একাত্তরের বেদনাময় ঈদ!

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

একাত্তরের বেদনাময় ঈদ!

ইমরান মাহফুজ ৯:৫৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

print
একাত্তরের বেদনাময় ঈদ!

‘আজ ঈদ। ঈদের কোনো আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারও জামাকাপড় কেনা হয়নি। দরজা-জানালার পর্দা কাচা হয়নি। ঘরের ঝুল ঝাড়া হয়নি। বাসায় ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান। শরীফ, জামী ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি। কিন্তু আমি ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে? বাবা-মা-ভাই-বোন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়িতে? তাদের খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও কোর্মা, কোপ্তা কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াব। তাদের জামায় লাগিয়ে দেওয়ার জন্য একশিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি।’ একাত্তরের দিনগুলো বইতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ২০ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে ডায়েরিতে বেদনামাখা কথাগুলো লিখেন।

মুক্তিযুদ্ধে ঈদ পালন করেননি মুক্তিযোদ্ধারা বরং দেশ স্বাধীন করে ‘বিজয়ের ঈদ উৎসব’ পালনের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতর ছিল ২০ নভেম্বর। দিনটি ছিল শনিবার। সারা দেশে চলছে সশস্ত্র যুদ্ধ। সমগ্র জাতিই তখন যুদ্ধে শামিল। এরকম ঈদ মনে হয় জাতির জীবনে আর কখনো আসেনি। আতঙ্ক, দেশ স্বাধীন করার সংকল্প, শরণার্থী শিবিরে অনিশ্চিত জীবন- এসব কিছু ঘিরে ছিল প্রতিটি মানুষের মন। রণাঙ্গনে ঈদের দিনেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চলছিল। সারা দেশে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ এবং শহীদ হওয়ার ঘটনা ঘটছিল। ভুরুঙ্গামারিতে শহীদও হয়েছিলেন বীরউত্তম আশফাকুস সামাদ।

ঈদের আগের দিন কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’র ২৮তম সংখ্যা। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাণী বক্স আইটেমে। বাণীতে উল্লেখ করেন, ‘আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই, যেদিন আমরা দেশকে শত্রুমুক্ত করব। যথাসর্বস্ব পণ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত, তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিনটি নিকটতর হয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তটিকে এগিয়ে আনার সংগ্রামে আমরা সকলে যেন নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের নিয়োগ করতে পারি- এই ঈদে তাই হোক আমাদের প্রার্থনা।’

তবে কলকাতায় ঈদের নামাজ হয়েছিল। প্রবাসী সরকারের উদ্যোগে ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতার থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় প্রাঙ্গণে ঈদ নামাজের আয়োজন হয়েছিল। অংশ নিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এম কামরুজ্জামান, প্রধান সেনাপতি মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, বিমানবাহিনী প্রধান এ কে খন্দকার, অধ্যাপক ইফসুফ আলী প্রমুখ।

মুজিবনগর সরকারের ঈদ
ঈদের দিনে রাতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশে প্রবেশ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। সে সময়ে রণাঙ্গনের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের ‘একাত্তরের রণাঙ্গন : অকথিত কিছু কথা’ গ্রন্থে মুজিবনগর সরকারের ঈদ উদযাপনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সে গ্রন্থ থেকে-

‘মুজিবনগর সরকারের সদর দফতরের ছোট মাঠে এক অনাড়ম্বর পরিবেশে ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে মুজিবনগরে খুব ঘটা করে ঈদুল ফিতর উদযাপনের ব্যাপক প্রচার করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পর্কে মুসলিম দেশগুলোর কাছে ফ্যাসিস্ট পাকিস্তানিদের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি দূর করার জন্য।

মুসলিম দেশগুলোর বিভ্রান্তি ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সৃষ্ট ভুল ধারণা মোচন করে তাদের জানিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, কোনো মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে বিধর্মীদের যুদ্ধ নয়। এটা স্বাধীনতাকামী একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই। ধর্মের দুশমন, মানবতার দুশমন এই ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধেই মুক্তিযুদ্ধ। এটাকেই প্রকৃত অর্থে সত্যিকারের জেহাদ বলা যেতে পারে।

