শিক্ষিত-অশিক্ষিত দূরত্ব

ঢাকা, রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১১ ফাল্গুন ১৪২৬

শিক্ষিত-অশিক্ষিত দূরত্ব

এস আর শানু খান ৭:৪০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

print
শিক্ষিত-অশিক্ষিত দূরত্ব

শিক্ষা যে কত বড় আশীর্বাদ সেটা একজন শিক্ষাহীন মানুষের কাছে গেলেই বোঝা যায়। কেননা একজন শিক্ষিত মানুষের প্রতি তাদের বিরাট শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসার প্রকাশ দেখা যায়। নিজের নাম লিখতে না পারা ও নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস বোঝার জন্য যখন এ শিক্ষাহীন মানুষগুলো শিক্ষিতদের দিকে অসহায়ের মতো চেয়ে থাকে। নিজেদের অন্ধ বলে সম্বোধন করেন।

শিক্ষিত লোক যদি বানিয়ে বানিয়ে অযৌক্তিক সব গল্পও ওই সমস্ত লোককে শোনান তবুও তারা পরম বিশ্বাসে সেগুলো আমলে নেবে। কেননা শিক্ষিত মানুষদের প্রতি রয়েছে তাদের অগাধ বিশ্বাস। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের শিক্ষিত সমাজের। এ শিক্ষিত সমাজ ওই মানুষগুলোর দিকে একটু তাকাবার সুযোগ পর্যন্ত করতে পারেন না। কেননা শিক্ষিত হওয়ার দরুন তাদের নজর হয়ে যায় উপরমুখী। নিচের দিকে নজর পড়তে চায় না সহজে।

শিক্ষিত লোকদের প্রতি শিক্ষাহীন মানুষের ভাবনাটা যেমন নিষ্পাপ। ঠিক শিক্ষাহীন মানুষগুলোর প্রতি শিক্ষিত সমাজের মনোভাব তার উল্টো। আমাদের শিক্ষিত সমাজের কাছে শিক্ষাহীন লোক মানেই মূল্যহীন। অথচ এরকম কোনো না কোনো অশিক্ষিত মানুষের কষ্টের ফল একজন শিক্ষিত মানুষ।

হয়ত তার বাবা নয়ত তার বড় ভাই, নয়ত তার বাবার বাবা পড়াশোনা না করে চাষাবাদ কিংবা অন্য পেশায় নিজেকে ডুবিয়ে সম্পদ করে রেখে গেছেন সেটার সুবাদে আপনি শিক্ষিত হয়েছেন।

যাই হোক, আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য এটা নয়। আমাদের শিক্ষিত সমাজের সামান্য কিছু খামখেয়ালিপনার জন্য সাধারণ মানুষ তথা শিক্ষাহীন মানুষগুলো থেকে শিক্ষিত সমাজের যে দূরত্ব বেড়ে চলেছে সেটা নিয়ে আলোচনা করব। দেশের শিক্ষিত মানুষেরা শিক্ষিত মানুষের সঙ্গেই ওঠাবসা করেন। একজন পাবলিক ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেমেয়ে এলাকায় এসে ঠিকই অন্য আর একজন ভার্সিটিতে পড়ুয়া ছেলে কিংবা মেয়ের সাথে আড্ডা দিয়ে থাকেন।

এটাকে আবার সমাজের কিছু মানুষ বাহবা নিয়ে থাকেন। মানিকে মানিক চেনে, ভালো ছেলেমেয়েরা ভালো ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই মেশে এমন নানা বিশেষণ জুড়ে দেন। আর যদি আশপাশে ভার্সিটি পড়ুয়া বন্ধু না মেলে বাজারে গিয়ে নির্দিষ্ট কিছু দোকানে বসে সময় কাটিয়ে অন্যরকম একটা ভাবমূর্তি নিজের ভেতর ধারণ করে ঘুরে বেড়ান। অথচ এ সমস্ত ছেলেমেয়েকে নিয়ে কিন্তু গোটা গ্রামের মানুষ বিভিন্ন সময়ে অনেকটা গর্ব করেই বলে বেড়ায়- অমুকের ছেলে পাবলিক ভার্সিটিতে পড়ে।

এ ভার্সিটিতে পড়ুয়া উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা যদি তাদের এলাকায় ফিরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সময় দেন, ভার্সিটির গল্প, শহরের গল্প করেন তাদের সঙ্গে তারা কতই না আনন্দ পাবেন। কত কিছুই না শিখতে পারবেন।

অনেকে আছেন যারা কর্মের জন্য গ্রাম থেকে বের হতেই পারেন না। শহর তাদের কাছে এক স্বপ্নরাজ্যের নাম। যে যে বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেন সে যদি সেই বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান সাধারণ মানুষদের শোনান তারা অনেক সন্তুষ্ট হবেন।

সঙ্গে আপনার প্রতি তাদের ভাবনাচিন্তার বিরাট পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে। এছাড়াও এলাকার যে ছেলেমেয়েরা মেধা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারার বশে অন্য সব কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তাদের সময় দিয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিতে পারেন তাহলে একদিকে যেমন তারা উপকৃত হবেন অপর দিকে আপনাকে তারা তাদের রোল মডেল হিসেবে বিবেচনা করবেন।

একইভাবে, যে শিক্ষিত সমাজ শিক্ষার গণ্ডি পার হয়েই চাকরিজীবনে প্রবেশ করেন, তাদের দৈনন্দিন রুটিনে এক বিরাট পরিবর্তন আনেন। ডিউটি শেষে এটা ওটা করে সময় কাটান। নিজের ভেতর এমন একটা ভাবমূর্তি লালন করেন যে উনি চাঁদ জয় করেছেন!

এটার জন্যই কি আপনি পড়াশোনা করেছেন? তারা যে যে সেক্টরে চাকরি করেন সেই সেক্টর সম্পর্কে যদি অবসর সময়ে এলাকার সাধারণ মানুষদের সময় দেন তাহলে সাধারণ মানুষ কতটা উপকৃত হবে সেটা ভাবা যায় না। যে কৃষি অধিদফতরের অধীনে কাজ করেন তিনি এলাকার কৃষকদের পরামর্শ দিন।

যিনি ব্যাংকে চাকরি করেন তিনি এলাকার সাধারণ মানুষদের বিভিন্ন ব্যাংক সুবিধা নেওয়ার পরামর্শ দিন। যিনি শিক্ষকতা করেন তিনি এলাকার অভিভাবকদের সঙ্গে সময় দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে পরামর্শ দিন। দেখবেন নিজের ভেতর কতটা তৃপ্তি অনুভূত হবে।

এলাকার যে ছেলেমেয়েরা চাকরি না পেয়ে বেকার বসে আসেন তাদেরও সময় দিন। চাকরি পাওয়ার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরামর্শ দিন। নতুবা আত্মকর্মসংস্থান কিংবা ব্যবসা করার পরামর্শ দিন। দেখবেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে আপনার স্বর্গীয় সম্পর্ক সৃষ্টি হবে। সবার কাছে নিজের অজান্তেই হয়ে উঠবেন একজন ভালো মানুষ!

এস আর শানু খান : বিবিএ (ফাইনাল ইয়ার), ব্যবস্থাপনা বিভাগ
সরকারি এম এম কলেজ, যশোর