সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য

ঢাকা, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০ | ১৫ চৈত্র ১৪২৬

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য

ড. ফারাহ দীবা ৯:০৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০

print
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য

‘অর্থ আনন্দ কিনতে পারে না’ কথাটি ঠিক নয়। ভেবে দেখুন তো, অর্থ ছাড়া আমাদের সন্তানদের কী করে আনন্দিত রাখতাম? কী করে তাদের মুখে প্রতিনিয়ত হাসি ফোটাতাম? এমনকি অনেক গবেষণায় বিষয়টি এখন প্রতিষ্ঠিত এক সত্য, অর্থাভাব যে কোনো মানুষের মাঝে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এ চাপ যখন দিনের পর দিন চলতে থাকে তখন সে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে। তারপর একসময় নিজের এ অক্ষমতার বেদনায় মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত হতে থাকে। ক্রমশ তা হয়ত চিকিৎসামূলক বিষণ্নতা বা অন্য কোনো মানসিক রোগে রূপ নিতে থাকে। দারিদ্র্যের দুষ্টুচক্রে বাঁধা পড়ে যায় জীবন। এবার একটু ভাবি, এমন জীবনে জন্ম হয় যার সে শিশুটির মানসিক অবস্থা কী?

দারিদ্র্য একটি শিশুকে প্রথম যে বিষয়টির মাঝে এনে দাঁড় করায় তা হলো, অপুষ্টিতে ভোগার আশঙ্কা। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর বিকাশ- শারীরিক বা মানসিক তা কখনোই উপযুক্ত পরিবেশ না দিলে বয়স উপযোগী পৌঁছায় না, পরিণত হয় না। সে তখন পরিণত একজন মানুষ যার শুধু বয়স বাড়তে থাকে। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে ছাড় দেয় না। নিরবধি দারিদ্র্যাক্রান্ত পরিবার বা পরিবেশে দেখতে থাকে বাবা-মায়ের নানারকম জীবনযুদ্ধে রত থাকা, কলহে লিপ্ত থাকা, প্রতিবেশে নানা ধরনের বয়স অনুপযোগী নেতিবাচক ঘটনা ঘটা।

তারা বঞ্চিত হয় জীবনের সবধরনের ইতিবাচক ঘটনা থেকে। অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের শারীরিক বিকাশের সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাঘাত ঘটে যেটি সেটি হলো, মস্তিষ্কের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ না হওয়া। বাড়ন্ত মস্তিষ্কের আকৃতি যেমন স্থগিত একটি অবস্থায় থাকে তেমনি মানসিক চাপে একজন মানুষের ঐ চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় ভাবনা ছাড়া অন্য কোনো ভাবনা থাকে না। উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করা তাদের জন্য খুবই কঠিন।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যেভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে শারীরিক অপুষ্টিকে কাটিয়ে ওঠা যায়, সেভাবে ইতিবাচক ও উষ্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে মানসিক বিকাশকেও পুষিয়ে তোলা যায়। কিন্তু দারিদ্র্য তাদের জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে এমনভাবে নিয়ে যায় যে নেতিবাচক মন বা ব্যক্তিত্ব তৈরির ছকে ফেলে দেয়। ঘটনাগুলো যেন তাদের জীবনে শাস্তির প্রভাব ফেলে।

স্বভাবতই নেতিবাচক ঘটনার প্রভাবের কারণে সমাজের প্রতি তাদের প্রত্যক্ষণের ও মনোভাবের ধরন বদলে দেয়। খুব সহজে অনুমান করা যায়, এসব শিশু যখন বড় হবে তাদের কাছে নেতিবাচক ঘটনাগুলোই স্বাভাবিক বলে মনে হবে। তাই নেতিবাচক কাজ করে ফেলা তাদের জন্য আর অস্বাভাবিক থাকে না।

এর পরিবর্তন প্রয়োজন। কীভাবে, অর্থ সাহায্য দিয়ে? হ্যাঁ, অবশ্যই। কিন্তু দেখা গেছে অর্থ সাহায্য অনেক প্রয়োজনীয় কিন্তু সেটাই সব নয়। অনেক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে একটি বিষয় হলো, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য নেই, যা দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আবার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য প্রয়োজন মস্তিষ্কের উচ্চতর দক্ষতা।

