বিজয়ের ৪৮ বছরে কৃষির সাফল্য

ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২০ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

বিজয়ের ৪৮ বছরে কৃষির সাফল্য

বশিরুল ইসলাম ৮:৪০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

print
বিজয়ের ৪৮ বছরে কৃষির সাফল্য

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মুহূর্তে আনন্দে উল্লসিত ছিল দেশ! সেদিন স্বাধীন জন্মভূমি পাওয়া মানুষের নতুন করে সব কিছু শুরু করার প্রাণশক্তি দেখার সুযোগ আমার ছিল না। কারণ, আমার জন্ম ১৯৮৬ সালে। দেশের স্বাধীনতা লাভের ১৫ বছর পর। তবে মা-বাবা, গুরুজনদের মুখে বিজয়ের গল্প শুনেছি। সে সময় কৃষির অবস্থা কি ছিল তা শুনেছি। দেখেছি এবং দেখছি কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের সম্মিলিত প্রয়াসে দেশের কৃষির বিজয়।

ঠিক আজকের কথা বলি, কোথায় আছি আমরা? দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় যেখানে লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি আজ সেখানে ১৭ কোটি লোকের বাস। সে সময় সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হয়েছে দেশকে। তখন আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হতো। অথচ এক লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দেশটিতে কৃষি জমি এক শতাংশও বাড়ছে না। বরং কৃষি জমিতে স্থাপনা, কারখানা ও রাস্তা তৈরি হচ্ছে। তারপরও আবাদি জমি থেকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। এক কথায় কৃষি খাতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

এশিয়ার গণ্ডি পার করে বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় অবস্থানে। লবণাক্ততা, খরা ও জল সহিষ্ণু ও জিংকসমৃদ্ধ ধানসহ ১০৮টি উচ্চফলনশীল জাতের ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে। যার কারণে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ অবস্থানে। কেবল সবজি আর ধানেই নয়; মাছ, ছাগল উৎপাদনেও বিশ্বে আয়তনের দিক থেকে অনেক পেছনে থাকা বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ, আমে সপ্তম, আলুতে অষ্টম এবং ফলে দশম। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, বিশ্বে যে পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয় তার ৮৬ শতাংশই হয় আমাদের দেশে।

এখন প্রশ্ন থাকতে পারে- এ সাফল্যের রহস্য কী? একজন কৃষিবিদ হিসেবে মনে করি, এ সাফল্যের অনুঘটক হচ্ছে দেশের অর্থনীতির বুনিয়াদি শক্তি কৃষি অর্থনীতিতে ধারাবাহিক সাফল্য। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, বীজ, সার এবং যন্ত্রের ব্যবহার উৎপাদন বাড়ার পেছনে প্রধান উজ্জীবক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তার সঙ্গে বিশেষ অবদান রয়েছে কৃষি বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিবিষ্ট গবেষণায় নতুন নতুন উচ্চফলনশীল, কম সময়ে ঘরে তোলা যায়- এমন জাতের কৃষিবীজ উদ্ভাবন। সহজ কিস্তিতে ঋণব্যবস্থার কারণে কৃষিতে কাক্সিক্ষত সাফল্য এসেছে। এ ছাড়া দেশে শিক্ষিত কৃষকের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে কৃষকের ছেলেই কৃষক হবে- এমন ধারণা থেকে আমরা বের হতে পেরেছি। এ ছাড়া, সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি প্রণয়ন ও সময়োপযোগী বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে কৃষি খাত আজ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে।

এর প্রধান কারিগর হচ্ছে এ দেশের কৃষক। প্রতিদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করে কৃষকরা যেমন দেশবাসীর খাদ্য চাহিদা পূরণ করছে, তেমনি নিজেদের ভাগ্যের বদলও ঘটাচ্ছে। অর্জন করছে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। প্রধান ফসলের পাশাপাশি নানা ফসল উৎপাদনেও তারা সফলতা দেখাচ্ছে। ধান উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা যেমন অর্জন হয়েছে, পাশাপাশি মৎস্য, পোলট্রি, গরু-ছাগল, আলু, গম, ভুট্টা ও নানা রকম সবজি উৎপাদনে কৃষি উদ্যোক্তাদের অভাবনীয় সাফল্য জাতিকে নতুন দিশা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুণ। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। স্বাধীনতার পর দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে দেড় টন চাল উৎপাদিত হতো। এখন হেক্টর প্রতি উৎপাদন হচ্ছে চার টনেরও বেশি। তা ছাড়া হেক্টর প্রতি ভুট্টা উৎপাদনে বিশ্বে গড় ৫ দশমিক ১২ টন। বাংলাদেশে এ হার ৬ দশমিক ৯৮ টন।
খাদ্যশস্যে প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৩৪ টন উৎপাদন করে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পরে রয়েছে আর্জেন্টিনা, চীন ও ব্রাজিল। আর এভাবেই প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশে^র শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। মাছ রপ্তানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ। এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। আর ছাগলের মাংস উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম। বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বিশ্বের সেরা জাত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আম উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অবস্থানে। আর আলু উৎপাদনকারী শীর্ষ দশ দেশের কাতারে এসেছে দেশ। বাংলাদেশ থেকে আলু, সবজি আর আম রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য উদাহরণ।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। সরকারের ডিমওয়ালা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জাটকা নিধন নিষিদ্ধকরণের নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে এখন ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। চিংড়ি রপ্তানি থেকে প্রতি বছর আমাদের আয় ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া পুষ্টির অন্যান্য উৎপাদন ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদনও বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাতে বৃদ্ধি পেয়েছে এসব পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের জনপ্রতি প্রাপ্যতা।

একসময় বলা হতো ‘দুধে ভাতে বাঙালি’ কিংবা বলা হতো ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। বর্তমান সরকারের কৃষি নীতিতে শুধু দুধে ভাতে বা মাছে ভাতে সীমিত নয়, পুষ্টিতে বাঙালি হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত হতে চায়। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার এগিয়ে চলছে। গ্রহণ করছে নানা প্রদক্ষেপ। এর মধ্যে কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকের কল্যাণ সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়ে রূপকল্প-২০২১ এবং রূপকল্প-২০৪১ গ্রহণ করা হয়েছে। এর আলোকে জাতীয় কৃষিনীতি সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন ডেল্টাপ্ল্যান-২১০০ সহ বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নানা পদক্ষেপের ফলে কৃষি এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে এ দেশের অবস্থান এখন ১০ম। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান এখন ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।

আজ আমাদের কৃষি সাফল্যের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। তা হচ্ছে, আমাদের কৃষকরা বছরের পর বছর তাদের বহু কষ্টে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। কোনোভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্য। তা ছাড়া প্রতি বছর একশতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে চাষাবাদ তথা খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন হয়তো উন্নত প্রযুক্তি এবং উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার করেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখা সম্ভব হবে না। তাহলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে। এজন্য এখন থেকেই যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত জরুরি হয়ে উঠেছে বলে আমি মনে করি।

বশিরুল ইসলাম : জনসংযোগ কর্মকর্তা
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
mbashirpro1986@gmail.com