সড়কে প্রাণহানির দায় কার

ঢাকা, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

সড়কে প্রাণহানির দায় কার

আশিকুর রহমান ৮:৫৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯

print
সড়কে প্রাণহানির দায় কার

মানুষের পথচলা যতদিন থাকবে দুর্ঘটনাও ততদিন থাকবে; কিন্তু নিত্যদিনের মৃত্যুর মিছিল কারোরই কাম্য নয়। এখন একজন মা তার সন্তানকে স্কুলে বা বাজারে পাঠিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন যে তার সন্তান সড়ক দুর্ঘটনার কবল থেকে রেহাই পেয়ে সুস্থ অবস্থায় বাড়িতে ফিরতে পারবে কি-না।

পত্রিকার পাতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টিভির পর্দায় কিংবা প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে আমরা প্রতিনিয়ত দেখি সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াল চিত্র। সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এটি আমাদের সৃষ্ট স্বাভাবিক জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই যে ভয়ানক দুর্ঘটনার কবলে বাংলার মানুষ দুর্বিষহ হয়ে উঠছে এর জন্য কে বা কারা দায়ী?

আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দায়ী নয়। কারণ, রাস্তা খারাপ হলে সরকার দায়ী হতে পারে। নির্মাণকাজ ত্রুটিযুক্ত হলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেকটি পক্ষ দায়ী হতে পারে। অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে গাড়ি তুলে দিলে মালিক দায়ী হতে পারে। পথচারীরা সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন না করে রাস্তা ব্যবহার করলে তারা দায়ী হতে পারে। রাস্তায় পুলিশ ঠিকমতো অর্পিত দায়িত্ব পালন না করলে তারা দায়ী হতে পারে।

অর্থাৎ যে কেউ এর জন্য দায়ী হতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে অতিমাত্রায় গতি এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবকে দায়ী করা হয়। কারণ, ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে এআরআই বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ চালকদের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। আর পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে ১০ শতাংশ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত আন্দোলন, প্রতিবাদ ও মৃত্যুর মিছিলের পরও তারা কেন এই ধ্বংসাত্মক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না?

অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের অধিকাংশ চালক হেলপারের দায়িত্ব পালন করে নিজে নিজে ড্রাইভিং শিখে কোনোরকম লাইসেন্স সংগ্রহ করে। চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও নেই বললেই চলে। যার জন্য তারা আইন মানা ও জানমালের প্রতি দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন নয়। এদেশের অধিকাংশ পরিবহনে মালিক লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলে জরিমানা।
ফলে গণপরিবহনের গাড়িগুলো অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং বেড়ে যায় অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঝুঁকি।

মোটরযান আইন অনুসারে, একজন চালক একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি ভারী যানবাহন চালাতে পারবেন না। আধ ঘণ্টার বিরতি দিয়ে পুনরায় চালাতে পারবেন। তবে দিনে আট ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি চালাতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, চালকরা একটানা গাড়ি চালিয়ে যান। সব মিলিয়ে একজন চালককে বেপরোয়া হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া এদেশে ভুয়া লাইসেন্স সংগ্রহ করে গাড়ি চালাচ্ছে- এমন অনেক চালক রয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভারী যানবাহন আছে ২ লাখ ৫২ হাজার। এসব যানবাহনের বিপরীতে বৈধ লাইসেন্স আছে এমন চালকের সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার। অর্থাৎ ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ যানবাহন চলছে ভুয়া চালক দিয়ে।

কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্ত থাকা সত্ত্বেও কতটুকু আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেটি সন্দেহের বিষয়। কারণ, রক্ষক যদি হয় ভক্ষক সেখানে সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় না বরং গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া হয়ে যায়। ইতিমধ্যে লাইসেন্স দেওয়া কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেখানে অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই লাইসেন্স দেওয়া হয়।

এদেশে ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়াই চলছে অনেক গাড়ি। সড়কে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নিযুক্ত পুলিশের রয়েছে গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতা। ট্রাফিক পুলিশের একটা বড় অংশ দায়িত্ব পালনের চেয়ে চাঁদাবাজিতে বেশি তৎপর। এসব বিষয়ে বিআরটিএ’কে সচেতন হতে হবে ও দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য পথচারীর দায়ও কম নয়। পথচারীরা অনেক সময় প্রচলিত আইন অমান্য করে রাস্তা দিয়ে হাঁটেন। শুধু তাই নয়, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুট ওভারব্রিজ, জেব্রা ক্রসিং থাকা সত্ত্বেও তারা খুব কমই ব্যবহার করেন।

