বাবরি মসজিদ ও রাজনীতির জুয়াখেলা

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বাবরি মসজিদ ও রাজনীতির জুয়াখেলা

আশেক মাহমুদ ৮:৪৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৯

print
বাবরি মসজিদ ও রাজনীতির জুয়াখেলা

অনেকেই মনে করে ‘বাবরি মসজিদ’ আর ‘রামমন্দির’ নিয়ে যা চলছে তাতে বোঝাই যাচ্ছে মানবজাতির মূল সমস্যা ধর্ম। সেই ১৫২৮ সালে নির্মিত বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয় ১৯৯২ সালে। এ নিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ নাকি চরমে ওঠে। এবার যখন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল-এখানে রামমন্দির হবে, এর মানে ১৯৯২ সালের মসজিদ ভাঙাকেই শুধু জায়েজ করা হয়নি, ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়া হয়।

৯২’র মসজিদ হত্যা, ২০০২ এ গুজরাটে গণহত্যা আর এ বছর কাশ্মীরে ইসরায়েলি কায়দায় দখলদারিত্বের যে আইনি সনদ দেওয়া হয় তার বৈধতা দানকারী ভারতের সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি আর অনুগত আইনিকাঠামো। আমার প্রশ্ন, এ বিষয়কে আমরা কি শুধুই হিন্দুত্ববাদের সীমার মধ্যে আটকে ফেলব? নাকি আড়ালে লুকানো রহস্যগুলো আরও তলিয়ে দেখব। হিন্দুত্ববাদ বললে সেটির মধ্যে ধর্মের প্রলেপ দেওয়া যায় সহজেই, ইসলামি জঙ্গি বললে এটাকেও ধর্মের প্রলেপে প্রচার করা যায়। আর সেই কাজটিই করে চলছে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী বিশ্বের প্রচার-মাধ্যমগুলো। আর আমরা ওই শব্দগুলোকে বাছবিচার ছাড়াই গিলছি।

গোটা ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা আর বিভেদ কে বাঁধাল? এটা কি ইংরেজ শাসকরা তাদের কলোনি পাকাপোক্ত করার জন্য করেনি? ইংরেজরা কেন বঙ্গভঙ্গ আর বঙ্গভঙ্গ রদের নাটক সাজাল? সেই থেকে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক জিঘাংসা চালু করল। এর মানে সহজ। একটা জাতিকে বোকা বানিয়ে তাদের ওপর শাসন করার অস্ত্রই হলো ধর্মের প্রলেপ লাগিয়ে সংঘাত বাঁধানো।

সাম্রাজ্যবাদীদের অনুসরণ সাম্রাজ্যবাদীরাই করবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই ইংরেজরাই কাশ্মীরকে এমনভাবে রেখে গেল, যাতে করে ভারত-পাকিস্থান লড়াই চলবে আর সেই ইস্যু ধরে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ চলতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। আজ ভারতের শাসকরা হিন্দুত্ববাদী চিন্তার প্রসারকে কেন এত গুরুত্ব দিয়ে চলল? এর উদ্দেশ্য কি ধর্ম? যদি তাই হয় তাহলে গান্ধীজির ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ নীতি কোথায় গেল? মহাত্মা গান্ধীর নীতি হিন্দুত্ববাদী? নাকি ভারতের চলমান শাসকশ্রেণির নীতিকে আমরা হিন্দুত্ববাদী বলব? ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ নীতির জন্মই হলো ইংরেজদের কুমতলব দমানোর চিন্তায়, অন্যদিকে মোদিবাদী ‘হিংস পরম ধর্ম’ নীতির জন্মই হলো ইংরেজ নীতিকে পুনঃজন্ম দেওয়া।