যা একজন শৈশব থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান, সঠিক যত্ন ও পরিচর্যার কারণে সার্বিক (শারীরিক, মানসিক, সামাজিক) সব দিক থেকে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়। তাই প্রয়োজন শুধুই অর্থ নয়, প্রয়োজন তথ্যের বা শিক্ষার সরবরাহ করা। যে জন্য আমরা শিক্ষা নিতে পাঠাই আমাদের সন্তানদের। সুখের কথা, আমি আপনি হয়ত তেমন কিছু করতে পারি না, কিন্তু দেশে অনেক এনজিও আছে যারা এ ধরনের প্রয়োজনীয় কাজটি করেছেন।

‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তিতে এ ধরনের বিশেষ সহযোগিতামূলক বিদ্যালয় চালাচ্ছে। যেখানে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পুষ্টিকর খাবার ও শিক্ষা দেওয়া হয়। এসব স্কুলে শিশুরা খুব খুশি হয়ে নিয়মিত ক্লাসে আসে। কারণ, তারা স্কুলে এলে ভালো কিছু খেতে পায়। ভালো কিছু কথা শিখতে পারে।

দরিদ্র শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাবার- যা তার মৌলিক অধিকারের প্রাথমিক বিষয়। খাদ্যের মাধ্যমে স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয়। তারপর শিক্ষা সেই মৌলিক অধিকার, যা তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এখানের প্রত্যেকেই বড় হয়ে হয়ত বড় পদাধিকার করবে না, কেউ কেউ করবে। কিন্তু তার কাছে তথ্য থাকবে সমাজে নানাকিছু করার আছে, হওয়ার আছে। সমাজে মানুষ মানুষকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে ইত্যাদি।
তারপর সমাজে কী কী উপায়ে নিজে প্রতিষ্ঠিত করা যায় সে জ্ঞান আহরণ ও তার চর্চা সে করে। বেরিয়ে আসে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের অদৃশ্য নাগপাশ থেকে। অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ রকম উত্তরণ ঘটবে তা নয়। তার ভেতর তৈরি হবে বোধ যা তাকে উদ্যমী করবে, আশান্বিত করবে। জীবনে ভালো থাকা মানে যে শুধু বিত্তে নয় তা জানবে আর এর মাধ্যম তারা ভবিষ্যতের সুনাগরিক বা ভবিষ্যতের ভালো অভিভাবক হতে পারবে, আশা করা যায়।

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট হওয়ায়, আমার সৌভাগ্য হয়েছে এরকম বেশ কিছু অসাধারণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার। আইন ও সালিশ কেন্দ্র ছাড়াও এসওএস শিশুপল্লী, কেয়ার বাংলাদেশ, বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান যেমন- চট্টগ্রামের ইপসা, সিলেটের ভার্ড, এমন আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। যেখানে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে সময় কাটায়। তারপরও একটা বিষয় পেয়েছি, শিশুদের অনেকেই মানসিক দুঃখ-কষ্টের নানা বিষয়ে উত্তরণ করতে পারে না।

ঠিক যেমনটি আমাদের মতো স্বচ্ছল পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রেও হয়। প্রয়োজনীয়তা মিটলেই হয় না, জীবনের নানাবিধ দুঃখ পাওয়ার ঘটনাগুলো সবাইকে একইভাবে ভেতরে ভেতরে তাড়া করে। যে মানুষটি কোনোভাবে হয়ত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগার ঝুঁকিতে আছে তার মাঝে তখন ফুটে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ।

বিষণ্নতা, উদ্বেগ, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, তেমন মাত্র কয়েকটি সমস্যার নাম। কিন্তু ভাবার বিষয় হলো, সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা সাধারণ শিশুদের চাইতে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। খুব সহজভাবেই যদিও এর কারণ বুঝতে পারি, তাদের যে দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন আর সেখানে যে তারা নানারকম ঘটনার অভিজ্ঞতা পায় সেসব তাদের এ মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করছে।

বিষয়টি নিশ্চিত হতে আমরা যে গবেষণা করি তাতে দেখি, সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা মানসিকভাবে তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে পারে এমন ঘটনার শিকার, তুলনামূলকভাবে সাধারণ পরিবারের শিশুদের চেয়ে। এ অবস্থা কখনও মানসিকভাবে পূর্ণাঙ্গভাবে সুস্থভাবে তাদের বেড়ে উঠতে দেবে না। তাদের জন্য কিছু করা প্রয়োজন। না হলে মানসিকভাবে ভারাক্রান্ত হওয়ার কারণে একটি দেশ সার্বিকভাবে যে ক্ষতি প্রতিদিন গোনে তা থেকে উত্তরণ পাওয়া সম্ভবপর নয়।

