পেঁয়াজের ঝাঁজে অসহায় আত্মসমর্পণ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পেঁয়াজের ঝাঁজে অসহায় আত্মসমর্পণ

আবু বকর সিদ্দীক ৯:১৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

print
পেঁয়াজের ঝাঁজে অসহায় আত্মসমর্পণ

পেঁয়াজের কাছে গত দুই মাসে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ মোটেই কাজে আসেনি। নতজানু হয়ে বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাতাসে ভেসে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর রান্নাঘরে পেঁয়াজ না রাখার ঘোষণাও কোনো কাজে আসেনি। ক্রেতাদের চোখের পানি আর নাকের পানি এক হয়ে পেঁয়াজ আমাদের অক্ষমতাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। দুবাই যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী আবারও স্মরণ করে দিলেন, তার রান্নাঘরে পেঁয়াজের প্রবেশ নিষেধ করেছেন, তা অব্যাহত আছে। কিন্তু কী এমন ঘটলো যার জন্য ভোগ্যপণ্যের তালিকায় সাধারণ খেতাবের এ পেঁয়াজ ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল?

সাম্প্রতিক আলোচনায় চোখ দিলে বিষয়টি বুঝতে বাকি থাকে না, সাধারণ এ খাতেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। এ সময়ে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোনো অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়নি। আবার পেঁয়াজ যে শুধু আমদানিনির্ভর পণ্য, তাও নয়। আমরা বহুবার পত্রিকায় এ পণ্যের উপযুক্ত দাম না পেয়ে কৃষককে বুক চাপড়াতে দেখেছি, বস্তা বস্তা পেঁয়াজ বাজারের পাশের রাস্তায় ফেলে তাদের বিরস বদনে মুখে হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখেছি। সেগুলো আমাদের কৃষি ব্যবস্থার দুরবস্থা ও অনিয়মকে উসকে দেয়। অথচ ভারত থেকে এ পণ্যের আমদানি সাময়িক বন্ধ হওয়াকে কেন্দ্র করে তার দাম উঠে গেল চাঁদের কাছাকাছি।

মানুষের চাহিদার বিপরীতে জোগানের যে সমন্বয় তা যদি কোনো মন্ত্রণালয় না করতে পারে তাহলে তারা চেয়ারে থাকে কীভাবে? নিষিদ্ধ কোনো দেশ নিশ্চয়ই আমরা নই, বিশ্বের অন্য দেশ থেকে কেন এ পণ্য আনতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে, হঠাৎ দেশের বাজার থেকে মজুদ থাকা পেঁয়াজগুলো ঘাপটি মেরে কাদের গুদামে আশ্রয় নিলো, দেশের গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও নানা অপরাধীদের বের করে এনে ক্রসফায়ারে দেওয়ার চৌকস র‌্যাব-পুলিশ হাত গুটিয়ে বসে থাকলো কেন? আবার চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ থেকে প্রায় ১৫ টন পচা পেঁয়াজ আবর্জনা ফেলার স্থানে ফেলা হলো? এসব হাজারটা প্রশ্নের সহজ উত্তর- জবাবদিহিতা না থাকা।

তিন মাস আগেও ২৫ থেকে ৩০ টাকায় পেঁয়াজ পাওয়া গেছে, ভারত মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর তা এ কয়দিনে আড়াইশ টাকা ছাড়িয়েছে। দাম যখন সেঞ্চুরির কাছাকাছি তখনো মন্ত্রী-কর্তারা বলেছেন, স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে না। তারা গভীরভাবে দেখছেন।

ভারতের দুয়ার বন্ধ বলে তারা মিসর, তুরস্ক, চীনসহ নানা দুয়ারে ছুটছেন। কিন্তু দেশের গুদামে লুকিয়ে রাখাগুলোর বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। লাফিয়ে লাফিয়ে সবার চোখের সামনে সে পেঁয়াজ সবার ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেল, বিশ্ববাজারে রেকর্ড তৈরি হলো, তারপরও টিভি ক্যামেরার সামনে মন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে, নিয়ন্ত্রণে আছে। বিমানে উঠে গেছে মহামান্য পেঁয়াজ, আর চিন্তা নেই- কিন্তু বাস্তবে তার কোনো মিল নেই।

দেশের পথের ভিআইপি পেঁয়াজ নিয়ে নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাত টনের জায়গায় ২৫ টন বোঝায় করে গড়াতে গড়াতে ভারত থেকে আসা পেঁয়াজের দামই ঘাড় উঁচু করে দেখতে হচ্ছে, তাহলে বিমানের পেঁয়াজ কোথায় ঠেকবে। এসবের বাইরে সবখানে মূল আলোচনা- হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বাড়লো কীভাবে? পাইকারি বাজারে ১০ টাকা বাড়লে এখানে খুচরা বাজারে বাড়ে চার থেকে পাঁচগুণ। বাজার নিয়ন্ত্রণের সংস্থাগুলোর ঘুম ভাঙে জনগণের পকেট থেকে হাজার কোটি খসে পড়ার পরে। পত্রিকার তথ্যে জানা গেছে, উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে দেশে এখনো ১০ লাখ টন পেঁয়াজ রয়েছে। সারা বছর এ পণ্যের চাহিদা ৩০ লাখ টনের কাছাকাছি। দেশে উৎপাদনের বাইরে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বছরে সাত থেকে ১০ লাখ টন আমদানি করতে হয়। চলতি সময় মোকাবেলা করার মতো পেঁয়াজ দেশের গুদামেই আছে। অথচ পচনশীল বলে এ পণ্য বেশি দিন ঘরে রাখা যায় না, আবার দূর দেশ থেকেও আমদানি করা হয় না। মজুদদাররা নিশ্চয়ই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পেঁয়াজ পচিয়ে তা বাইরে ফেলে দিচ্ছে কিন্তু বিক্রি করছে না। এ সহজ সত্যটা চেয়ারের ক্ষমতাধররা বুঝছেন না কেন?

