রোহিঙ্গা সংকটে সামরিক কূটনীতি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

রোহিঙ্গা সংকটে সামরিক কূটনীতি

এম. আবদুল্লাহ আল মামুন খান ৯:৩১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

print
রোহিঙ্গা সংকটে সামরিক কূটনীতি

দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে ‘দ্বিপক্ষীয় সমাধানে’ বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীনের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস আদায় করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই গতিধারায় মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক নির্বাসিত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে সেখানে ফিরিয়ে নিতে এবার সামরিক কূটনীতির পথে হেঁটেছে বাংলাদেশ সরকার।

ফলে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের চার মাসের মাথায় মিয়ানমারের এ শক্তিধর মিত্র দেশের সামরিক নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটের আদ্যোপান্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন কিছুদিন আগে দেশটি সফর করে আসা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। কূটনৈতিক তৎপরতায় সাহসী ও অভিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রীর গাইডলাইনে সেনাপ্রধান চীনের সামরিক শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছেন।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বেসামরিক কূটনীতির পাশাপাশি সফল সামরিক কূটনৈতিক তৎপরতায় বাংলাদেশ সরকার আরও একধাপ এগিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে একমাত্র চীনই যে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারে এ বিষয়টি সামরিক নীতি-নির্ধারকদের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন সেনাপ্রধান।

এসবের পাশাপাশি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, সেনাপ্রধানের এ সফর বন্ধুপ্রতীম বাংলাদেশ এবং চীনের মৈত্রীবন্ধন আরও সুদৃঢ় করবে। ঢাকা-বেইজিং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নেও যোগ হবে নতুন মাত্রা। নিবিড় হবে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও। ফলে তারা সেনাপ্রধানের এ সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।

জানা যায়, দুই বছর আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতি ও মানবতার চরম বিপর্যয়ের পর চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথম দিকে চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তিনি ফলপ্রসূ আলোচনা করেন।

ওই সময় মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশকে আলোচনার মাধ্যমেই এ সংকট সমাধান করতে বলার পাশাপাশি প্রয়োজনে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস আদায় করে বড় রকমের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর চীনের চাপ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ‘নীরব দূতিয়ালি’ বা সাইলেন্ট ডিপ্লোমেসির মোড়কে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ।

সংবাদ মাধ্যমের ভাষ্য, মিয়ানমারে এনএলডির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও দেশটির সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করা ১১ সদস্যের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদে সেনাবাহিনীর আধিপত্য সুপ্রিতিষ্ঠিত। সেনাবাহিনী ও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মন্ত্রণালয়গুলো প্রত্যক্ষভাবে সেখানকার রোহিঙ্গা এলাকায় সহিংসতা মোকাবিলায় যুক্ত থাকায় সেখানে রাজনৈতিক সরকারের চেয়ে তাদের সেনাপ্রধানের মনোভাবই প্রাধান্য পায়। এমনকি রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধানও তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরই নির্ভর করে।

সূত্র মতে, চলমান এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সমাধান সূত্রের আলোকে স্ট্রাটেজি ঠিক করে সামরিক কূটনীতির পথে হাঁটতে শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টিতে তাদের সম্মত করতে একমাত্র চীনই সক্রিয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখার অধিকারী হওয়ায় মহাপরাক্রমশালী দেশটিতে সফরে গিয়ে তাদের সামরিক নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

গত সোমবার (০৪ নভেম্বর) থেকে শুক্রবার (০৮ নভেম্বর) পর্যন্ত চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী উয়েই ফেং, পিপলস লিবারেশন আর্মি গ্রাউন্ড ফোর্স এর কমান্ডার জেনারেল হান উয়েগো, চীন অলিম্পিক এসোসিয়েশনের কর্ণধার ও চীনের ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার বৈঠকে জ্বলন্ত রোহিঙ্গা ইস্যুটিই সর্বোচ্চ প্রাধান্য পায়।
চীনের শীর্ষস্থানীয় সামরিক নেতৃত্বের কাছে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে বাংলাদেশের আশ্রয় প্রদানের পর সাম্প্রতিক সময়ে যে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে এ বিষয়টিও তিনি জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন।