এজন্য আগে থেকেই স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের দখলকৃত মুক্ত এলাকায় ঘটা করে ঈদুল ফিতর উদযাপনের ব্যাপক আয়োজনের খবর ফলাওভাবে প্রচার করা হয়েছিল। ...ঈদুল-ফিতরের জামাত পরিচালনা করেছিলেন মওলানা দেলোয়ার হোসেন। বাংলাদেশের ভোলা নিবাসী এই মওলানা আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের খুব ভক্ত ছিলেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কোরআন পাঠ এবং তাফসির করতেন বলেও জানা যায়।

বঙ্গবন্ধু, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতির উদ্দেশে বাণী দেন। এটি প্রচার করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। জয় বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২৬ নভেম্বর। বাণীতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন, পবিত্র রমজান মাসেও হানাদার বাহিনীর বর্বরতায় বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু নির্বিশেষে অসংখ্য নরনারী নিহত হচ্ছে। গত বছর আমরা ১২ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে নিহত দশ লাখ মানুষের শোকে মুহ্যমান অবস্থায় ঈদ পালন করতে পারিনি।

এবারও আমরা ইয়াহিয়ার সৈন্যদের বর্বরতায় নিহত দশ লাখ ভাইবোনের বিয়োগ বেদনা বুকে নিয়ে ঈদের জামাতে শামিল হয়েছি। কিন্তু দুঃখ-কষ্ট যাই হোক, ত্যাগের মন্ত্রে আমরা উদ্বুদ্ধ এবং যেকোনো ত্যাগের মূল্যে স্বাধীনতার ঘোষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে বদ্ধপরিকর। দেশকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করার পরই ঈদুল ফিতর বা বিজয়ের ঈদ উৎসব পালন করব এবং সেদিন খুব দূরে নয়, এই প্রতিশ্রুতি আমি আপনাদের দিতে পারি।

ঈদের আগের দিন ১৯ নভেম্বর ‘এই ঈদে আমাদের প্রার্থনা হোক’ শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাণী প্রকাশ করে জয়বাংলা পত্রিকা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। দখলীকৃত এলাকায় শত্রুসৈন্যের তা-ব চলছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্যুত হয়ে শরণার্থী হয়েছেন, মুক্ত এলাকায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, রক্তের বিনিময়ে মানুষ মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম করছে। এবার ঈদের আনন্দ মুছে গেছে আমাদের জীবন থেকে, আছে শুধু স্বজন হারানোর শোক, দুর্জয় সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা ও আত্মত্যাগের প্রবল সংকল্প।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশের জনসাধারণকে ঈদ উপলক্ষে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই, যেদিন আমরা দেশকে সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত করব। আমি আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, যথাসর্বস্ব পণ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত, তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিনটি নিকটতর হয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তটিকে এগিয়ে আনার সংগ্রামে আমরা সকলে যেন নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের নিয়োগ করতে পারি, এই ঈদে তাই হোক আমাদের প্রার্থনা।’

ঈদের আগের দিনে (১৯/১১/১৯৭১) সাপ্তাহিক জয় বাংলার ২৮তম সংখ্যায় সম্পাদকীয় কলামে ‘উৎসবের ঈদ নয়, ত্যাগের ঈদ’ শিরোনাম উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাণীও প্রকাশ করে। যদিও বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের জেলে ছিলেন বন্দি।

