহেতুক গালিগালাজ করলো, মা-বাবা তুলে গালি দিলো, তখনও কি নীরব থাকা যায়? মহামতি বৌদ্ধের জীবনের একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্যে এক অনুস্মরণীয় দৃষ্টান্ত।

মহামতি বৌদ্ধ তখন বৃদ্ধ। এক চালবাজ লোক জুটে গেল। সে ভাবলো বৌদ্ধ আর বেশিদিন বাঁচবেন না। এখন তার সঙ্গে কিছুদিন থেকে যদি কিছু কায়দা-কানুন শিখে নেওয়া যায়, তাহলে বৌদ্ধ মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বৌদ্ধের অবতার ঘোষণা করে দেব। তখন আর পরিশ্রম করতে হবে না। বসে বসে দান-দক্ষিণা গ্রহণ করেই জীবনটা সুখে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। একেবারে নিবেদিতপ্রাণ শিষ্যের মতো ভান করে বৌদ্ধের সেবাযত্ন করতে লাগল। মহামতি বৌদ্ধ তার মতলব বুঝলেও কিছুই বললেন না। বছর দুই পার হওয়ার পর শিষ্য বুঝতে পারলো যে, সে ধ্যানের ক্ষমতা বা আধ্যাত্মিক শক্তি কিছুই লাভ করে নি। কারণ নিয়ত পরিষ্কার না থাকলে ধ্যানের ক্ষমতা শক্তি লাভ করা যায় না। ভণ্ড শিষ্য এর ফলে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। মনে মনে ঠিক করলো এর উপযুক্ত প্রতিশোধ সে নেবে। একদিন ভোরবেলা মহামতি বৌদ্ধ একা বসে আছেন। ভণ্ড ভাবলো এই সুযোগ। সে কাছে গিয়ে বৌদ্ধকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে লাগলো। বৌদ্ধ চুপচাপ শুনছেন। কিছুই বলছেন না।

অনেকক্ষণ গালিগালাজ করার পর শিষ্য যখন একটু থামলো, বৌদ্ধ তখন মুখ খুললেন। শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন আমি কি তোমাকে কোনো প্রশ্ন করতে পারি? ভণ্ড শিষ্যের মেজাজ তখনও ঠাণ্ডা হয় নি। সে ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো, জিজ্ঞেস করেন, কি জিজ্ঞেস করবেন? বৌদ্ধ বললেন, ধরো তোমার কিছু জিনিস তুমি কাউকে দিতে চাচ্ছো। কিন্তু সে যদি তা না নেয়, তাহলে জিনিসগুলো কার কাছে থাকবে? উত্তেজিত শিষ্য জবাব দিল, এ তো সহজ বিষয়। এটাও আপনি বোঝেন না? আমার জিনিস আমি যাকে দিতে চাচ্ছি, সে যদি না নেয় তাহলে আমারই থাকবে। বৌদ্ধ আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার জিনিস তুমি তাকে দিতে চাচ্ছো সে না নিলে তোমার থাকবে? ভণ্ড শিষ্যের উত্তর, হ্যাঁ আমার থাকবে। এবার মহামতি বৌদ্ধ বললেন, তাহলে এতক্ষণ তুমি আমাকে যা (গালিগালাজ) উপহার দিলে, আমি তার কিছুই নিলাম না।

আপনিও আপনার জীবনে ব্যক্তিগত গালিগালাজ ও অপমানসূচক কথাবার্তার জবাবে মহামতি বৌদ্ধের এই কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। এটা রাগ নিয়ন্ত্রণের মহাষৌধ। আসলে একজন মানুষ যখন অযৌক্তিক আচরণ করে, গালিগালাজ করে, মা বাবা তুলে গাল দেয় তখন এর জবাবে আপনি তার মা-বাবা তুলে গাল দিতে পারেন কিন্তু তার মা-বাবাকে গালি দিয়ে আপনি নিজেকেই অপমানিত করলেন। সে গালিগালাজ করে আপনার শান্তি নষ্ট করতে এসেছিলো, আপনি গালির জবাব দেওয়ার অর্থই হচ্ছে তার উদ্দেশ্যকে সফল করা। তার চেয়ে কিছুক্ষণ তার গালিগালাজ শোনার পরে আপনি যদি বিনয়ের সাথে বলেন, ভাই আপনি অনেক মেহেরবান। অনেক কিছু আমাকে দিলেন। কিন্তু এগুলো রাখার কোনো জায়গা আমার কাছে নেই। আমি কিছুই নিলাম না। এগুলো আপনারই থাক। এ কথা বলার পর দেখবেন, অপরপক্ষ দাঁত কামড়ে চলে যাচ্ছে। তার গালিগালাজ যে আপনার ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারলো না, এটাই তার পরাজয়। আর এ পরাজয়ের যন্ত্রণা হয়তো অনেক দিন সে বয়ে বেড়াবে। সে এসেছিলো আপনার শান্তি নষ্ট করতে, কিন্তু শান্ত থেকে আপনি তাকে পরাভূত করলেন।

এই যান্ত্রিক যুগে মানুষের সহনশীলতা কমছে আর রাগের বহিঃপ্রকাশ আগের থেকে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে তিনটা ঝগড়া দেখি। যেমন- রিকশাওয়ালার সঙ্গে যাত্রীর ঝগড়া, এক বাসের সঙ্গে আরেক বাসের চালকের ঝগড়া, ফেরিওয়ালার সঙ্গে ক্রেতার ঝগড়া, স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর ঝগড়া, ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের ঝগড়া, ছেলের সঙ্গে বাপের ঝগড়া ইত্যাদি। আমাদের অবজারভেশন বলে আমাদের ধৈর্য্য কমছে আর রাগ বাড়ছে। রাগের কারণে শরীরে অনেক ধরনের ক্রনিক রোগ হতে পারে। রাগের কারণে অনেক মূল্যবান বস্তু মানুষের হাতছাড়া হয়। রাগের সংসার নাকি দোযখের ঘর। আয়ুস্কালের ওপরও রাগের প্রভাব আছে। মধ্য বয়স্ক আমার এক দূরসম্পর্কের চাচা প্রতিবেশীর সঙ্গে রাগারাগি অবস্থায় স্ট্রোক করে এবং পরে মারা যায়। রাগ যা দেয়, জীবন থেকে তার চেয়ে বেশি কেড়ে নেয়। রাগের ক্ষতির দিকটায় নিরানব্বই ভাগ, উপকার একভাগ। তাই আসুন আমরা রাগকে বর্জন করি। যখন বেশি রেগে যাবেন তখন এক টুকরো বরফ হাতে নেবেন, দেখবেন রাগ বাতাসে উড়ে গেছে। তাছাড়া রাগহীন মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করেন, দেখবেন আস্তে আস্তে আপনার রাগ মরে যাচ্ছে।

এম মনসুর আলী : তৃণমূল সাংবাদিক
monsor.eza@gmail.com