কারণ যখন মানসিক রোগের কারণে সমাজের একজন মানুষও কাজ করার সক্ষমতা হারায় তা তার পরিবারকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তা ক্রমান্বয়ে তার প্রভাব পড়ে গোটা সমাজের অগ্রগতিতে। মানসিক বিষয় নিয়ে কাজ করার কারণে বুঝতে পারলাম এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের জন্য যত তাড়াতাড়ি কিছু করা যাবে ততই স্বাভাবিক অবস্থান করবে।

তাহলে আমাদের ভবিষ্যতের যে বিশাল সমাজ, যা আজকের এইসব দুর্দশাগ্রস্ত শিশুদের নিয়ে তৈরি হবে, তাদের মাঝে মানসিক সমস্যা কম সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এমন কিছু খুবই দরকার। কারণ এ বিশাল জনসংখ্যার দেশে, আমরা মানি আর না মানি, যারা মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সৃষ্টি করছে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারাই হলো ‘বাংলাদেশ’। এ দেশ উন্নত হবে সেদিন যখন এ সব দরিদ্র মানুষের জীবন উন্নত হবে।

‘অর্থ’ চূড়ান্তভাবে মানুষের চিরস্থায়ী মানসিক সুস্বাস্থ্যকে নিশ্চিত করতে পারে না। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর কাছে যেতে হয়। সৌভাগ্য যে, এখন বাংলাদেশে অনেক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ওষুধের চিকিৎসার পাশাপাশি সাইকোথেরাপির ব্যবস্থা আছে। অনেকেই অনেক সচেতন, শিশুদের দীর্ঘদিন মন খারাপ দেখলে বা আচরণের কোনো স্বাভাবিকতায় ছন্দপতন চোখে পড়লে দেরি করে না। অনেকেই আবার দেখি, মানসিক চিকিৎসা সেবা অনেক ক্ষেত্রে সুলভ বলে মনে হয় না।

এ অবস্থায় ভাবতে পারেন কি, যে বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত নানা দুঃখ-কষ্টে জীবন অতিবাহিত করছে তাদের জন্য এ চিকিৎসা নেওয়া কতটা সম্ভব! আরো ভাবুন, সে দরিদ্র সমাজের যেসব শিশু আমার বা আপনার কেউ নয় হয়ত কিন্তু চারপাশ জুড়ে আছে, যারা বড় হচ্ছে নানা রকম দুঃখজনক ঘটনার ভেতরে, প্রতিনিয়ত জীবনের খরতাপে দগ্ধ হতে হতে।

যারা হয়ত মোটামুটি হলেও স্বচ্ছল পরিবারের শিশুদের সমবয়সী, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার কী হবে? তাদের বাবা-মায়ের কি কোনোদিন ‘দিনে খেটে আনা পয়সা, যা দিয়ে পরিবারের বেঁচে থাকা’ সে উর্পাজন বন্ধ রেখে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিতে আসতে পারবে? যে ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন এমন অবস্থার পরিবারের, তার ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব। বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার বা তার আগে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা, এ সবের জন্য হয় যে দীর্ঘসময় এবং বিপুল অর্থ বিনিয়োগ প্রয়োজন তা কি জাতীয়ভাবে করা সম্ভব? এর উত্তর সবার জানা।

উন্নত বিশ্বে যেহেতু দারিদ্র্যের কারণে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানই শুধু আছে তা নয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবস্থা রয়েছে, যদি কোনো দরিদ্র পরিবারের শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় তখন মনোবিজ্ঞানী ও সমাজকর্মীদের টিম তৈরি করে তার বাবা-মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্যও পাঠানো হয়। কেননা বিভিন্ন গবেষণায় এ তথ্যও প্রতিষ্ঠিত যে অল্পবয়সী শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মাও কোনো মানসিক চাপ বা মানসিক রোগ বা আর্থ-সামাজিক কোনো সমস্যার কারণে শিশুর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়ার সমস্যা থেকে তৈরি হয়।

