গণমাধ্যম ও সামাজিক দায়িত্ব অলোক আচার্য

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৬

গণমাধ্যম ও সামাজিক দায়িত্ব অলোক আচার্য

অলোক আচার্য ৯:৪২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২০

print
গণমাধ্যম ও সামাজিক দায়িত্ব অলোক আচার্য

বর্তমান বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশে গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জোরাল ভূমিকা পালন করতে হয়। আজকের বিশ্বে গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত কর্মীরা কতটুকু স্বাধীনভাবে নিজেদের কাজ করতে পারছেন বা নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। সে হিসেবে স্তম্ভটি হওয়া উচিত অত্যন্ত শক্তিশালী। কোনো দেশের উন্নয়নে মুক্ত গণমাধ্যম অন্যতম শর্ত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া উচিত। কারণ গণমাধ্যম রাষ্ট্রের পরিচালিত ব্যবস্থার খুঁটিনাটি দিকগুলো চিহ্নিত করে এবং তা বিশ্লেষণ করে সমাধানের পথ বাতলে দেয়। গণমাধ্যমের প্রকার এখন বিস্তৃত।

টেলিভিশন চ্যানেল, প্রিন্ট পত্রিকা এবং রেডিওর সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন পত্রিকা, অনলাইন টিভি এবং অনলাইন রেডিও রয়েছে প্রচুর। প্রতিদিন নতুন নতুন পত্রিকা বের হচ্ছে। জানার ইচ্ছা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এ সহজাত প্রবৃত্তি পূরণের জন্যই গণমাধ্যমগুলো কাজ করে। এর সাথে যুক্ত কর্মীরা প্রতিনিয়ত মানুষের তথ্য জানার আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে তা সংগ্রহ এবং প্রচার করছে। তথ্য জানানোর কাজটি সবক্ষেত্রে সহজ হয় না।

অনেক সময় ক্ষমতাশালীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই তাকে তার কাজ করতে হয়। হরহামেশাই সাংবাদিককে তথ্য সংগ্রহের সময় হয়রানির শিকার হতে হয়। এতকিছুর পরেও সে সেসব বাধা উপেক্ষা করেই তার কাজ চালিয়ে যায়। প্রতিটি মুহূর্তে একজন গণমাধ্যমকর্মীর ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে যেতে হয়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। তাই তথ্য জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। আর তথ্য জানানোর দায়িত্বও রয়েছে। সেজন্য গণমাধ্যমকে সমাজের আয়না হিসেবে পরিগণিত করা হয়। আয়নায় যেরূপ নিজের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গণমাধ্যমেও সমাজের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই ছবি ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব নেন গণমাধ্যমকর্মী।

দেশে এখন শত শত পত্রিকা। জাতীয়, স্থানীয়, সাপ্তাহিক মাসিক পাক্ষিকসহ বিভিন্ন পত্রিকা টেলিভিশন এবং অনলাইনে কাজ করা সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে লাখ লাখ সাংবাদিক। পত্রিকায় কাজ করা প্রান্তিক পর্যায়ের সাংবাদিকদের পরিশ্রম করতে হয় ঠিকই কিন্তু তাদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেওয়া হয় না। পত্রিকা প্রকাশের বিজ্ঞাপন দিলেই প্রচুর সংখ্যক আবেদন পাওয়া যায় সাংবাদিকতা করার জন্য। তারা এটা জানে যে এখান থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে না। সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত থাকা সম্মানের জন্যই মূলত এত আগ্রহ দেখা যায়।

সংবাদ সংগ্রহের বিপরীতে তাদের আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব দেশ এবং বিদেশের সংবাদ প্রকাশ এবং বিশ্লেষণ করে জনগণকে সচেতন করে। এছাড়া বিনোদন এবং শিক্ষামূলক কাজেও গণমাধ্যম যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে প্রতিনিয়তই। গণমাধ্যমে জনগণের আশা আকাক্সক্ষার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে।

গণমাধ্যম তখনই সার্থকতা পায় যখন জনগণের উপকারে এসে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। এজন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মুক্ত প্রকাশ সর্বাগ্রে প্রয়োজন। সারা বিশ্বেই গণমাধ্যমকর্মীদের নানাভাবে নির্যাতিত হতে হয়। জেল জরিমানা হুমকি ধমকি এসব সহ্য করতে হয়। তারপরেও গণমাধ্যমকর্মীদের সংবাদ সংগ্রহ থেমে থাকে না।

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের সৈনিকদের থেমে থাকলে চলে না। ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়। ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চিরকালের। গণমাধ্যম বরাবরই দুর্বলের পক্ষে থেকে লড়াই করে। তাই এ পথটা বেশ কঠিন হয়। গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা। রাষ্ট্রের একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত উন্নয়নে কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখা। জনগণের প্রাপ্য জনগণ ঠিকমত পাচ্ছে কিনা তাও দেখার দায়িত্ব রয়েছে। গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা সমাজের সবক্ষেত্রে আবশ্যক। সরকারের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত জনগণকে অবহিত করার কাজটিও গণমাধ্যম করে থাকে। গণমাধ্যম হলো উন্নয়নের অংশীদার।

দেশকে উন্নত করতে হলে মুক্ত গণমাধ্যমের বিকল্প নেই। যে দেশ গণমাধ্যমকে মুক্তভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে সেসব দেশ এগিয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই আজকাল মুক্ত গণমাধ্যমচর্চার সুযোগ নিয়েই মূলধারার বাইরের কিছু গণমাধ্যম নামের লেবাসধারী সমাজে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছাড়ানো এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়ায়। এটা সমাজের জন্য হিতকর নয় এবং গণমাধ্যমের কাজও এটা নয়। এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক এবং এসব গণমাধ্যম তার উদ্দেশ্য সাধন করেই শেষ হয়।

সাংবাদিকরা জনগণের ভেতরের শব্দ ফুটিয়ে তোলেন। সেক্ষেত্রে বলা যায়, সাংবাদিকতা একটি ক্ষমতা। তবে এ ক্ষমতা মানুষের জন্য, কোন ব্যক্তি বিশেষকে সন্তুষ্টি করার জন্য নয়। ক্ষমতা শব্দটি দায়িত্বশীলতার প্রতি দায়বদ্ধ থাকাই উত্তম। এর অর্থ আপনার ক্ষমতাকে দায়িত্বে রূপান্তর করা উচিত। কেননা, কলম তরবারির চেয়েও শক্তিশালী। গণমাধ্যমকর্মীর যুদ্ধ কলম দিয়ে।

এই যে আজ বাংলাদেশে শত শত গণমাধ্যম রয়েছে এবং প্রতিদিন আরও গণমাধ্যম যোগ হচ্ছে তার ওপর সাধারণ মানুষ কতটুকু আস্থা রাখতে পারছে বা পাঠক কতটুকু সময় সেই গণমাধ্যম দেখছে। গাড়িতে প্রেস লিখে অনেকে অপকর্মের সাথে যুক্ত হচ্ছে।

অলোক আচার্য : শিক্ষক ও কলাম লেখক, পাবনা
sopnil.roy@gmail.com