‘বাংলাদেশ বর্তমানে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, যা দেশের জন্য পরিবেশ ও নিরাপত্তার দিক থেকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ’ প্রায় চার মাস আগে চীনের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ বক্তব্যটিও তাদের সামনে তুলে ধরেন।

সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ চীনের সামরিক বাহিনীর নীতি-নির্ধারকদের মাধ্যমে মিয়ানমারের সেনা নায়কদের এ বিষয়টি বোঝানোর অনুরোধ করেন। দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সমস্যা দ্রুত সমাধানের বিষয়ে তারা সেনাপ্রধানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রাচীন। ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েও। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৃষি, বিনিয়োগ এবং শিল্প-বাণিজ্যে মহাচীনের সঙ্গে এ সম্পর্কের ক্রমশ বিস্তার ঘটছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বংলাদেশের ভূরাজনৈতিক, ভূ-কৌশলগত ও ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থান আঞ্চলিক কৌশলগত ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে রূপ দিয়েছে। বৈশ্বিক কৌশলগত ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত।

কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা এবং মিয়ানমারের শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসায় প্রত্যাবাসন ভেস্তে যাওয়ায় দুদেশের সম্পর্ক এখন শীতল অবস্থায় রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সামরিক কূটনীতিতেও এ সংকটের সম্ভাব্য সমাধান খুঁজছে বাংলাদেশ।

ফলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সেনা প্রধানের চীন সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অভিহিত করে বলছেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি জেনারেল আজিজ আহমেদের প্রথম চীন সফর। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া সফরের মতোই তার এ চীন সফরে কাক্সিক্ষত প্রত্যাশার পাশাপাশি অর্জনও রয়েছে।

রাজনৈতিক কূটনীতির মতোই সামরিক কূটনীতিতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে চীনের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যেমন ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে তেমনি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বেগবান হওয়ার পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ এ দেশটির সঙ্গে পারস্পরিক বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করবে। দুই জাতির সাধারণ বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং প্রকৃত মৈত্রীর চেতনারও মূর্ত প্রকাশ ঘটবে।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুবিন এস খান বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরেই প্রতিবেশী দুই শক্তিশালী রাষ্ট্র ভারত ও চীনের সঙ্গে একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট ক্রমশ জটিল আকার নিয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ চীনের জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশা করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরে তাকে এ বিষয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরবে কী না এটি নির্ধারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবেই চীনা সামরিক অস্ত্রের ওপর অনেক নির্ভর করে। ফলে বৃহৎ দুদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ‘ভারসাম্য’ রক্ষায় সেনাপ্রধানের চীন সফর নতুন মাত্রা নেবে’, যোগ করেন এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

সূত্র মতে, সামরিক কূটনীতিতে ইতোপূর্বেও সফলতার মুখ দেখেছিলেন বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। ২০১৪ সালের মে মাসে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) গুলিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য নায়েক মিজানুর রহমান নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়।

পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন ওই সময়কার বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনি ওই বছরের জুন মাসে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে বিজিবি ও মিয়ানমার পুলিশ ফোর্সের (এমপিএফ) প্রধানদের বৈঠকে বাংলাদেশের আট সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।

মিয়ানমার পুলিশ ফোর্সের (এমপিএফ) সঙ্গে বিজিবির এটি ছিল প্রথম বৈঠক। সেই বৈঠক দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর সম্পর্ক উন্নয়নে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। তৎকালীন বিজিবি মহাপরিচালকের ওই সফরের মধ্যে দিয়ে স্থল সীমান্ত চুক্তি মেনে নিয়ে দীর্ঘদিন একযোগে কাজ করে বিজিবি ও বিজিপি।
এতে করে স্বস্তি ফিরে আসে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের ২৬১ কিলোমিটার সীমান্তভূমিতে। ওই বৈঠকের সূত্র ধরেই এরপর বাংলাদেশের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের বহির্প্রকাশ ঘটায় মিয়ানমার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সামরিক শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে সেনাপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে চীনের জোর সমর্থনের পাশাপাশি কাউন্টার টেররিজম, সাইবার সিকিউরিটিসহ নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উন্নত প্রশিক্ষণ সহায়তা, দুই দেশের বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের যৌথ অনুশীলন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর চিকিৎসকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, সেনা সদস্যদের বিনা খরচে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।

এম. আবদুল্লাহ আল মামুন খান
সাংবাদিক