ঢাকায় কয়েকটি জায়গায় (টিসিবির দাবি ৩৫) সরকারি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে। ট্রাকসেলের সে চিত্র দেখলে যে কেউ ভয় পাবে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা বিশাল বনে হেলিকপ্টারে পানি ছিটানোর মতো দৃশ্য। একটি ট্রাককে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক হাজার মানুষ, সোনার হরিণের মতো কেউ পাচ্ছে, লাইনের মাঝপথেই শেষ। ৪৫ টাকায় এককেজি, একজনের জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দও তা। কিন্তু অনেক কসরত করেও যখন তা পাচ্ছে না তখন বিতশ্রদ্ধ মানুষগুলো লাইনে দাঁড়ানোর শ্রমের সঙ্গে পেঁয়াজের হিসাব মেলাতে গলদঘর্ম হয়ে আবোল-তাবোল বকছে।

পেঁয়াজের দাম কমবে। মাঠ থেকে কৃষকের পেঁয়াজ ঘরের পথ ধরেছে। কিন্তু কৃষকের কোনো গুদাম নেই, তার সামনে আছে এনজিও ঋণ, মহাজনি সুদ আর দোকানিদের দেনা। প্রকৃতির অমোঘ শিক্ষায় কৃষি আমাদের দেখিয়ে দেয়, এখানে কোনো ছলচাতুরী, ঘুষ-দুর্নীতি চলে না। চারা তৈরি, জমি প্রস্তুত এবং রোপণের পরে পেঁয়াজকে ঠিকমতো লালন-পালন না করলে সে কিছুতেই ফলন দেবে না। প্রতিটি স্তরে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম ও নিয়ম মানার কঠোরতা রয়েছে। সন্তানের লেখাপড়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও এনজিওর কিস্তি দেওয়ার জন্য কৃষক পেঁয়াজের পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করলেও তার যায় আসে না। নির্দিষ্ট সময়ের আগে বেড়েও উঠবে না, ওজনেও দ্বিগুণ হবে না।

মাঠ থেকে কৃষানীর উঠানে আসা পেঁয়াজকে ঘিরে কৃষকের স্বপ্নগুলো গিলে খায় মজুতদার। ব্যবস্থাপনার অভাবে, সাময়িক অভাবকে দূর করতে কৃষক কম শুকনো পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হয়, তখন তা পানির দামে ক্রয় করে মধ্যস্বত্বভোগীরা। ধার-বাকি শোধ এবং পেঁয়াজকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে দ্রুত তা বিক্রি করতে বাধ্য হয় কৃষক। টাকাওয়ালা আড়তদার এ সময়টায় গোঁফে তা দেয়, পচে যাওয়ার ভয়, পাওনাদারের তাগাদা আর নতুন ফসলের তাগিদ থেকে কৃষক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রিতে আত্মসমর্পণ করে।

পত্রিকা, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেঁয়াজ নিয়ে হৈচৈ কম হচ্ছে না। অবিশ্বাস্য দামের এ পেঁয়াজকে ঘিরে ঘর-সংসারে অবিশ্বাস বাড়ছে। ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কটা নষ্টই হচ্ছে না, কোথাও কোথাও রক্তপাতের ঘটনাও ঘটছে। কেউ দায় নিচ্ছে না, সরকার প্রধান যেমন নিজের রান্নাঘরে পেঁয়াজ না রাখার ঘোষণা দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ও পথে না হাঁটতে কিন্তু ভোজনপ্রিয় বাঙালি তা মানছেন না। তাদের দুর্দিনে সাদা ভাত পানি দিয়ে একটি কাঁচা মরিচের সঙ্গে পেঁয়াজ না থাকলে তা আর গলা দিয়ে নামে না।

আজ দাম বেশির কারণে রান্না ঘরে পেঁয়াজ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, চালের দামও বাড়ছে। তাহলে চালও কি নিষিদ্ধ হবে? পেঁয়াজ দেশেই সিংহভাগ উৎপাদন হয়, আমদানির তালিকায় রয়েছে ভোজ্যতেলসহ নানা মসলা। এভাবে কারসাজির মাধ্যমে কয়েকজন লোক রাতারাতি হাজার কোটি টাকা কামিয়ে নিতে চাইলে সামনের দিনের এ পরিস্থিতি বাড়তেই থাকবে। সবার আগে জবাবহিদিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার। কোনো পণ্যের ঘাটতি থাকলে তা জোগান ও সরবরাহ করা জরুরি। আইনের আওতায় উপযুক্ত শাস্তি দিলে অসাধুরা দেশবাসীকে জিম্মি করতে সাহস পাবে না।

আবু বকর সিদ্দীক
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
ইমেইল : abukushtia@gmail.com