তাছাড়া অনেক সময় পথচারীরা অসতর্কতার সঙ্গে রাস্তা পার হন, যার দরুন অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক পথচারী মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতেই ব্যস্ত রাস্তা পার হন। এমনকি অনেকে হেডফোন কানে দিয়ে গান শুনতে শুনতে ব্যস্ত রাস্তায় চলেন। ডিএমপির তথ্যমতে, ঢাকা নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায় তার বেশিরভাগ পথচারী। এক্ষেত্রে ফুটপাত দখল বন্ধ করতে হবে। কারণ, ঢাকায় ৭০ শতাংশ পথচারী সড়ক ব্যবহার করেন। সুতরাং এ ব্যাপারে সর্বস্তরের মানুষের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক টু ওয়ে, যা দুটি গাড়িকে মুখোমুখি করে দেয়। রাস্তায় যত্রতত্র স্পিড ব্রেকার তৈরি করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় উঁচু এবং তাতে না আছে কোনো চিহ্ন বা অলাদা রঙ। ফলে দ্রুতগতির গাড়ি বেকায়দা অবস্থায় পড়ে এবং আকস্মিক দুর্ঘটনায় পড়ে। এছাড়াও আমাদের দেশের অধিকাংশ গাড়িচালকের মধ্যে নিয়ম ভঙ্গ করে ওভারলোডিং, সড়ক আইনের প্রতি উদাসীনতা, সামনের গাড়িকে অতিক্রম করার চেষ্টা তীব্র হচ্ছে।

রাতে চলা অনেক দূরপাল্লার বাস বা ট্রাকে দুটি হেডলাইটের স্থলে ৩ থেকে ৬টি হেডলাইট ব্যবহার করা হয়, যার ফলে বিপরীত দিক থেকে আসা ছোট গাড়ি রাস্তার কিছুই প্রায় দেখতে পায় না। তখন আন্দাজের ওপর চালাতে হয়, এমন সময় হঠাৎ ভাঙা স্থান বা সামনে কোনো মানুষ বা অন্য কিছু পড়লে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া কিছু যানবাহনের হেডলাইটের আলো অত্যন্ত ক্ষীণ থাকে, যা বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িচালকের নজরে সহজে পড়ে না। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।

উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার হার অত্যন্ত কম কারণ, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সচেতন। সেখানে কি রাষ্ট্র সবকিছু করে নাকি জনগণ ভূমিকা রাখে? সেখানকার জনগণ আইন মানে। কিন্তু আমরা না মানি আইন, না দেশের স্বার্থে কাজ করি। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে গাড়িতে তো আমরাই উঠি।

মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন চলাচলের অযোগ্য আর সেটার মালিক তো আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ। অধিকাংশ সময় আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না রেখে আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে আসার প্রবণতায় মেতে উঠি। তাহলে দায়টা কি আমাদের এই আহত সমাজব্যবস্থার!
একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে পথে বসিয়ে দেয়। হৃদয়টা কেঁপে ওঠে যখন শুনি একই পরিবারের চার-পাঁচজন একই সঙ্গে নিহত হয়। কত পরিবারের বেঁচে থাকার আলো নিভে যায়।

এমন হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা এদেশে প্রতিদিনই ঘটে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদন বলেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে মৃত্যুর সংখ্যা ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার। এ রিপোর্টের তথ্যমতে দিনে প্রাণহানি ঘটে ৬৪ থেকে ৬৫ জনের। তদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটিতে ক্ষতি হয় মোট জিডিপির ১ দশমিক ৬ ভাগ।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কি এর ক্ষতি টাকার অঙ্কে প্রকাশ করা সম্ভব? কারণ, সড়ক দুর্ঘটনায় যে সব জীবন ঝরে যায়, তাদের জীবনের মূল্য আসলে কত? অথবা সারাজীবন যারা পঙ্গুত্ব বরণ করে শোচনীয়ভাবে বেঁচে আছেন, তাদের এই ভোগান্তির আর্থিক মূল্যই বা কত? রাষ্ট্র কি এসব পরিবারের কোনো দায়িত্ব নেয়?

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হয়েছে। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলন কি ফলপ্রসূ হয়েছে? সড়কে মৃত্যুর মিছিল কি বন্ধ হয়েছে, কমেছে কি সড়কের অনিয়ম? নাকি, ক্রমাগত এটি আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে? উল্টো যারা সড়ক আন্দোলনের জন্য সোচ্চার তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো নিরাপদ সড়ক চাই- এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। নানাভাবে তিনি হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। এটি তো বাংলার সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবি, তাহলে কেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে?

সড়কে মানবসৃষ্ট কোনো বিপর্যয় যেন না ঘটে তার জন্য সড়ক ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের যথার্থ দায়িত্ব পালন করতে হবে। তারা সমর্থ হলে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা কখনোই চালকদের পক্ষে সম্ভব হতো না। গণপরিবহনের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও চালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করতে হবে।

পথচারীদের পথ চলার নিয়ম সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। সর্বস্তরের মানুষ যতক্ষণ সচেতন না হবে, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ যতদিন না বড় হবে, ততদিন সড়ক দুর্ঘটনার কবল থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব হবে না। দেশকে ভালোবাসলে শুধু সড়ক দুর্ঘটনা নয়, আরও অনেক জাতীয় সমস্যার সমাধান করা সহজ হবে।

আশিকুর রহমান : শিক্ষার্থী
ashikuriu22@gmail.com