বইয়ের ভুবনে

ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

বইয়ের ভুবনে

সাদিক আল আমিন ৭:২৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

print
বইয়ের ভুবনে

ফেব্রুয়ারি মাসটা বরাবরের মতোই পাঠক ও লেখকদের জন্য এক মাসের দীর্ঘ ঈদযাপনের মতো। কিন্তু দীর্ঘ সময়কেও যেন খুব ক্ষীণ মনে হয়। কীভাবে যে একটা মাস কেটে যায় টেরই পাওয়া যায় না। বইপ্রেমীদের জন্য বইমেলা প্রাণের এক মিলনস্থল। লেখক-পাঠকের দূরত্ব ঘোচে বইমেলায় এসে। পাঠক যেমন তার প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নেওয়া বই কিনে আনন্দিত হয়, লেখকও তেমনি তার পাঠকদের উপস্থিতি দেখে উৎসাহ বোধ করে।

প্রতিবারের চেয়ে এবার প্রকাশনীর সংখ্যা বেশি। নতুন কিছু প্রকাশনা সংস্থা তাদের ভালো মানের বই, চমৎকার মুদ্রণ দ্বারা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পাশাপাশি বহু বছর ধরে চলে আসা উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানাধীন প্রকাশনা সংস্থাগুলো তো আছেই! তারা বরাবরই ভালো মানের বই পাঠকদের উপহার দিয়ে আসছে। বইমেলা কিন্তু এখনো হয়ে আছে হুমায়ূনময়।

অন্যপ্রকাশের স্টলের শীর্ষে তিনি সহজ-সরল দীপ্তিমান এক নক্ষত্রের মতো হাতে কিছু লেখার কাগজ নিয়ে চেয়ে আছেন। অন্যপ্রকাশের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের সম্পর্কও ছিল ভালো। তার বেশিরভাগ বই সেখান থেকেই ছাপা। পাঠকদের আজও হুমায়ূন আহমেদের বই কিনতে স্টলে ভিড় করতে দেখা যায়। তবে হুমায়ূন না থাকলেও আমরা আরও কিছু অসাধারণ লেখক পেয়েছি, যারা হয়তো একদিন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন!

মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক প্রমুখ বরাবরের মতোই বেস্ট সেলিং রাইটার। তাদের বই হট কেকের মতো চলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তরুণ কিছু লেখকও সাফল্যের ছাপ রাখছেন। তাদের সহযোগিতায় তরুণ প্রকাশকরা তো আছেনই! শাহাদুজ্জামানের মতো কথাসাহিত্যিকরা ইতোমধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তাদের মতো আরও অনেকে উঠে আসবে। অনেক কবিও পাঠকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।

প্রতিবারের মতো এবারও মেলায় কবিতার বই বেশি। তবে জনপ্রিয়তায় গল্প-উপন্যাস এগিয়ে। দেশের মানুষ সম্ভবত বেশ কাব্যিক। তাই তো কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা উপন্যাস কিংবা গল্পগ্রন্থের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি। তবে, কবিতাকে ব্যঙ্গ করে আমি কিছু বলছি না। আমার সাহিত্যচর্চার শুরুও কবিতা থেকে। কবিতায় সে স্পন্দন ধ্বনিত হয়, যা গল্পে পাওয়া সম্ভব নয়। কবিতার একেকটি লাইন যেন একেকটি উপন্যাস, জীবনী, চিত্ররূপের সমষ্টি!

