কোনো কোনো বাবা সবার

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

স্মরণ

কোনো কোনো বাবা সবার

মিলটন রহমান ৮:৫৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০১৯

print
কোনো কোনো বাবা সবার

বাবারা সর্বদা অপ্রাপ্তির যোগ তৈরি করেই চলেন। যত প্রাপ্তির ভাগ্য দুয়ার খুলে থাকেন সন্তানদের জন্য। আমার বাবা প্রাকৃতিকভাবেই এই ঘরানার মানুষ। একজন মানুষ মানব সমাজের মঙ্গল ভেবে এত বেশি নিজেকে নিমগ্ন রাখতে পারেন তাকে দেখে জেনেছি। রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষাসহ মানব মঙ্গলের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার চিন্তা প্রসারিত ছিল।

ছাত্রজীবনেই তিনি বুঝেছিলেন, রাজনীতি ছাড়া সমাজ বা রাষ্ট্রের মঙ্গল সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে রাজনীতির মাঠে অতিক্রান্ত সেই সোনালি সময়ের কথা শুনাতেন। সর্বকনিষ্ঠ রাজনীতিক হয়েও সীতাকুণ্ড থানার টেরিয়াইল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মওলানা ভাসানীর জনসভায় সবার অনুরোধে কীভাবে সভাপতিত্ব করেছেন সেই সময়ের বর্ণনা করতে করতে বাবার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখেছি। গরুর গাড়িতে, হেঁটে দূরদূরান্তে রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে কীভাবে যোগ দিতেন সেই গল্প বলতে বলতে কপালে বক্ররেখা টেনে আনতেন।

বলতেন ‘আমরাও রাজনীতি করেছি। পাশাপাশি দুই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুই দল একে অপরের কঠোর সমালোচনা করেছি। আবার জনসভা শেষে দুই পক্ষই একসঙ্গে একই টেবিলে বসে চা পান করেছি। গল্প করেছি। আমাদের যা বলার তা তো মঞ্চেই বলে দিয়েছি। আর সেই রাজনীতি এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে বাবার কপালের বক্ররেখাটি যেন আরও গভীর খাদ হয়ে বসে যেত কপালে। বলতেন, তাদের রাজনীতি ছিল সর্বমঙ্গলময়। একার কারও আখের গোছানোর রাজনীতি তখন ছিল না।

বাবা একথা যখন বলতেন তখন আমার এক বৃদ্ধ মহিলার কথা মনে পড়ে। আমাদের পাশেই শেখপাড়া গ্রাম। ওই গ্রামের রাস্তা দিয়ে আমাদের বর্গা কৃষক আবুল দাদার সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছি। তখন এক বৃদ্ধ মহিলা আবুল দাদার কাছে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। পরিচয় জেনেই আমাকে জড়িয়ে ধরেলেন। নিজের ঘর দেখিয়ে বললেন, ‘ভাই এই যে ঘরের টিন দেখছো এগুলো তোমার বাবা যখন ভাইস চেয়ারম্যান ছিল তখন দিয়েছে।

সরকারের কোনো অনুদান এলে তা বাইরে থেকে বিলিবণ্টন করে দিত তোমার বাবা।’ বাবাও একবার আমাকে বলেছিলেন, তিনি যখন ভাইস চেয়ারম্যান কিংবা রেশন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন সরকারি কোনো অনুদান এলেই তা গুদামে না ঢুকিয়ে মাঠে রেখেই সব বিলিবণ্টন করে দিতেন যাতে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারেন।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমার বাবাকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের ভাগ্যেই তিনি ফিরে এসেছিলেন। বাবার অপরাধ তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। আমাদের বাড়িতেই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি। কাছের পাহাড়েই মুক্তিযোদ্ধারা দিনযাপন করতেন আর রাত হলেই নেমে আসতেন আমাদের বাড়িতে। মা বড় বড় হাঁড়িতে রান্না করে রাখতেন, মুক্তিযোদ্ধারা এসে খেয়ে ঘরের উত্তরের বারান্দায় জড়ো হতেন।

দিনের বেলা বাবা পাহাড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সংবাদ দিতে যেতেন কোমরে মাছের ডুলা এবং জাল হাতে। একদিন আবুল নামের এক রাজাকার আমার বাবা সম্পর্কে সংবাদ দেয় পাকিস্তানিদের। সেই সংবাদের ভিত্তিতেই তারা বাবাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এই ক্ষোভে সামসুল ইসলাম নামের এক সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হত্যা করে রাজাকার আবুলকে।

যুদ্ধ শেষ, বাবা তখন সাধারণ বিমায় ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করতেন। কিন্তু যার মগজে সমাজসেবা তার পক্ষে কি মুনিষ খাটা সম্ভব! তিনি চাকরি ছেড়ে দিলেন, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনের জন্য। সেই সঙ্গে এলাকার শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হলেন। প্রতিষ্ঠা করলেন পন্থিছিলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর পর একে একে সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন মাদ্রাসা, হাইস্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

বাবার শেষ ইচ্ছে ছিল একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন। পূরণ হওয়ার আগেই চলে গেলেন ওপারে। আমাদের সে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। হয়তো তাও একদিন পূরণ হবে। আমার বাবার কাছ থেকে শিখেছি সবার জন্য কাজ করলে নিজের কাজও হয়।

তিনি নিজের জীবনের বেশির ভাগ সময় অন্যের মঙ্গলে কাজ করে গেছেন। আর আমাদের অর্থবিত্তের মোহ না দেখিয়ে শিক্ষিত এবং মানবিক মানুষ হওয়ার প্রণোদনা দিয়েছেন। একইভাবে তিনি সেই দীক্ষা দিয়েছেন এলাকার প্রতিটি মানুষকে। তাই আমি মনে করি এমন মহামানবের জীবন থেকে জেনে নেওয়ার অনেক কিছুই রয়েছে। আমার বাবা ডাক্তার এ কে এম ওয়াহীদি সব ছেড়ে পরলোকে চলে গেলেন গত ১৭ আগস্ট ২০১৯। কিন্তু রেখে গেছেন নিজের কাজ, যা মানব মঙ্গলে যুগ যুগ আলো বিস্তার করবে।

মিলটন রহমান
কবি, লেখক ও সাংবাদিক