বঙ্গবন্ধুর বাণীতে- ‘আমি নিজেকে বাঙালি ভাবতে গর্ববোধ করি। বহতা নদীর মতো আমাদের সংস্কৃতির ধারাও বেগবতী ও প্রাণাবেগপূর্ণ। আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হলে বাঙালি আবার বিশ্বসভায় মাথা তুলে দাঁড়াবে। বাঙালি হওয়ার সঙ্গে ধর্মে মুসলমান থাকার কোনো বিরোধ নেই। একটি আমার ধর্ম, অন্যটি জাতি পরিচয়। ধর্ম আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচার। জাতি পরিচয় আমার সমষ্টিগত ঐতিহ্য। একজন হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি অথবা বৌদ্ধ বা খিস্টান বাঙালির মধ্যে পার্থক্য এটুকুই যে, তাদের ধর্মমত শুধু আলাদা কিন্তু খাদ্য, রুচি, ভৌগোলিক পরিবেশ, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, বর্ণ ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিক থেকে তারা অভিন্ন...।’

অন্যদিকে অবরুদ্ধ ঢাকায় ঈদের সময় অবস্থান করছিলেন শিল্পী হাশেম খান। তিনি ‘২০ নভেম্বর ১৯৭১’ শিরোনামে একটি লেখায় সেদিনের স্মৃতিচারণ করেছেন- ‘আজ ঈদ। আনন্দের দিন, উৎসবের দিন। কিন্তু কী আনন্দ করব এবার আমরা? নতুন জামা কাপড় বা পোশাক কেনা-কাটার আগ্রহ নেই! শিশু-কিশোরদের কোনো আবদার নেই, চাওয়া-পাওয়া নেই। বাড়িতে বাড়িতে কি পোলাও কোরমা ফিরনি সেমাই রান্না হবে? আমার বাড়িতে তো এসবের কোনো আয়োজন হয়নি। প্রতিটি বাঙালির বাড়িতে এরকমই তো অবস্থা।’

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান (বর্তমান জাতীয় অধ্যাপক) তার ‘আমার একাত্তর’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ঈদের ক’দিন আগে তাজউদ্দীন আমাকে ডেকে পাঠালেন। স্বভাবতই বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলো। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ-সফরের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি কিছুটা ধারণা দিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, বঙ্গবন্ধুর বিচারের ফল যাই হোক, বিশ্বজনমতের কারণেই, পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধ যে চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে সে বিষয়ে তার সন্দেহ ছিল না।

কথাবার্তার শেষে উঠে গিয়ে ঘরের মধ্যে রাখা আয়রন সেফ থেকে একটা খাম বের করে তিনি আমার হাতে দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী এটা?’ তিনি বললেন ‘সামনে ঈদ, তাই।’ খামে পাঁচশ’ টাকা ছিল, তখন আমার এক মাসের মাইনের সমান। আমি নিতে চাইলাম না। তিনি বললেন, ‘ঈদে আপনার বাচ্চাদের তো আমি উপহার দিতে পারি, নাকি।’ কথাটা বলতে গিয়ে তিনি নিজেই ভাবাবেগপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন, আমিও খুব অভিভূত হয়ে কিছু আর বলতে পারিনি।’

‘চরমপত্র’ খ্যাত সাংবাদিক এমআর আখতার মুকুল তার স্মৃতিচারণ করেন, ‘আমরা যখন থিয়েটার রোডে পৌঁছলাম তখন কেবলমাত্র নামাজ শেষ হয়েছে। তাই প্রায় সবার সঙ্গে কোলাকুলি করলাম। এরপর সবার অশ্রুভেজা কণ্ঠে কেবল রণাঙ্গন ও ঢাকার আলাপ। প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, দৈহিকভাবে আমরা মুজিবনগরে থাকলেও আমাদের মন-প্রাণ সবই পড়ে রয়েছে দখলীকৃত বাংলাদেশে। আর সেখানকার সব মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের সাফল্যের দিকে। বাঙালি জাতির এ রকম একাত্মতাবোধ আর দেখিনি।’

