পেঁয়াজের বউ কই?

ঢাকা, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পেঁয়াজের বউ কই?

খোলা কাগজ ডেস্ক ৯:০০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

print
পেঁয়াজের বউ কই?

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় বাক্যের মধ্যে একটি, ‘পতন হলে বউ ছাড়া কেউ কাছে থাকবে না।’ যুবলীগের অব্যাহতি পাওয়া সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীর এই বাক্য অনেকেই সত্য মনে করেন। প্রায় দুই সপ্তাহ বাজারে পেঁয়াজের দাপটের পর, আজ (গতকাল) থেকে পণ্যটির পতন শুরু হলো। অর্থাৎ দাম কমছে। একদিনে ৭০-৮০ টাকা দাম কমেছে পেঁয়াজের। ব্যতিক্রম বিষয়, পতনের সময় কেউ প্রশ্ন করছে না পেঁয়াজের বউ পাশে আছেন কী-না!

হাস্যকর মনে হলেও, এই প্রশ্নের যৌক্তিকতা আছে। সেটা বলার আগে, বলে নেই- এখন যিনি বাণিজ্যমন্ত্রী তিনি কিন্তু ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যবসায়ীদের যে অবদান, তা তারও। আবার বাজার অস্থির করার পেছনে ব্যবসায়ীদের যে বদনাম, সেটা থেকে মন্ত্রী সাহেবকে আলাদা করার কারণ দেখছি না।

পেঁয়াজের দাম যখন বাড়তে শুরু করে, তখন আমি/আপনি, সাধারণেরা বুঝিনি, কি হতে যাচ্ছে। ঝানু ব্যবসায়ী বাণিজ্যমন্ত্রী বোঝেননি, সেটা আমি বিশ্বাস করি না। বরং আমার মনে হয়েছে, বুঝেও তিনি এই দুই সপ্তাহ পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের বাড়তে দিয়েছেন। এখন আসুন দেখি, পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের বাড়তে না দিলে সরকার কি কি করতে পারত?

১. বাজারের সব আড়ত দখল নিয়ে, নির্দিষ্ট দামে কিনে, পেঁয়াজের বাজার পুরো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারত!
এর প্রতিক্রিয়া কি হতো?
* পেয়াজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের ব্যাপক দূরত্ব তৈরি হতো। যেটা পরে সরকারের বিরুদ্ধে স্যাবোটাজে পরিণত হতে পারত।
* সরকার পেঁয়াজের বাজার দখল করলে, ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ আমদানিতে উৎসাহ হারাতেন।
* দেশে যথেষ্ট পেঁয়াজের মজুদ ছিল না। ব্যবসায়ীরা আমদানি না করলে, এত দ্রুত বাজার স্বাভাবিক হতো না। সরকারকে গচ্চা দিয়ে আমদানি করতে হতো, তাও এমন এক সময় যখন নতুন পেঁয়াজ উঠি উঠি করছে।

২. সরকার আর যা করতে পারত, পেঁয়াজের দাম নির্দিষ্ট করে দেওয়া যেত।
এতে কি হতো, দেখে নিই-
* বাজারে যে উন্মাদ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তাতে সরকার ৬০-৭০ টাকা পেঁয়াজের কেজি নির্দিষ্ট করে দিলে, ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দিত। বাজারে পেঁয়াজ মার্কেট আউট দেখাতো। কালো বাজারে দাম আরও বাড়ার আশংকা হতো।
* সরকার দাম নির্দিষ্ট করে দিতে চাইলে সেটা কমপক্ষে ১২০ টাকা কেজি করতে হতো। তখন বাজারে পেঁয়াজের দাম বহুদিন ১২০ টাকাই থাকত। এটা আর কমানোর চিন্তাও ব্যবসায়ীরা করতেন না।

৩. সরকার যা করেছে। ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে দিয়েছে।
এর ফল কি হলো দেখে নিই-
* বড় বড় ব্যবসায়ী এলসি খুলে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করলেন। এমনকি মিসর থেকেও পেঁয়াজ আমদানি হলো। বাজারে যে পেঁয়াজ ঘাটতি ছিল, সেটা কমতে শুরু করল।
* লোকে সত্যিই পেঁয়াজ খাওয়া অনেক কমিয়ে দিল। ফলে, পেঁয়াজের চাহিদা মারাত্মক হারে কমেছেও।
* সরকার ৪৫ টাকা কেজিতে নামমাত্র কিছু জায়গায় পেঁয়াজ বিক্রি করে, জানিয়ে রাখল- তাদের হাতেও অল্প কিছু পেঁয়াজ আছে এবং ন্যায্য দাম ৪৫ টাকার বেশি না। এতে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের ওপর মানুষ খেপল। এবং এতেও পেঁয়াজ খাওয়া কমানোর সিদ্ধান্ত জোর পেল।
* সর্বোপরি সরকার জানতো, নতুন পেঁয়াজ আসছে, ফলে এই অস্থিরতা বেশি দিন জায়গা পাবে না। মাঝে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আনা কৃষক একটু বেশি দাম পেল, পাচ্ছেন।
* আগামী বছর পেঁয়াজের সঠিক চাহিদার মাপ সরকার, ব্যবসায়ী সবাই জানলো। ফলে সামনে বাজার অস্থির হওয়ার আগেই সবাই পেঁয়াজ মজুদ রাখবে।
* ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক ভালো থাকল। পাবলিক পেঁয়াজ খাওয়া কমালো এবং নতুন পেঁয়াজে বাজারের অস্থিরতা কমতে শুরু করল দুই সপ্তাহের মধ্যেই।
এখন দেখুন, এই যে মাঝের দুই সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে যারা মুনাফা লুটল, তেনাদের কি অবস্থা? তেনাদের এই টাকা যাবে বউদের গহনায়, পরিবারের বিদেশ ভ্রমণে আর বিলাসিতায়। কিন্তু যারা লাভ করেছেন, তাদের অনেকেই বা এরকম কেউ কেউ আরও লাভের আশায় অনেক পেঁয়াজ স্টকে রেখেছেন, যেগুলো এখন আড়তে পচবে। এনারা কাউকে এ জন্য দোষও দিতে পারবেন না। এনারা এখন নিজেদের পেঁয়াজ নিজেরাই পচতে দেখবেন। এনারাই হচ্ছেন পেঁয়াজের প্রকৃত বউ, পতনের সময় পাশে থাকলেন।


আশিকুর রহমান অপু
গণমাধ্যমকর্মী