সবার চোখ হাইকোর্টে

ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২০ | ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭

সবার চোখ হাইকোর্টে

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২:২০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০২০

print
সবার চোখ হাইকোর্টে

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামী ৩০ জানুয়ারি হবে কিনা সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। সরস্বতী পূজার কারণে এ নির্বাচন পেছানোর দাবিতে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষার্থীরা সরব। এসব সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার পরও কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি ইসি। শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে ইসি।

আজ মঙ্গলবার হাইকোর্টে এ বিষয়ে রায় হতে পারে। ফলে ভোটার, প্রার্থী এমনকি খোদ ইসিসহ সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আজ আদালতের দিকে।

৩০ জানুয়ারি ঢাকা সিটি ভোটের দিন সরস্বতী পূজার তারিখ পড়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা ভোটের তারিখ পেছানোর দাবি জানান। আদালতে রিটও করা হয়। তবে ইসি জানিয়ে দেয় ভোট পেছানো সম্ভব নয়। তবে আদালতে শুনানির পর রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে ইসি।

জানা গেছে, গত রোববার কমিশনের এক অনানুষ্ঠানিক সভায় কমিশনাররা মত দেন, আদালতের রায় অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সভায় নির্বাচন কমিশনের আইন শাখার কর্মকর্তাদের ডেকে এ বিষয়ে করা রিটের সর্বশেষ অবস্থা জানতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটিতে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আদালতে একটি রিট আবেদন হয়েছে। আদালত কোনো নির্দেশনা দিলে আমরা সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব।

এদিকে ভোট পেছানো হবে কিনা সে বিষয়ে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত জানা যাবে আজ মঙ্গলবার। সোমবার এ সংক্রান্ত এক রিট শুনানিতে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার আদেশের জন্য তারিখ ধার্য করেন।

রিটকারী আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ আদালতে নিজেই শুনানি করেন। ইসির পক্ষে ছিলেন তৌহিদুল হক। আর রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর উস সাদিক শুনানিতে ছিলেন।

এদিন সরস্বতী পূজার ছুটি কবে- তা শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর কাছে জানতে চান আদালত। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর উস সাদিক বিভ্রান্তিকর কথা বলায় তাকে তিরস্কার করেন বিচারক। ইসির আইনজীবী তৌহিদুল হক শুনানিতে বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় সব আচার-অনুষ্ঠান যথাযথভাবে দেখে কমিশন ভোটের দিন ঠিক করে। ঢাকা সিটির জন্য যে ভোটের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আগানো বা পেছানো ঠিক হবে না।

এ সময় অশোক কুমার ঘোষ বলেন, ‘নির্বাচনের ঘোষিত তারিখ সংবিধানের ধর্মীয় অনুভূতিসংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ২৯ জানুয়ারি দিনের দ্বিতীয় ভাগ থেকে ৩০ জানুয়ারি আধাবেলা সরস্বতী পূজা, যে পূজাটি দেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে। ৩০ জানুয়ারি নির্বাচন হলে তার কয়েক দিন আগেই ভোটের কার্যক্রম শুরু হবে। পূজা পালনে বিঘ্ন ঘটবে বা পূজার আচার-আনুষ্ঠানিকতা বাধাগ্রস্ত হবে।’ উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আজ আদেশের জন্য তারিখ রাখেন আদালত।

এর আগে পূজা উদযাপন পরিষদও সরস্বতী পূজার বিষয়টি তুলে ধরে ভোটের দিন পরিবর্তনের অনুরোধ করেছিল ইসির কাছে। তারপর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদও একই অনুরোধ করে। নির্বাচনের তারিখ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও মানববন্ধন হয়।

দেশের সর্ববৃহৎ পূজামণ্ডপ রামকৃষ্ণ মিশন ও ঢাকায় সরস্বতী পূজার মূল কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় পড়েছে। এখানে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোটকেন্দ্র পড়েছে, যেখানে প্রতিবছরই সরস্বতী পূজার আয়োজন হয়।

ইসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনে ভোটের তারিখ এগিয়ে আনতে কিংবা পিছিয়ে দিতে পারে ইসি; কিন্তু সেক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে।

৩০ জানুয়ারির পর ৩১ জানুয়ারি শুক্রবার হলেও এ দিনে ভোটের নজির বাংলাদেশে নেই। তার পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি শনিবার থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার সময়টা এড়িয়েই ভোটের দিন ঠিক করে ইসি। ফলে ভোট পেছাতে হলে পরীক্ষাও পেছাতে হবে।

আবার ভোটের তারিখ একদিন এগিয়ে আনলেও পূজার সংকট কাটছে না। পূজা এড়াতে হলে দুদিন এগিয়ে আনতে হবে ভোটের তারিখ।

এদিকে ৩০ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন ধরে সেদিন ঢাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে ইসি। আদালত ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত দিলে সাধারণ ছুটির তারিখও বদলাবে।

এদিকে গতকাল ইসির সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধিরা। নির্বাচনের দিন পরিবর্তনের দাবিতে তারা এ বৈঠক করেন। নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক শুরু হয়।

বৈঠক শেষে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘হতাশ মনে এই নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের বিদায় নিতে হয়েছে। তারা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলেছেন, আমরা আমাদের হৃদয়ের অনুভূতির কথা বলেছি। আমরা বলতে চাই, এ আলোচনার মধ্য দিয়ে কোনো সমস্যার সুরাহা করতে পারিনি।’

এর মধ্যে গতকাল ভোট পেছাতে মানববন্ধন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে যে কোনো ধর্মীয় উৎসবের দিনে নির্বাচন না দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বারবার পূজার দিনে নির্বাচন দেওয়ার ঘটনায় সমালোচনা করেন শিক্ষার্থীরা। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় বিশেষ করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবের দিনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেদিক খেয়াল রাখার দাবি জানানো হয়।

এর আগে গত কয়েক দিন ধরে ভোটের তারিখ বদলানোর দাবি করছেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, সাধারণ শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালতের রায়ের ওপরই নির্ভর করছে ভোটের তারিখ পেছানোর বিষয়টি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারিখ এগিয়ে আনার সুযোগ নেই বলে মনে করেন তারা। সেক্ষেত্রে প্রচারণার জন্য প্রার্থীরা আরেকটু বেশি সময় পেতে পারেন বলে ধারণা করছেন তারা।