ধরা যাক, কোনো এক মায়ের বিষণ্নতার জন্য এমন একটি টিমকে সর্বনিম্ন দুই বা তিন বছর কাজ করতে হলো যা সে পরিবারের জন্য বিনামূল্যে হলেও রাষ্ট্রকে এসব দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর খরচ বহন করতে হয়। উন্নত বিশ্বে রাষ্ট্র এ অর্থ বিনিয়োগ করে। কারণ এর মাধ্যমে শুধু একটি শিশু নয় তার পরিবারের একাধিক সদস্য স্বাভাবিকভাবে মানে মানসিক চাপবিহীনভাবে চিন্তা করার অবস্থা ফিরে যায়। শিশুর জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে বিষয় তা হলো পরিবারের মাঝে ইতিবাচক আন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন হওয়া।

দেশে এ ধরনের চিকিৎসা সেবা তৈরি করা শুধু অর্থনৈতিকভাবেই কঠিন নয়, অনেক সময়সাপেক্ষ বিষয়। রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে এত সমৃদ্ধ নয়, কয়েক কোটি দরিদ্র শিশুর জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে পারবে। তাহলে কি কিছুই করার নেই, আজ যে অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশু বড় হচ্ছে তাদের জন্য! এ সব প্রশ্ন তাড়া করে ফিরত আমাকে সবসময়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের একজন হয়ে মনে হত, এ সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার দায়িত্ব তো আমাদেরই।

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার উদ্দেশ্যে উচ্চ শিক্ষার গবেষণায় দেখতে চাইলাম, কী পন্থা করা যায় যা এসব শিশুদের জন্য মানসিক চাপে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়াসমূহকে নিরসনে সহায়তা করবে। তাদের বাবা-মাকে চিকিৎসার জন্য কাজ বাদ দিতে হবে না, বা চিকিৎসা দেওয়ার জন্য অনেক দক্ষ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরও প্রয়োজন হবে না। খুব সামান্য খরচে সরবরাহ করা যাবে মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা। আমি ও আমার পিএইচডি গবেষণার সুপারভাইজার মিলে পরীক্ষা চালালাম।

দেখলাম খুব কম খরচে একটি ছোট্ট নরম পুতুলকে (যার বাজারমূল্য ১০০-১৫০ টাকা) নিয়ে খেলার ছলে শিশুদের মানসিক চাপে যেসব লক্ষণ সৃষ্টি হয় তা কমিয়ে আনা যায়। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের সুযোগ পেলে এ পন্থায় শিশুরা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ কমে যাওয়াও উচ্চতর মানসিক কাজে আরও বেশি নিয়োজিত হতে পারে।

বিগত কয়েক বছর আরও কিছু ছোট ছোট গবেষণা করে দেখেছি, এ চিকিৎসা ব্যবস্থা অল্পবয়সী শিশুদের জন্য বেশ উপকারী। আমরা এখন চেষ্টা করছি বড় পরিসরে এ চিকিৎসা ব্যবস্থার পরীক্ষা করে দেখতে।

আশা করি, আমাদের সহযোগিতা করবেন যারা এধরনের শিশুদের জন্য কাজ করেন। বাংলাদেশ মানে এ দেশের প্রতিটি মানুষ, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানে এ দেশের প্রতিটি শিশু। তাই আমাদের এমন কিছু দরকার যা সত্যিকারের উন্নত বাংলাদেশ মানে মানসিকভাবে উন্নত জনগোষ্ঠী সৃষ্টিতে সহায়তা দেবে। আমাদের নিজেদের শিশুদের কোনো না কোনোভাবে দায়িত্ব নেই।

মনে রাখতে হবে, দেশকে উন্নত করতে হলে, আমরা যারা অপেক্ষাকৃত বেশি শিক্ষিত ও সচ্ছল তাদের অবশ্যই দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য চিন্তা করতে হবে। মনে রাখতে হবে দারিদ্র্যের কারণে তাদের বাবা-মায়ের পক্ষে সন্তানদের জন্য সঠিক কাজটি নেওয়া সম্ভব হয় না। আমরা তো ভাবতে পারি! আর্থিকভাবে না হোক মানসিকভাবে সহযোগিতা করা নৈতিক দায়িত্ব।

ড. ফারাহ দীবা : সহযোগী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
farahdeeba@du.a.bd