বন্ধ হোক মানবপাচার

ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২০ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বিশেষ কলাম

বন্ধ হোক মানবপাচার

ওয়াসিম ফারুক ৯:০৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০

print
বন্ধ হোক মানবপাচার

কয়েক বছর আগে বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে সংবাদের বিশেষ শিরোনাম ছিল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে অবৈধ মানবপাচার। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সীমান্তে গভীর জঙ্গলে গণকবর আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার থেকে মানবপাচারের ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পায়। সে সঙ্গে সন্ধান মেলে পাঁচ শতাধিক গণকবরের।

যেখান থেকে উদ্ধার করা হয় শতাধিক বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মরদেহ। এদের সবাই নৌকায় ভেসে মিয়ানমার বা বাংলাদেশে থেকে জীবনের প্রয়োজনে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য তাদের সঙ্গে অসম্ভবভাবে প্রতারণা করেছে।

এরপর আন্তর্জাতিক চাপে নিজেদের ইজ্জত রক্ষার জন্য থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সরকার যথেষ্ট কঠোর হয়েছিল। তাতে আমরা ধরে নিয়েছিলাম সমুদ্রে নৌকায় ভেসে অবৈধ পথে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড যাওয়ার প্রবণতা কমে আসবে। বাস্তবে তা কোনো ভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি ১২০ জন বা তার অধিক যাত্রী নিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় সেন্টমার্টিন দ্বীপের কাছে বঙ্গোপসাগরের ইঞ্জিন বিকল হয় নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। যখন এ লেখা লিখছি তখনকার সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ১৫ জনের মৃতদেহ ও ৬৫ জনকে জীবিত সাগর থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আর প্রায় চল্লিশ জন বা তার অধিক মানুষের সন্ধান এখনো মেলেনি। তবে মৃত্যের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কার কথাই বলেছে আমাদের কোস্টগার্ড।

সাগর থেকে জীবিতের সকলেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী মুসলমান রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে গণহত্যা ও নির্যাতন চালানোর কারণে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ ছাড়া আগে থেকেই বাংলাদেশে চার লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১১ লাখের মতো। যারা কর্মহীন ও অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ অবস্থান করছে উখিয়ায়। তাদের প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতে মানবপাচারকারী চক্রগুলো আবারও তৎপর হয়ে উঠেছে। সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারে টার্গেট করা হচ্ছে এসব রোহিঙ্গাকে।

এ মানব পাচারে বাংলাদেশি ছাড়াও মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমারের নাগরিকরা জড়িত রয়েছে বলে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আর রোহিঙ্গাদের পাচারের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা শিবিরগুলিতে আছে একাধিক চক্র। ইতোমধ্যে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করেছে। যেখানে দেশি বিদেশি মানবপাচারকারী চক্রগুলোর বিস্তারিত দেওয়া ছিল। তারপরও অবৈধভাবে মানবপাচার বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

সাগরপথে অবৈধভাবে মানবপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্তরা আজ কোটি কোটি টাকার মালিক। কিছুদিন আগে আমরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পেরেছি মাদক ও মানবপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কক্সবাজারের অনেকেই আজ কোটি কোটি টাকার মালিক। কিছুদিন আগেও যাদের কেউ রিকশা বা ভ্যান চালক ছিলেন। কেউবা লবণ ক্ষেতের দিনমজুর। তাদের সকলেরই মূল শেল্টারদাতা নাকি টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি ও তার পরিবার।

অবশ্য বদিকে নিয়ে সংবাদমাধ্যম থেকে জাতীয় সংসদ সবখানে আলোচনার ঝড় উঠলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার টিকিটি পর্যন্ত ছুঁতে পারেনি। উল্টো দুর্নীতি দমন কমিশন বদিকে দায় মুক্তির সনদ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শ্রেণির অসাধু সদস্য ও মানবপাচারকারীদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।

আমাদের সরকার মানবপাচার রোধে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। আট বিভাগে মানবপাচার প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল করার কথা ও ভাবছে সরকারব। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০১৯ পর্যন্ত সারা দেশে ৪ হাজার ৬০১টি মানবপাচারের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭টি মামলা ঝুলছে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে। আটটি বিভাগের মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৬৪টি মানবপাচার মামলা বিচারাধীন।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৭৯টি, রাজশাহী বিভাগে ২৩৫টি, খুলনা বিভাগে ৮৩৩টি, বরিশাল বিভাগে ৩৮৫টি, সিলেট বিভাগে ২২৬টি, রংপুর বিভাগে ৫৮টি এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১২১টি মানবপাচার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে বাস্তব সত্য, পাচারকারীরা এতটাই শক্তিশালী যে বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় তাদের বেশিরভাগকেই বিচারের মাধ্যমে সাজার ব্যবস্থা সম্ভব হয় না বলেই পাচারকারীরা বীরদর্পে তাদের কার্যক্রম চালায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায়ই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে জীবন দিতে হয় আমাদের দেশের মানুষকে। সেই সঙ্গে বর্তমানে যোগ হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট।

সামাজিকভাবে অবৈধ পথে বিশেষ বিদেশযাত্রাকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি সরকারকে এ ব্যাপারে কঠিন থেকে কঠিনতম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর যাতে একটা মানুষকেও এ পথে জীবন দিতে না হয়। তা না হলে সরকারের সমস্ত উন্নয়ন দেশে ও বিদেশে পুরোপুরি ম্লান হয়ে যাবে।

ওয়াসিম ফারুক : কলাম লেখক
woashim76@gmail.com