অটোরিকশা : অনিয়মের দায় কার

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩ আশ্বিন ১৪২৭

অটোরিকশা : অনিয়মের দায় কার

সাজ্জাদ হোসেন ৮:৫৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২০

print
অটোরিকশা : অনিয়মের দায় কার

এক সময় ঢাকা শহরে সাধারণের ভাড়ায় চলাচলের জন্য বাস, রিকশা, সিএনজি-অটোরিকশা ছিল প্রধান যানবাহন। সাম্প্রতি সময়ে উবার ও পাঠাও নতুন করে সংযুক্ত হয়ে জনগণের কিছুটা হলেও যাতায়াতে স্বস্তি মিলেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে যাত্রীরা সিএনজি-অটোরিকশার কথা চিন্তা করলেই চড়া ভাড়া গোনার বিষয়টি মাথায় আসে। তীব্র যানজট থেকে উত্তরণে অনেকে সিএনজি ডাকতে বাধ্য হয়। ঠিক তখনই যাত্রীদের টানতে হয় অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝা।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক সমীক্ষা অনুযায়ী ঢাকা নগরীর ৯৮ ভাগ অটোরিকশাচালক চুক্তির মাধ্যমে চলে। বেশ কিছুদিন আগে রাজধানীর নর্দা থেকে মহাখালী টার্মিনালে যাওয়ার জন্য কয়েকজন চালকের সঙ্গে দর কষাকষির অভিজ্ঞতাটা ছিল খুবই তিক্ত। তারা কেউ মিটারে যেতে রাজি হননি। তাদের মাঝে কয়েকজন মিটারে যেতে ইচ্ছুক থাকলেও প্রতি কিলোমিটারে ৪০-৫০ টাকা বাড়িয়ে দিতে বলেন। অন্যান্যরা চুক্তিবদ্ধভাবে যেতেই বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। অটোরিকশার এই নৈরাজ্য দমনে ট্রাফিক বিভাগের কোনো তৎপরতা নেই। প্রতিনিয়ত এ সমস্যা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। এর যথাযথ কারণ অনুসন্ধান করলে অন্যতম যে বিষয়টি দাঁড়ায় তা হলো- চালকের ওপর মালিকের চাপ প্রয়োগ। একজন ভাড়ায় অটোরিকশাচালকের দৈনিক আয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মত। এর মধ্যে মালিককে ভাড়া হিসেবে প্রতিদিন এক হাজার থেকে বারোশ টাকা প্রদান করতে হয়। তাই পেট বাঁচানোর তাগিদে অনেকেই যাত্রীদের কাছে উচ্চ ভাড়ার চুক্তি করেন।