আমরা যদি ফিরে দেখি-ইসরায়েল কেন ৫০ বছর ধরে ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালিয়ে আসছে? এটা কী ধর্মযুদ্ধ? ১০০% মিথ্যা কথা। ইসরায়েল যদি নিপীড়নের প্রতিশোধ নিত তাহলে তো জার্মানির বিরুদ্ধেই নিত। আসলে ইসরায়েলের এই দখলতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দেয় সেই একই চক্র মানে ইংরেজ শাসক। সেই দখলতন্ত্র কায়েম করতে কৌশলে ধর্মের প্রলেপ মেশানো হয়। বলা হয়েছে, এই ফিলিস্তিন নাকি এক সময় ইহুদিদের ছিল। ঠিক একই যুক্তিতে বলা হয় এই বাবরি মসজিদ একদা রামমন্দির ছিল। এরপর বলা হবে কাশ্মীরে কোনো মুসলমান থাকতে পারবে না, যুক্তি দেওয়া হবে-এখানে আগে কোনো মুসলমানই ছিল না। কাশ্মীরকে বানানো হবে সেই ফিলিস্তিন, একেবারে ইসরায়েলের অনুসরণ করে। সে কারণেই ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের এত বন্ধুত্ব। ভারতের শাসকগোষ্ঠীর কাছে যদি হিন্দুত্ববাদই আসল নীতি হতো, তাহলে তারাই ইসরায়েল থেকে দশ হাত দূরে থাকত।

কেননা হিন্দু ধর্মের তুলনায় ইহুদি ধর্মের সঙ্গে মুসলিমদের ধর্মের মিল আরও বেশি। তাহলে ইসরায়েল-ভারতের নীতি ও আদর্শে এত মিল কেন? কারণ ধর্ম নয় বরং আধিপত্যবাদী উগ্র চেতনা। এই উগ্র চেতনাকে ঠাণ্ডা মাথায় বপন করেছিল সেই গডফাদার ইংরেজ শাসক।

আজকের যুগে ইংরেজরা চুপসে থাকলেও আরও বড় কায়দায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা। আমেরিকা সারা বিশ্বে ‘ইসলামি জঙ্গিবাদ’ নামে যে বয়ানের বিস্তার করিয়েছে তার উদ্দেশ্য এখন সবার কাছে পরিষ্কার। কেননা আমেরিকার রাজনীতি, ইসরায়েলের রাজনীতি, সৌদির রাজনীতি আর ভারতের রাজনীতি সবই একই সূত্রে গাঁথা। আমেরিকার শাসকগোষ্ঠী দেখায় তাদের রয়েছে খ্রিস্টান ধর্মে বিশাল বিশ্বাস, সৌদি দেখায় তাদের রয়েছে ইসলাম ধর্মের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, ইসরায়েল দেখায় তারাই সবচেয়ে বড় ইহুদি, আর একই রকম করে ভারতের শাসকগোষ্ঠী প্রচার করে বেড়ায় তারাই নাকি দেবতাদের আরাধনায় অগ্রগামী। আসলে চরম সত্য কথা হলো এদের কেউ ধর্মে বিশ্বাস রাখে না, এদের কেউ ধর্মানুরাগী নয় বরং এরাই মনে মগজে মানুষের মধ্যে বিরাজমান ধর্মীয় যে ভাবাবেগ আছে তার হত্যাকারী।

এদের একটাই ধর্ম-‘আধিপত্য’, একটাই দেবতা-‘ক্ষমতা’, একটাই কালেমা-‘শাসক হইবে প্রভু, জনতা হইবে দাস’, এদের সবার উপাসনালয় ‘জাতিসংঘ’, এদের বার্তাবাহক মিডিয়াজগত। এরা মিসরের ফারাও শাসকদের উত্তরাধিকারী। ফারাও শাসকদের বৈধতা দিত কুচক্রী বুদ্ধিদাতা ‘বালাম’। এসব শাসকগোষ্ঠী সর্বস্তরে হাজার হাজার বালাম বানিয়ে রেখেছে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার বরাত দিয়ে।

এদের জুয়াখেলা একটাই ‘সাম্রাজ্য’ বিস্তার করে জনগণের ওপর প্রভুত্ব কায়েম রাখা। সেই কাজ করতে এরা কোথাও হিন্দুর প্রতিপক্ষ বানাল মুসলমানকে, কোথাও মুসলমানের প্রতিপক্ষ বানাল খ্রিস্টানকে, কোথাও শিয়ার বিপক্ষে সুন্নিকে, কোথাও প্রতিপক্ষ বানাল ইহুদিকে। সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে এরা কাজে লাগায় তাদের কায়েমি স্বার্থে। ‘বাবরি মসজিদ’ আমাদের এই রহস্যগুলোকেই আবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

আশেক মাহমুদ : সহকারী অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
ashmahmud@gmail.com