সন্ত্রাস, মারামারি, খুনোখুনি কেন হয়

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সন্ত্রাস, মারামারি, খুনোখুনি কেন হয়

শেখ আনোয়ার ৯:০৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০১৯

print
সন্ত্রাস, মারামারি, খুনোখুনি কেন হয়

তুচ্ছ কারণে নানারকম মারামারি, খুনোখুনি, সন্ত্রাসী বা সহিংস ঘটনার শেষ নেই। বিশ্বজুড়ে নানা স্থানে এরকম ঘটনা প্রতিদিন অহরহ ঘটছে। তাই সন্ত্রাস দমন বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের মনে জেগে ওঠেছে নিত্য-নতুন প্রশ্ন। ব্যক্তি বিশেষে, এলাকা বিশেষে যে বর্বর অনৈতিক সন্ত্রাসী ঘটনা বেশি দেখা যায়, এর পেছনে আসলে পরিবেশ ও সমাজ দায়ী? নাকি নির্দিষ্ট কোনো বায়োলজিক্যাল জিন দায়ী? এখন চলছে এই নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী আর গবেষকদের নিরন্তর গবেষণা।

সমাজবিজ্ঞানীরা দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘জন্ম থেকে কোনো শিশু অপরাধী হয়ে জন্মায় না।’ তারা আরও বলেন, ‘পরিবেশ ও সমাজের প্রভাবেই মানুষ সন্ত্রাসী হয়ে উঠে।’ এক্ষেত্রে পরিবেশের পক্ষে নৃ-বিজ্ঞানীরা কয়েকটা যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। এই যেমন, ব্রিটিশ-মার্কিন নৃ-বিজ্ঞানী, মানবতাবাদী লেখক অ্যাসলে মন্টেগু তাদের একজন। এই নৃ-বিজ্ঞানী বলেন, ‘মাতৃগর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় কোনো একটা শিশুর লাখ লাখ কোষ যখন তৈরি হয়, তখন সেই কোষ শুধু শিশুর বৃদ্ধির গঠন প্রক্রিয়ায় কাজ করে। একমাত্র জন্মানোর পরেই এ কোষগুলোকে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে শিখতে হয়।

এছাড়া বিবর্তনবাদী জন টবি যে যুক্তি দেখিয়েছেন তা হচ্ছে, ‘একটা শিশু জন্মানোর আগে তার মস্তিষ্কে এ ব্যাপার স্থির করা হয় না যে, জন্মের পরে শিশুটা কোনো ভাষায় কথা বলবে। একমাত্র পরিবেশ ও সমাজই স্থির করে দেয় শিশুটা কোন ভাষায় কথা বলবে।’ সুতরাং এ থেকে বলা যায় যে, ব্যক্তি বিশেষে বা গোষ্ঠী বিশেষে যে কোনো মানুষের সন্ত্রাসী ঘটনা বা হত্যাকাণ্ড বা খুনি হওয়ার পেছনে সেই ব্যক্তির বাড়িঘর, আশপাশের মানুষ বা সামাজিক পরিবেশ দায়ী।

বর্তমানে সন্ত্রাসের কারণ গবেষণায় উন্নত দেশের সমাজবিজ্ঞানীরা অনেক দূর এগিয়ে রয়েছেন। জানা যায়, একমাত্র ইকুয়েডরের আকুয়ার ইন্ডিয়ানদের মধ্যে বিশ্বের সর্বোচ্চ মাত্রায় সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে। কিন্তু কেন তুচ্ছ কারণে নানারকম মারামারি, খুনোখুনি, সন্ত্রাসী বা সহিংস ঘটনা বেশি হয় তা জানতে দেখে নেওয়া যাক, ইকুয়েডরে কী ধরনের সামাজিক পরিবেশ থেকে এ ধরনের অনৈতিক অপকর্ম-কাণ্ড হয়ে থাকে।

শান্তা বারবারার কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞানী জন কিউ প্যাটন সন্ত্রাস নিয়ে গবেষণা চালিয়ে ইকুয়েডরের কনাম্বো গ্রামের আকুয়ার লোকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অনেক তথ্য উদ্ধার করেছেন। তিনি গভীর পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, সাধারণ মানুষকে যেমন বিপজ্জনক কোনো ঘটনা বা কোনো প্রাণীর আক্রমণ নিয়ে নার্ভাস হতে দেখা যায়, সে ধরনের কোনো নার্ভাস অনুভূতি আকুয়ার লোকদের মধ্যে নেই। তারা নার্ভাস শুধু তাদের নিজেদের নিয়ে।

এক জরিপে জানা যায়, তাদের পুর্ব-পুরুষদের শতকরা ৬০ ভাগই মারা গেছে বোমা বিস্ফোরণে। বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যুই হচ্ছে তাদের কাছে স্বাভাবিক মৃত্যু। বুড়ো হয়ে মৃত্যু কিংবা অসুখে মৃত্যুই তাদের কাছে অস্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু কেন তুচ্ছ কারণে নানারকম মারামারি, খুনোখুনি, সন্ত্রাসী বা সহিংস ঘটনা আকুয়ার লোকদের কাছে এত প্রিয়? নৃ-বিজ্ঞানী প্যাটন কয়েকটা কারণের মধ্যে একটা উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রাচীন মানবসমাজে যুদ্ধ ও হত্যার বিবর্তন থেকেই আজকের সমাজে এসব সন্ত্রাস, খুনোখুনি, মারামারি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও হত্যাকাণ্ড দেখা যায়।’ কারণ আদি পূর্ব-পুরুষরা খাবারের সন্ধানের জন্য শিকার করে বেড়িয়েছে।

