মগজের ময়লা কবে দূর হবে?

ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫ আশ্বিন ১৪২৭

বিশেষ কলাম

মগজের ময়লা কবে দূর হবে?

আরাফাত বিন হাসান ৮:৪৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২০

print
মগজের ময়লা কবে দূর হবে?

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব মতে ২০১৯ সালে এক হাজার চারশত তেরো জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন? এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো সাতশত বত্রিশ জনে। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আর নতুন বছরের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত, অর্থাৎ নতুন বছরের প্রথম বারো দিনে দেশের প্রথম সারির জাতীয় পত্রিকাগুলোর খবর অনুযায়ী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ২৫ জন নারী।

সকাল দেখে নাকি দিনটা কেমন যাবে কিছুটা অনুমান করা যায়। সুতরাং নতুন বছরের প্রথম বারো দিনে যদি ২৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, বছরের বাকী দিনগুলোতে কী হবে একটু ভাবুন।

ধর্ষণ মূলত কেন হয়? সাইকিয়াট্রিস্ট ফ্রয়েডের মতে মানব মন মূলত তিনটি সত্ত্বার সমন্বয়ে গঠিত- ইড, ইগো এবং সুপার ইগো। এখানে ইড হলো লোভ তথা সমস্ত স্বাভাবিক খারাপ প্রবৃত্তি। এই ইড প্রায় সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে বিদ্যমান। অর্থাৎ মানুষের মনে ইডের উপস্থিতি মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করতে পারে না। বাকী দুটোই, অর্থাৎ সুপার ইগো এবং ইগো মিলেই মূলত মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে। সুপার ইগো ইডের কাজে বাঁধা দেয়। ইডের কারণে মানুষ কোনো খারাপ কাজ করতে চাইলে সুপার ইগো সেখানে বাঁধা হয়ে দাড়ায়। আর ইগো ইড ও সুপার ইগোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে থাকে।

একবার আমার এক স্কুল শিক্ষক আমাদের জীবনকালের সাথে একটা আয়নার তুলনা করেছিলেন। তার মতে একটা নতুন পরিষ্কার আয়নার মতো জীবনের শুরুর দিকে আমরা নির্ভেজাল-নিষ্পাপ থাকি। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন নতুন আয়নাটার গায়ে ধূলো ময়লা পড়ে ঝাপসা হয়ে যায়, আমরাও জীবনকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কলুষিত হয়ে যাই। তবে চাইলেই যেকোনো সময় সেই আয়নার ধূলাবালিগুলো মুছে পরিষ্কার করা যায়, তেমনি আমরাও চাইলে সমস্ত কলুষতা ঝেড়ে কলুষমুক্ত হতে পারি।

আবার আয়নাটি প্রতিদিন মুছা হলে যত সময়ই যাক, ধূলাবালি পড়ে ঝাপসা হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। তেমনি আমরাও চাইলে নিজেদের তিলে তিলে কলুষমুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো, যদি নিয়মিত নিজেদের পরিচর্যা করি। আগে যে মানব মনের তিনটা সমন্বয়ক ইড, সুপার ইগো আর ইগোর কথা বলেছিলাম ; এর কার্যক্রমের সাথে আয়নার এই গল্পের বিশেষ সম্পর্ক আছে।

কেউ যদি ইডের প্ররোচনায় একটা ধর্ষণে জড়িয়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে সুপার ইগোর কারণে তারমধ্যে অনুশোচনার সৃষ্টি হবে। সুপার ইগোর কারণে ঐ লোক ভীষণ অনুতপ্ত হবে। কিন্তু এই অনুতপ্ত হওয়া কিংবা অনুশোচিত হওয়াকে পাশ কাটিয়ে ইডের প্ররোচনায় ধর্ষণকাজ বা অন্য কোনো খারাপ কাজ নিয়মিত চলতে থাকে তাহলে সুপার ইগোর গায়ে ধীরে ধীরে ধূলোবালি জমে ঝাপসা হয়ে যাবে ঐ আয়নার মতো। একসময় এই সুপার ইগো আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করবে না। তবে ঐ ধূলো জমা আয়নার মতো চাইলে সুপার ইগোর গায়ে জমে থাকা ধূলাবালিগুলো পরিষ্কার করা যাবে। সমস্ত ময়লা দূর করা যাবে।

এই যে ধর্ষণ, এটা মানুষের মনে ইডের প্রভাবে জায়গা করে নেয় ঠিক তবে এর পেছনে আরও বেশ কিছু কারণ আছে। ধর্ষক লোকটি কোন পরিবেশে বেড়ে ওঠেছে, কেমন সঙ্গীর সঙ্গে সে মিশছে, সে কী কী শিখছে এসবও গুরত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবেশ। আমরা কেমন পরিবেশে বড় হচ্ছি, চারপাশে কী কী দেখে বড় হচ্ছি, কেমন মানসিকতার মানুষ দেখে বড় হচ্ছি এগুলো একজন ধর্ষককে ধর্ষক বানাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ আমাদের সামনে যদি নারীকে সর্বক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তখন ধীরে ধীরে এটা মানসিকতায় গেঁথে যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে এলিট শ্রেণি থেকে শুরু করে সমাজের একদম নিম্নস্তর পর্যন্ত এখনও নারীদের ভোগ্যপণ্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়। চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে সিনেমা, সাহিত্য মোটামুটি সব জায়গায় কৌশলে নারীদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করার মানসিকতা রয়েছে। আর এটাই শতশত ধর্ষককে ধর্ষক হিসেবে তৈরি হতে সাহায্য করছে। ধর্ষকের মানসিকতায় যদি ছেঁদানো থাকে যে নারী মানেই পণ্য, তখন ধর্ষণ করার সময় নারী আপাদমস্তক ঢাকা নাকি ২ মাস বয়সী শিশু তা চিন্তা করার প্রয়োজন পড়ে না।

সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করার যে তোড়জোড় শুরু হয়েছিলো একইভাবে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ যে মহামারী রূপে দেখা দিয়েছে যত দ্রুত সম্ভব ধর্ষকদের লার্ভা ধ্বংসের কাজে নেমে পড়তে হবে। আর এসব ধর্ষকদের লার্ভা মূলত ‘নারীকে পণ্য ভাবা’ সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে। আমাদের মগজে-মননে এই যে মানসিকতাটা গেঁথে আছে তা যতদিন পরিষ্কার সম্ভব হচ্ছে না ততদিন ধর্ষণের এই মহামারী থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

আরাফাত বিন হাসান : কলামিস্ট
mdarafatbinhasan@gmail.com