আইন না মানার সংস্কৃতি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৬

আইন না মানার সংস্কৃতি

আবু আফজাল সালেহ ৯:৩০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২০

print
আইন না মানার সংস্কৃতি

দেশে আইন না মানার সংস্কৃতি আছে। ইচ্ছাকৃত আইন না মানার রেওয়াজ আছে প্রভাবশালীদের। তেমনি নিরীহদের ওপর আইন অপপ্রয়োগ হয় দেশে। উন্নয়নের সুবিধা কারা বেশি পাচ্ছে? ডিজিটাল দেশের বেশি একসেস বা সুবিধা পাচ্ছে উচ্চশ্রেণিরা। সাধারণ নাগরিক কম সুবিধাই পাচ্ছেন। সুবিধা পেতে তাদের অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। বলা যায় চারিদিকে দুটো শ্রেণি। চরম সুবিধাবাদী, নাহয় চরম সুবিধাবঞ্চিত। মাঝামাঝিদের চরম দুর্ভোগ, তাদের ভোগান্তি পথেঘাটে। আইন তার নিজের গতিতে চলছে কম। চালাতে হয়। রসদ দিতে হয়।

আইনের প্রয়োগ যথার্থ হয় খুব কমই। আইনে সুযোগ পেতে মিডলম্যান ধরতে হয়। আদালতে উকিল অন্যক্ষেত্রে ক্ষমতাবান। দু’দিকেই আর্থিক রসদ লাগে। আইন যদি তার নিজের গতিতে চলে তাহলে সুশাসন আসতে বাধ্য। সংবিধানেও আইনের সুশাসনের কথা বলা আছে। সুষম বণ্টনের কথা বলা আছে। সমাজে পিছিয়ে পড়াদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারকে দেওয়া আছে। সরকার বৈষম্য নিরসনে কাজ করছে। বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু সাধারণ নাগরিক বিভিন্ন কারণে শতভাগ সুবিধা নিতে পারছে না!

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে দ্বিগুণ। ২০১৭ সালে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হন পাঁচ যুবক। তাদের মধ্যে ছিলেন আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ।

প্রথম কয়েক দিন এ ঘটনায় ব্যাপক হইচই হয়। ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হওয়ার পর আসামিরা ধরাও পড়েন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। ঘটনা প্রতিদিনের। কিন্তু সমাধান হয় না! বলছি নারী নির্যাতন বিষয়ে; ধর্ষণ ও ধর্ষণ শেষে খুন নিয়ে। বা বলা যেতে পারে নারীর প্রতি সহিংসতা বা মানসিক নির্যাতন নিয়ে!

সবচেয়ে বড় সমাধান হচ্ছে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। মানুষ হিসেবে আমাদের লজ্জাতে মাথা লুকাবার প্রেস পাওয়ার কথা নয়। তাই এখনই নেতিবাচক মনোভাব ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন দরকার। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা পরাবে কে! আমরা যারা প্রভাব বিস্তার করতে পারি তাদের বেশিরভাগেরই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা মুখে বলি এক আর মনে ধারণ করি অন্যটা। আর বাস্তবায়ন করি তৃতীয়টা।

ধর্ষণ বা খুনের বিচার চেয়ে আন্দোলন বা মানববন্ধন করতে হয় আমাদের দেশে। জাতি হিসেবে এটাই লজ্জাকর বিষয়। আবার এর মধ্যেও বৈষম্য বিদ্যমান। ঢাকার ক্ষেত্রে এক রকম। অন্য শহরের ক্ষেত্রে একটু ভিন্ন। মফস্বল গ্রাম-শহরের ক্ষেত্রে আরও বৈষম্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ নিগৃহীত হলে আর সাধারণ এক মেয়ে ধর্ষিত হলে একই অবস্থা সৃষ্টি হয় না! গুরুত্বপূর্ণ হলে ত্বরিত ব্যবস্থাও হয় দেশে। ব্যতিক্রমও হয়। তবে সংখ্যায় কম। গণমাধ্যমে গুরুত্বের রকমফের আছে। বৈষম্য এখানেও আছে। প্রচারে আড়ালে থাকে সাধারণ ভুক্তভোগী। এ থেকে নিষ্কৃতি পেতেই হবে।

বৈষম্য নিরসনে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক বেষ্টনীমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু এখানেও বৈষম্য থেকেই যায়। সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি করছে কারা? উচ্চ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই তো! ফলে যোগাযোগ বা অন্ধকারে থাকারা বেশিরভাগই অন্ধকারে থেকে যাচ্ছে। এসব আলোচনা থেকে মনে পড়ে কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের কথা। তার মধ্যের একটি লাইন, ‘ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না...’।

অবিচার ও অনাচার রুখতে গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের চাপ বাড়াতে হবে। আমরা দেখেছি, টাঙ্গাইলে রূপাহত্যার পর মাত্র ১৪ কর্মদিবসে এবং ফেনীর নুসরাত জাহান রাফী হত্যার বিচার ৬১ কর্মদিবসের মধ্যে আসামিদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। নুসরাত হত্যায় গণমাধ্যমের কঠোর অবস্থানের প্রশংসাও করেছিল আদালত। তবে অজানা কারণে তনু হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়নি। প্রবলচাপে কুর্মিটোলায় ঢাবি ছাত্রীর ধর্ষক ‘সিরিয়াল রেপিস্ট’ খুব অল্পসময়েই গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

প্রায় একই সময়ে ঢাবিতে চা-বিক্রেতা মামার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মেয়ের বিচার চেয়ে প্রায় একাই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শিশুরাও ধর্ষিত হচ্ছে এ শহরে। ধর্ষণের পর হত্যাও করা হচ্ছে শিশু-নারীদের। বেশিরভাগ আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এগুলো নিয়েও গণমাধ্যমে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। নারীকে নিরাপদ পরিবেশ করে দেওয়া আমাদেরই দায়িত্ব।

সৃষ্টিকাল থেকেই সমাজের বিভিন্ন স্তরে বৈষম্য বিদ্যমান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার বৈষম্য দূরীকরণে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা আন্তরিকও। এখন আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সরকারের সাথে একসাথে কাজ করতে হবে। তবেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার আশা পূরণ করা যাবে। ‘মুজিববর্ষ’-তে এটা হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।

আবু আফজাল সালেহ : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
abuafzalsaleh@gmail.com