প্রাচীন যুগে সাহিত্যচর্চার প্রথম এবং প্রধান মাধ্যমই ছিল কবিতা। আমরা কবিতা কিংবা কবিকে কখনো হেয় করি না, বরং লেখকদের থেকেও উঁচু ভাবি। আসলেও তাই, বৃহৎ মনের ভাব ক্ষুদ্র করে একমাত্র কবিতাতেই প্রকাশ করা সম্ভব। এবারে কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন কবি মাকিদ হায়দার। তবে আমার গদ্য প্রিয়তর। কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন ওয়াসি আহমেদ। তিনি নিঃসন্দেহে একজন ভালো লেখক।

তবে কেবল সাহিত্যের মূল বিষয়ে সীমাবদ্ধ থেকে পাঠকরা কখনো কখনো ভুলে যায় সাহিত্যের কিছু অংশ। অনুবাদ, ভ্রমণ, আত্মজীবনী, নাটক, আলোচনা, প্রবন্ধ ইত্যাদিও যে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বরাবরের মতোই প্রকাশ হয়ে আসছে। তা পাঠকরা মনে রাখে না। রাখলেও এতে তাদের উৎসাহ খুব একটা বেশি নেই।

কারণ, চমৎকার সব গল্পের দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়ার বদলে কে এসব কাঠখোট্টা প্রবন্ধ-আলোচনায় উৎসাহী হবে! এটাও আমাদের পাঠকদের এক ধরনের সীমাবদ্ধতা। তবে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে না উঠলে আপনার প্রজ্ঞা বিকশিত হতে বাধাপ্রাপ্ত হবে। একটি প্রবন্ধ পড়ে একজন পাঠক যে জ্ঞান-তথ্য-নির্দেশনা আহরণ করে, একটি গল্প পড়ে তার করতে পারে না। তাই বিকশিত মনের সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত জ্ঞানচর্চাও উত্তম। এবার প্রবন্ধ ও গবেষণায় এবার একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন স্বরোচিষ সরকার।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম), অনুবাদে খায়রুল আলম সবুজ, আত্মজীবনী/ স্মৃতিকথা/ ভ্রমণে ফারুক মঈনউদ্দীন, বিজ্ঞান/ কল্পবিজ্ঞানে নাদিরা মজুমদার, নাটকে রতন সিদ্দিকী, শিশুসাহিত্যে রহীম শাহ এবং ফোকলোরে সাইমন জাকারিয়াকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তাদের পুরস্কৃত করা প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের পাঠ-বিচরণ থাকা উচিত। তারা কী বলতে চায়, কী তাদের অভিব্যক্তি; জানা উচিত। এতে তাদের উৎসাহ দ্বিগুণ পরিমাণে বাড়বে। কেবল গল্প-উপন্যাসে সীমাবদ্ধ থাকার প্রবণতা অবশ্য পরিহার্য।

নিয়মিত লেখকদের পাশাপাশি তরুণ লেখকদের লেখা এবং তাদের নতুন রূপের চিন্তাধারা বইয়ের কথাকে সমৃদ্ধ করছে। তবে একটা সত্য কথা, প্রকাশকরা নতুন লেখক-কবিদের গ্রন্থ প্রকাশে ঝুঁকি নিতে চান না। প্রকাশ করলেও সেটা লেখকের টাকাতেই হয়। লেখকের কাজ লেখা, প্রকাশকের উচিত তার লেখার মূল্য দেওয়া। এটাই হওয়া উচিত, এটাই হওয়ার কথা। তবে কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও আছে যারা পাণ্ডুলিপি পুরস্কার দিয়ে থাকেন। এটা অবশ্যই প্রশংসা করার মতো। পুরাতন প্রকাশনালয়গুলোর মতো নতুনগুলোও আশা করি তাদের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট হবে।

উৎসাহী পাঠকদের প্রাণের বইমেলায় গিয়ে তাদের মনের মতো বই সংগ্রহ করা উচিত। বহু টাকাই জীবনে চলে যায়, আবার আসে। কিন্তু একটি ভালো বই থেকে পাঠলুব্ধ জ্ঞান কখনো মলিন হয় না। সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায় আবারও বলতে চাই, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। আগ্রহী পাঠকরা তাই অমর একুশে গ্রন্থমেলায় নির্দ্বিধায় বইয়ের সান্নিধ্যে যেতে পারেন। জ্ঞানে-তথ্যে-উৎসাহে-আনন্দপনায় ভরে উঠুক পাঠকের জীবন!

সাদিক আল আমিন : শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ 
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সদর, দিনাজপুর
sadikalamin75@gmail.com