সামাজিক মূল্যবোধ জাগুক মোহাম্মদ

ঢাকা, সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৫ ফাল্গুন ১৪২৬

সামাজিক মূল্যবোধ জাগুক মোহাম্মদ

নজাবত আলী ৯:৪৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২০

print
সামাজিক মূল্যবোধ জাগুক মোহাম্মদ

যে সমাজে বাস করছি সেখানে এতটাই অবক্ষয় শুরু হয়েছে, রোধ করতে না পারলে সমাজে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। এখানে কারও জীবনের যেমন কোনো নিরাপত্তা নেই। তেমনি মানসম্মান ইজ্জত নিয়ে বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছে। নারীরা কোনো না কোনোভাবে প্রতিদিন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র।

একজন মানুষকে এ তিন স্তরে জীবনযাপন করতে হয়। তাই আমাদের সমাজ রাষ্ট্র যদি সুন্দর, সুস্থ সংস্কৃতির পরিবর্তে অসুস্থ সংস্কৃতি, বিকৃত কুরুচিসম্পন্ন মানুষের কারণে নারীরা বারবার নানাভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় তাহলে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম কী শিখবে?

নারীরা আমাদের সমাজের একটি বৃহৎ অংশ। নারীকে বাদ দিয়ে কোনো সমাজ যেমন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে না, তেমনি একজন নারীর প্রধান সম্পদ তার সম্ভ্রম। অথচ এ নারীরা প্রতিদিন যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। কেউ শারীরিক, কেউ মানসিকভাবে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হওয়ায় প্রতিনিয়ত নারীরা বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছে।

সমাজে এক শ্রেণির বখাটে যুবক আছে তারা পথে-ঘাটে নারীকে দেখলেই ফিসফিস করে। স্কুল কলেজগামী মেয়েদের দেখলে তারা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে। আবার কখনো কখনো নারীকে দেখলেই তারা বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন মন্তব্য করে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি অভিভাবক, শিক্ষক, মা-ও নিহত হয়েছেন। এটা সবার জানা। সমাজে বখাটে যুবকদের উৎপাত বেড়ে গেছে।

একটি সমাজ শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে, শিক্ষার প্রসার লাভ করলেই বা শিল্প স্বার্থের উন্নতি হলেই সব ঠিক আছে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে এগুলো একটি দেশের অগ্রগতি, সমৃদ্ধির পরিচয় বহন করে। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে মানবিক চেতনা জাগ্রত হয়েছে কি-না, সামাজিক মূল্যবোধ শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে কি-না, সমাজের বখাটেদের উৎপাত বন্ধসহ সর্বোপরি মানবিক বোধসম্পন্ন সমাজ গড়ে উঠেছে কি-না, দিকগুলো অবশ্যই ভাববার বিষয়। কেননা এগুলোই সাধারণত একটি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সমাজকাঠামোকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়।

আজ স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও আমাদের সমাজকাঠামোর পরিবর্তন হয়নি। ভঙ্গুর অবসাদগ্রস্ত এক সমাজে আমরা বাস করছি। তাই আমাদের সমাজ কতটা এগিয়েছে- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চোখে সামাজিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ চিত্রই ভেসে ওঠে। এ চিত্র হতাশার, আশঙ্কার। কারণ সামাজিক অবক্ষয় দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করেছে। হেন কোনো অপরাধ নেই সমাজে ঘটছে না। যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ, বখাটেদের উৎপাতে স্কুল-কলেজগামী নারীরা আজ হত্যার শিকার হচ্ছে। কখনো কুপ্রস্তাব বা প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় চড়াও হয় নারীর ওপর। আবার কখনো কখনো অশোভন আচরণ থেকে রক্ষা পেতে অনেক নারী আত্মহত্যার পথও বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এসব ঘটনায় স্বজন হারানোদের আর্তনাদ আমাদের ব্যথিত করে। সুস্থ চিন্তা ও শুভবুদ্ধির বিপরীতে দিনে দিনে সমাজটা ক্রমেই অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। আসলে আমরা যে সমাজে বাস করছি সে সমাজ নিরাপত্তা দিতে পারছে না।

একসময় যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে এবং সভ্যতার জগতে মানুষ প্রবশে করে। মানুষ আস্তে আস্তে সভ্যতার পাঠ নিতে শুরু করে। পূর্বপুরুষরাও এক উন্নত সভ্যতার সংস্পর্শে থেকেও ভালো দিকগুলো গ্রহণ না করে মন্দ দিকগুলো গ্রহণ করে। পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুর ভালো মন্দ দুটি দিক রয়েছে। লোভ-লালসা মানুষকে মন্দের দিকে ঠেলে দেয়। হিংস্র দানবে পরিণত করে। সভ্যতার ভালো দিকগুলো মানুষকে পরিশুদ্ধ করে, স্বচ্ছ করে, মহৎ করে মানবীয় গুণের অধিকারী করে গড়ে তোলে। কিন্তু দুর্ভাগ্য অধিকাংশই এখনো প্রকৃতপক্ষে সভ্য হয়নি। যার কারণে সমাজে নানা ধরনের অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। লোভ, ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে মানুষের জীবন আজ অতি তুচ্ছ।