অটোরিকশা নীতিমালা-২০০৭ অনুযায়ী নির্ধারিত স্ট্যান্ডে অবস্থান করার সময় কোনো সিএনজি বা পেট্রোলচালিত ফোর-স্ট্রোক থ্রি-হুইলারের চালক অল্প দূরত্বসহ সরকারের ঠিক করে দেওয়া এলাকার মধ্যে যে কোনো দূরত্বে যেতে বাধ্য। কিন্তু রাজধানীর বেশিরভাগ সিএনজি অটোরিকশা চালকই এসব নীতিমালার কোনো পরোয়া করেন না। এছাড়া কোনো চালক যদি মিটারে যেতে না চান অথবা মিটারের চাইতে বাড়তি ভাড়া আদায় করতে চান তবে নীতিমালা অনুযায়ী, তা সুস্পষ্ট অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই সিএনজি অটোরিকশাটির রেজিস্ট্রেশন স্থগিতসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধি রয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী নতুন সিএনজি অটোরিকশার নম্বর প্লেট প্রদান বন্ধ রয়েছে। সংযোজিত এই নীতিমালা চালু হওয়ার পর থেকেই আরম্ভ হয়েছে এক ভিন্ন ধাঁচের ব্যবসা। একটি গাড়ির বাজার মূল্য প্রায় চার লাখ টাকা হলেও একে সড়কে নামাতে খরচ হয় ১৩ থেকে ১৬ লক্ষ টাকার মত। সময় টিভির এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই সিএনজি ব্যবসার নৈরাজ্যের কাহিনী। ২০০১ সালে বেবিট্যাক্সি ও ট্যাম্পু তুলে নেওয়ার পর সেসব মালিকদের ক্ষতিপূরণে সিএনজি বরাদ্দ দিয়েছিল সরকার। প্রায় ১৫ হাজার অটোরিকশা মালিকদের হাতেই চলছে এই খাতের নব উদ্ভাবিত দুর্নীতির ক্ষেত্র। গাড়ির মূলধন যোগান দিতে নতুন ক্রয় করা সিএনজি মালিকরা চালকদের ওপরে দৈনিক উচ্চ ভাড়ার চাপ প্রয়োগ করছে। ফলশ্রুতিতে চালকরা সেই ভাড়া উঠাতে গিয়ে নিরূপায় হয়ে সাধারণ যাত্রীদের কাছে অনৈতিক ভাড়া দাবি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জননেত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণার পরেও অবৈধ পন্থা অবলম্বনের লাগাম যেন থামছেই না। দুর্নীতির এক উপায় বন্ধ হলে যেন সৃষ্টি হচ্ছে অন্য গড়নে। তবে সিএনজি খাতে এই অনিয়ম বন্ধে শুধুমাত্র চালকের ওপরে শাস্তি প্রয়োগ করার মধ্য দিয়েই এর একমাত্র সমাধান নয়। প্রসিদ্ধ একটা প্রবাদ রয়েছে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেব কোথা’; আমাদের মূল সমস্যাটা যেহেতু গোড়ার দিকটায় সেহেতু আগায় পানি ঢালা নিছক বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের অন্যতম পথ কো¤পানিভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন চালু করা। কারণ যখন কোনো সিএনজি অটোরিকশা চলাচলের জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক সড়ক অনুমোদন দেওয়া হয় তখন তাদের ওপরে নজরদারি করা বেশ মুশকিল হয়ে পড়ে। একসঙ্গে অনেকগুলো মালিককে নিয়ন্ত্রণ করা যতটা না কঠিন তার চেয়ে একাধিক সিএনজির একজন মালিককে নিয়ন্ত্রণ করাটা সহজ। এছাড়া ঢাকা মহানগরীতে যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও অটোরিকশার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বাড়েনি। তাই সরকারকে এর সংখ্যা বৃদ্ধিকরণে উদ্যোগ নিতে হবে।

সিএনজি দুর্বৃত্ত দূর করতে বেশি জরুরি সাধারণের মাঝে সচেতনতা অগ্রগতি করা। ঢাকায় স্বাভাবিক যাতায়াত সবার কাছে কাম্য। চালকেরা এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে যাত্রীদের মিথ্যা বলতে জিম্মি করে। বিভিন্ন পরিবহন কল্যাণ সংস্থার পর্যবেক্ষণকালে অধিকাংশ যাত্রী চুক্তিতে যাতায়াত করলেও চালকের শিখিয়ে দেওয়া বাক্য ‘মিটারে চলছে’ বলে মিথ্যা বলতে দেখা যায়। তাই অটোরিকশায় চলাচল করতে গিয়ে কেউ হয়রানির শিকার হলে অভিযোগ দাঁড় করতে হবে কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রতারণার হাত থেকে রেহাই পেতে ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ’ সংস্থাটির সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।

সময় এসেছে সরকারের নজরদারি বাড়ানোর। প্রয়োজনে এর জন্যে স্বতন্ত্রভাবে ‘প্যাট্রোলিং সেল’ গঠন করা যেতে পারে। যার মাধ্যমে নতুন সিএনজি নিবন্ধনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে ‘সর্বদা প্রস্তুত দল’ নিশ্চিত হবে। তবেই সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের প্রশমন ঘটবে।

সাজ্জাদ হোসেন : শিক্ষার্থী, সামাজবিজ্ঞান অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
sajjathossain75200@gmail.com