সাহিত্যিক আবু জাফর সামসুদ্দীন তার ৭১-এর ঢাকায় ঈদের বর্ণনায় লিখেন, ‘ঈদের দিন শনিবার। যুদ্ধকালে কোনো জামাত জায়েজ নয়। নামাজে যাইনি। কনিষ্ঠ পুত্র কায়েসকে সঙ্গে নিয়ে সকাল ৯টায় ছিদ্দিক বাজারের উদ্দেশ্যে বের হলাম। রিকশায় চড়ে দেখি সড়ক জনমানবশূন্য। টেলিভিশন অফিসে যেতে রিকশা ফিরিয়ে দিল। ট্রাকে ট্রাকে টহল ও পাহারায়ও মিলিটারি। যাওয়ার সময় দেখলাম বায়তুল মোকাররম মসজিদে মিলিটারি পাহারায় ঈদ জামাত হচ্ছে। আমার জীবনে এই প্রথম ঈদের জামাতে শরিক হইনি।’

জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতিসহ কয়েকটি সংগঠন। ১৬ নভেম্বর বাংলাদেশ মহিলা সমিতির একটি আবেদন পত্রে প্রবাসীদের ফেতরার টাকা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রদান করার আহ্বান জানানো হয়। আবেদনপত্রটি নিম্নরূপ-

সুধী, পবিত্র ঈদ সমাগমে প্রতিটি দেশপ্রাণ বাঙালির মন স্বভাবতই ভারাক্রান্ত। দেশ ও জাতি আজ ঘোরতর দুর্যোগের সম্মুখীন। ইয়াহিয়ার নীতি ও ধর্মজ্ঞান বিবর্জিত নৃশংস সেনাবাহিনীর অত্যাচারে জর্জরিত। অত্যাচারী এজিদ বাহিনি বাঙালি জাতির নাম পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর। দেশের এই সংকটে আমাদের একমাত্র ভরসাস্থল মরণজয়ী জেহাদেরত মুক্তিবাহিনী ভাইরা। বাংলা ও বাঙালিকে তারা বাঁচাবেই- প্রয়োজন হলে তাদের জীবনের বিনিময়ে। আমাদের ঈদ ব্যর্থ হবে যদি এই পবিত্র দিনে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য ভুলে যাই।

তাই যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ মহিলা সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবারের ফেতরার পয়সা সংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর কাপড়-চোপড় ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস খরিদ করার জন্য পাঠিয়ে দেবে। এ ব্যাপারে আমরা অনুরোধ করছি আপনাদের আন্তরিক সহযোগিতা।

আসুন ভাই ও বোনেরা, এবারের ফেতরার পয়সা মুক্তিবাহিনীর নামে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির কাছে পাঠিয়ে দিয়ে জিহাদে শরিক হই। দানের দ্বারা দেশের প্রতি আপনার গুরুদায়িত্বের ভার কিছুটা লাঘব করুন। আপনার ঈদ সার্থক ও পবিত্রতর হোক।

জয় বাংলা।
নিবেদিকা, মিসেস বখশ
পরিশেষে বলা যায়, রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের প্রেরণা জোগানোর জন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ২০ নভেম্বর ঈদে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। এতে আলোচিত ও আলোড়িত ছিল ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও/দেখো মানুষের খুনে খুনে রক্তিম বাংলা/রূপসী আঁচল কোথায় রাখবো বলো’ শীর্ষক গানটি। গানটির কথা লিখেছেন শহীদুল ইসলাম, সুর করেছেন অজিত রায়, শিল্পী রূপা ফরহাদসহ আরও অনেকেই গানটি কোরাসে গেয়েছিলেন।

মুক্তিকামীদের বুকে এপারে, ওপারে সেদিন চাঁদ এসেছিল এবং চাঁদকে ফিরিয়েও দেওয়া হয়েছিল কেবল একটি স্বপ্ন পূরণের আশায়। সে প্রত্যাশার সূর্য উঠে ১৬ ডিসেম্বর; লোমহর্ষক নির্যাতনের স্মৃতি ভুলে আনন্দে মেতে উঠে সবাই। আর ২০ নভেম্বর ঈদ কেটেছিল বেদনাময়! প্রসঙ্গত মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায় এমন বিষয় তথা মাহাত্ম্য এবং যথাযথ ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সবার আন্তরিকতা জরুরি।

ইমরান মাহফুজ : কবি, গবেষক ও সম্পাদক ‘কালের ধ্বনি’
emranmahfuj@zahoo.com