বায়ুদূষণ : প্রয়োজন সচেতনতা

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩ আশ্বিন ১৪২৭

বায়ুদূষণ : প্রয়োজন সচেতনতা

সাহাদাৎ রানা ৯:২৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২০

print
বায়ুদূষণ : প্রয়োজন সচেতনতা

বায়ুদূষণ, বর্তমান নাগরিক সমাজে আমাদের অনেক সমস্যার মধ্যে অন্যতম একটি প্রধান সমস্যা। দিনকে দিন এ সমস্যার কারণে আমাদের জীবনব্যবস্থায় পড়ছে বিরূপ প্রভাব। কিন্তু এ নিয়ে সেভাবে কখনো কেউ ভেবে দেখি না আমরা। কিন্তু ভাবার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ এ বায়ুদূষণের বিষয়টি আমাদের জীবনব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সহজ কথায় সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বায়ুদূষণ রোধের বিকল্প নেই। কিন্তু দিন দিন বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষত রাজধানী ঢাকাতে বায়ুদূষণের মাত্রা ভাবিয়ে তুলেছে। ইতোমধ্যে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে বায়ুদূষণের মাত্রার ক্ষেত্রে। সম্প্রতি একটি তথ্য আমাদের সেই ভাবনায় বাড়তি ভয় যোগ করে দিচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীর দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান শীর্ষে।

কয়েক দিন আগে ঢাকা দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও সম্প্রতি আবারও ঢাকার অবস্থান উঠে এসেছে শীর্ষে। তবে শীর্ষে উঠার এমন খবর আমাদের মোটেও স্বস্তি বা আনন্দ দিচ্ছে না। বরং অস্বস্তির সঙ্গে কাজ করছে ভয়ও। ভয়টা সুন্দর ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রশ্নে। কারণ দূষিত বায়ুর শহরে আরও যাই হোক সুস্থভাবে বেঁচে থাকা কঠিন বিষয়। আর সেই কঠিন কাজটা দিন দিন কঠিনতর হচ্ছে।

আমাদের প্রিয় শহরে বায়ুদূষণের পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। প্রথমত ঢাকার বাতাস যে লাল ক্যাটাগরিভুক্ত তা সহজে অনুমেয়। বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বায়ুতে এর মাত্রা দিনকে দিন বেড়েই চলছে। ফলে এ শহর সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য সত্যিই দুষ্কর হয়ে উঠছে। শঙ্কার আরও খবর হলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় এক লাখের বেশি মানুষ রয়েছে মৃত্যুঝুঁকিতে। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকার বাতাসে দূষণ বৃদ্ধি পায় অন্তত প্রায় চার গুণ। এরপর বৃষ্টির মৌসুম এলেও বায়ুদূষণের মাত্রা সেভাবে হ্রাস পায় না। বরং বাতাসের গতি বেশি হওয়ায় তা উন্নীত হয় আরও শোচনীয় পর্যায়ে। এখন প্রশ্ন হলো এমন সময়ের মধ্যে আর কতদিন যেতে হবে। কবে নিস্তার পাব আমরা।
বায়ুদূষণ কেন হয়? এ প্রশ্নের উত্তরে রয়েছে অনেক কারণ। এবার সেই কারণগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। রাজধানীর বায়ুদূষণের একটি প্রধান কারণ আশপাশের অসংখ্য ইটভাটা। জনবসতির কাছাকাছি ইটভাটা না থাকার আইন থাকলেও বাস্তবতা হলো সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না।
বিস্ময়কর হলেও সত্য, বর্তমানে ঢাকার চারপাশে প্রায় হাজার খানেক ইটভাটা রয়েছে। ঢাকার বাতাসে অসহনীয় মাত্রায় ধাতুর উপস্থিতির জন্য অপরিকল্পিত ইটের ভাটা ৬০ শতাংশ দায়ী। বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা অন্যতম প্রধান কারণ বটে, তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়। এছাড়া রয়েছে আরও নানাবিধ বাস্তব ও মানবসৃষ্ট কারণ। এর একটি হলো মড়ার উপর খাঁড়া ঘা হয় শহরজুড়ে প্রায় সারা বছর কারণে-অকারণে খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজ। এসবই ঢাকার বাতাসে ধুলাবালির পরিমাণ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করে চলেছে। সীসাযুক্ত পেট্রোল আমদানি ও দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনবিশিষ্ট অটোরিকশার অবাধ চলাচল বায়ুদূষণের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। এসব ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশকে প্রতিনিয়ত দূষিত করছে। এছাড়া ঢাকার পাশে বিভিন্ন জায়গায় অবাদে গড়ে উঠাশিল্প-কারখানা আশঙ্কাজনকভাবে রাজধানীর বাতাসকে লাগামহীনভাবে দূষিত করে চলেছে। যা নিয়ে আমরা সেভাবে ভেবে দেখি না। কিন্তু আমাদের ভেবে দেখার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বায়ুদূষণের কারণে কী কী ক্ষতির সম্মুখীন হই আমরা। এর আগে একটি তথ্য সবাইকে অবাক করে দেবে। অবাক করা তথ্য হলো- বায়ুদূষণজনিত কারণে মৃত্যুহারে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন পঞ্চম। এটা আমাদের জন্য সত্যিই ভয়ের খবর। যদি এখনই সঠিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় তবে এ দেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়বে এক দশমিক তিন বছর। এমন তথ্য যেমন স্বস্তির, পাশাপাশি অস্বস্তিরও। কেননা, দিন দিন যেখানে প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণ হচ্ছে তাতে করে তা কবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে এটা সত্যিই বলা মুশকিল। কারণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যা প্রয়োজন তার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও বরং প্রতিদিন বায়ুদূষণ হওয়ার নানা উপলক্ষ দেখা যাচ্ছে। আর দিন দিন তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিনের বেলায় শহরের রাস্তায় পরিচালিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্প কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়ার মারাত্মক ধাতব উপাদানের পরিমাণ বাড়ছেই। যা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