এগুলো মনুষ্যত্বের জাগরণে বাধা সৃষ্টি করে মানুষকে দানব করে। সে মানুষরূপী দানবের হাত থেকে আজ শিশু নারী, শিক্ষার্থী, গৃহকর্মী কেউ নিরাপদ নয়। তাই আজ নারী ও শিশু নানাভাবে নির্যাতনের শিক্ষার হচ্ছে। অতি সামান্য বা তুচ্ছ ঘটনায় শিশুদের জীবনপ্রদীপ নিভে যাচ্ছে। অথচ সবার আগে শিশুদের নিরাপত্তা প্রয়োজন। কিন্তু সে শিশুরা আজ ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়।

হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অপহরণসহ বিভিন্ন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। পৃথিবীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা বৃদ্ধির বিপরীতে এক ধরনের কুরুচি বিকৃত মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। এটা বেশিরভাগ দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত তরুণের মাঝে। নৈতিক শিক্ষার অভাব, বেকারত্ব, হতাশা তরুণ সমাজে প্রবেশ করেছে। তাদের মন মানসিকতা এমনভাবে গড়ে উঠেছে কোনো কিছুই অপ্রাপ্তিতে বিশ্বাসী নয়। অর্থাৎ তাদের বদ্ধমূল ধারণা ও অন্ধবিশ্বাস তাদের মনে এমনভাবে দানা বেঁধেছে, তাদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বখাটে, উচ্ছৃঙ্খল অবসাদ, বিকারগ্রস্ত এক শ্রেণির তরুণ আছে যাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে নারীর ওপর নেমে আসে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন।

সবার আগে নিজ নিজ পরিবারকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগাতে হবে। কারণ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যা দিতে পারে না পরিবার সেটা দিতে পারে। পরিবারই হচ্ছে প্রাচীনতম সংগঠন এবং নৈতিক শিক্ষার আঁতুড়ঘর। সে আঁতুড়ঘর আজ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। মোটা দাগে বলতে গেলে গোটা সমাজব্যবস্থাকে আরও মানবিক করে তুলতে পারলে সামাজিক, শৃঙ্খলা আরও সুদৃঢ় হবে। তাই নতুন ও অনাগত প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে। তাদের কোমল হৃদয় ও মানসপটে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন ভবিষ্যতে রেখাপাত করতে না পারে। এ জন্য একটি সুন্দর, সুস্থ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।

কোনো সমাজে শৃঙ্খলা না থাকলে বিভিন্ন ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেবে। গত বছরে ফেনীর নুসরাত জাহান রাফীকে এক মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীরা আগুনে পুড়িয়ে হত্যা ও বরগুনার রিফাত নামে এক যুবককে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা দুটি মর্মস্পর্শী ঘটনা। এটা নতুন প্রজন্মের কোমল মানসপটে কি বিষাদের ছায়া ফেলছে না?

প্রতিদিন আমরা দেখি সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র। দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক এসব চিত্র দেখে বড় হয়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এ বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে সামাজিক মূল্যবোধ। তাদের চিন্তা, চেতনা, ধ্যান ধারণাকে প্রসারিত করতে হবে সামাজিক মূল্যবোধ ও শিক্ষার মাধ্যমে। তাদের সুকোমল অন্তরে সত্য, সুন্দরের গুণাবলি দ্বারা মানবিক করে গড়ে তুলতে হবে। একজন নারীকে শুধু নারী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

অবমাননা, নিপীড়ন, লাঞ্ছিত করার মনোবৃত্তি পরিত্যাগ না করলে নতুন প্রজন্ম এ সমাজ, রাষ্ট্র থেকে কী শিখবে? কারণ সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে নতুন প্রজন্ম তাদের বেড়ে ওঠার জন্য সুস্থ সামাজিক পরিবেশ চায়। সুস্থ মন মানসিকতা নিয়ে তাদের বেড়ে ওঠার সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি নারী নির্যাতন, সামাজিক অবক্ষয় রোধে মানবিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সময়ের দাবি।

মোহাম্মদ নজাবত আলী : সহকারী শিক্ষক
চামরুল উচ্চ বিদ্যালয়, দুপচাঁচিয়া, বগুড়া