আকুয়ার উপজাতীয় লোকদের মধ্যে সন্ত্রাসের আরেকটা কারণ হলো প্রোটিন স্বল্পতা। এই উপজাতীয়রা পরস্পরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে লিপ্ত হয় নতুন এলাকা দখল করার জন্য। কারণ তাদের নিজেদের এলাকায় যথেষ্ট খাবার নেই। এক তথ্যে জানা যায়, যেখানে একজন আকুয়ার লোকের দৈনিক ১০৪ গ্রাম প্রোটিন দরকার, সেখানে তারা পায় জনপ্রতি শুধুমাত্র ৩০ গ্রাম প্রোটিন। সুতরাং খাবারের জন্য নানারকম মারামারি, খুনোখুনি, সন্ত্রাসী বা সহিংস যুদ্ধ করা তাদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার।

প্যাটন ও তার উপদেষ্টা নেপোলিয়ান চ্যাঞ্চন ‘আনকাই’ নামের এক বিশেষ শ্রেণির হত্যাকারী আকুয়ার লোকদের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করেছেন। দেখা গেছে, গড়ে হত্যাকারী লোকদের অন্যদের তুলনায় প্রায় দেড়গুণ স্ত্রী ও তিন জনের অধিক ছেলেমেয়ে থাকে। আর হত্যাকারী ‘আনকাই’রা হয়ে থাকে সমাজের নেতা। সমাজের নেতা উপাধিটা তাদের দেওয়া হয়ে থাকে সাধারণত প্রথমে প্রজনন ক্ষমতার কারণে এবং তারপর যুদ্ধ জয়ের কারণে। অর্থাৎ আকুয়ার লোকদের সামাজিক মর্যাদা নির্ণয় করা হয় যুদ্ধ জয়ের দক্ষতা অনুসারে। যে যত ভালো যোদ্ধা হতে পারবে সে তত বেশি উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা অর্জন করবে।

নৃ-বিজ্ঞানী প্যাটন সন্ত্রাসীদের ভাবমূর্তি পর্যবেক্ষণ করে জানান, আকুয়ার লোকদের ৭৮ ভাগ সামাজিক মর্যাদাই নির্ণয় করা হয় তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দক্ষতা দিয়ে। প্যাটন আকুয়ার লোকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, তাদের সমাজে একজন দক্ষ সন্ত্রাসীকে সবচেয়ে বেশি সমীহ করা হয় এবং জ্ঞানী ভাবা হয়। একজন সন্ত্রাসী জানে কখন কার সঙ্গে সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত হওয়া দরকার। আর কখন দরকার নেই। তাদের সমাজে তরুণ সন্ত্রাসীদের তুলনায় বয়স্ক সন্ত্রাসীদের খুব জ্ঞানী ভাবা হয়। কারণ বয়স্ক সন্ত্রাসীরা মনে করে বয়স্কদের সন্ত্রাসী কৌশল তরুণদের চেয়ে বেশি ভিন্ন ও আলাদা হয়ে থাকে।

শুধু কি তাই? অস্ত্র দিয়ে সন্ত্রাস না করেও ভালো সন্ত্রাসী হওয়া যায়। আকুয়ার লোকদের মধ্যে এরকম আরেকটা বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেছেন নৃ-বিজ্ঞানী প্যাটন। তিনি রবার্ট নামে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণের জীবন-যাত্রা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, রবার্ট তার কূটনৈতিক বুদ্ধির কারণে নিজেকে তার এলাকার একজন বড় নেতা মনে করেন। ঘটনাও সত্যি। রবার্ট জানান, ‘চাণ্যক্য’র মতো কূটনৈতিক বুদ্ধি দিয়ে যে কোনো শক্তিশালী শত্রুর গতিরোধ করা সম্ভব।’

এ ধরনের ভিলেজ পলিটিক্সের যুদ্ধকৌশল নিয়ে রিচার্ড বেংহাম নামে একজন হার্ভার্ড নৃ-বিজ্ঞানী মন্তব্য করেন, এরকম অনৈতিক যুদ্ধ কৌশল দিয়ে শত্রুকে পরাজিত করা হচ্ছে হত্যাকাণ্ডের মতো সন্ত্রাসের এক ধরনের বিবর্তন কৌশল। অর্থাৎ অস্ত্র ব্যবহারের কারণে সন্ত্রাস বিবর্তিত হতে হতে আজকের বোমাবাজি, খুনোখুনি, মারামারি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ইত্যাদি নানান রূপ নিয়েছে। এমনকি কূটনৈতিক প্রতারণার কৌশলকে সমাজবিজ্ঞানীরা নৈতিকতার পরিপন্থী আদিম কাজ বলে উল্লেখ করেছেন।

তুচ্ছ কারণে নানারকম মারামারি, খুনোখুনি, সন্ত্রাসী করা আকুয়ার লোকদের বৈশিষ্ট্য হলেও নৃ-বিজ্ঞানী প্যাটন আকুয়ার লোকেরা যে জন্মগত স্বভাব সন্ত্রাসী তা বলতে নারাজ। তার মতে, আকুয়ার সমাজটাই এরকম যে, সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সামাজিক মর্যাদার অংশ বলে মনে করা হয়। আর আঞ্চলিকভাবে সামাজিক সম্মান দেওয়ার কারণে তাদের সমাজে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আজও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

শেখ আনোয়ার
বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
xposure7@gmail.com