পরিতাপের বিষয় হলো, ঢাকার বয়স ৪০০ বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মাণকাজ চলছে সেই ট্র্যাডিশন চলার মতোই। এ উদাহরণ পৃথিবীর আর কোনো শহরে মিলবে না। তবে বাস্তবতাকে উপেক্ষা না করেও এসব নির্মাণ দূষণমুক্ত প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করাটাই হবে যথার্থ। এখন প্রশ্ন হলো বায়ুদূষণের হাত থেকে রক্ষার উপায় কী? যেহেতু বায়ুদূষণের জন্য প্রধানত মানুষ দায়ী তাই এর প্রতিকারও মানুষের হাতেই। সঠিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে অতি সহজে এ বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর জন্য সবার আগে কিছু বাস্তব উদ্যোগ জরুরি। বিশেষ করে ঢাকার আশপাশের ইটভাটাগুলো দূরে সরিয়ে নিতে হবে। এখন উন্নত অনেক দেশে আধুনিক প্রযুক্ত ব্যবহার করে বায়ুদূষণ ছাড়াই তৈরি করা হচ্ছে ইট। আমাদের দেশেও এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইট তৈরি করলে অনেকাংশে দূষণ রোধ সম্ভব।

এখানে আরও একটি তথ্য ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। সেটা হলো বছরের প্রায় অর্ধেকের বেশি সময় ঢাকার বাতাসে অতিমাত্রায় দূষিত থাকে। সংখ্যার হিসেবে বছরে প্রায় অর্ধেকের বেশি সময়। এ থেকেই অনুমান করা যায় ঢাকার বায়ুদূষণ দিন দিন কতটা বিপজ্জনক হচ্ছে। সংখ্যাটা যদি আরও বৃদ্ধি পায় তবে তা হবে সবার জন্য আরও ভয়ানক খবর। যেভাবে এগিয়ে চলছে যদি এভাবে চলতে থাকে তবে দিন দিন আরও খারাপ হবে এটা অন্তত বলা যায়। এবার জানা যাক বায়ুদূষণের কারণে আমরা কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছি। ভয়াবহ খবর হলো ঢাকার বিপজ্জনকভাবে বায়ুদূষণের কারণে মানুষ দিন দিন অসুস্থ হচ্ছে। হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, এমনকি ফুসফুস ক্যান্সারসহ নানা রকম মরণব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলছে। এছাড়া নিঃশ্বাসের সঙ্গে ক্ষতিকর ধাতব পদার্থ শরীরে প্রবেশ করায় স্নায়ুজনিত অসুখ, মস্তিষ্কের রোগ এবং হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। সবচেয়ে ভয়ের কারণ হলো- বায়ুদূষণের কারণে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগব্যাধিতে। এটা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়ের খবর। অভিভাবক হিসেবেও উদ্বেগের তথ্য এটা সবার জন্য। সর্বোপরি নাগরিক হিসেবে তো অবশ্যই। বললে, অত্যুক্তি হবে না বায়ুদূষণ জীবনকে কী সাংঘাতিক ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এবং দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। মাত্রাছাড়া দূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, দৃষ্টিশক্তি হারানো, হৃদরোগ ও স্ট্রোক, ফুসফুসে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নগরবাসী। এ দূষিত বাতাস নীরব ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ফলে ত্বরান্বিত করছে অকালমৃত্যু।

মানবসৃষ্ট এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় যে একেবারে নেই তা নয়। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সচেতনতা ও আইনের প্রয়োগ। আমাদের সামান্য সতর্কতা আর সচেতনতায় অনেকাংশেই বায়ুদূষণ প্রতিরোধ সম্ভব। এক্ষেত্রে অবশ্য আরও প্রয়োজন পরিবেশ আইন ও বিধানের সঠিক প্রয়োগ। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই রাজধানীর বাতাসকে বিষমুক্ত করতে। এ জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগে বায়ু দূষণকারী শিল্পকারখানা, যানবাহন এবং অন্যান্য অনুসঙ্গকে নিষিদ্ধ করে তা উৎখাত করাই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নির্মাণ এবং স্থাপনাসহ অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। সবার মনে রাখতে হবে এসব সমস্যা সমাধানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা। এ জন্য প্রত্যেক নাগিরকের দায়িত্ব নিজের প্রিয় এ শহরকে দূষণমুক্ত রাখতে ভূমিকা রাখা। পাশাপাশি অন্যকেও এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা। তবেই সম্ভব বায়ুদূষণের কঠিন এ পরিস্থিতি থেকে নিজেকে ও দেশের মানুষকে রক্ষা করা।

সাহাদাৎ রানা : সাংবাদিক
shahadatrana31@gmail.com