দুই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার গল্প

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

দুই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার গল্প

ড. রকিবুল হাসান ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৫, ২০১৯

print
দুই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার গল্প

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী, প্রাদেশিক পরিষদের সাবেক সদস্য ও সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া। তিনি কুমারখালী-খোকসার মানুষের কাছে কিংবদন্তিতুল্য নেতা ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোলাম কিবরিয়ার বাড়িতে দুবার এসেছিলেন। ৬ দফা আন্দোলনের আগে একবার এবং আন্দোলনের পরে আর একবার।

১৯৭৪ সালে কুমারখালির কিংবদন্তি নেতা গোলাম কিবরিয়া ঈদের নামাজ পড়া অবস্থায় আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন। মৃত্যুর বহু বছর পরও এখনো তিনি আগের মতোই সমান জনপ্রিয়।

গোলাম কিবরিয়া খুব দাপুটে নেতা ছিলেন, সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। এখন তো তার সম্পর্কে আমার সম্যক একটা ধারণা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি, মানুষের মুখে মুখে সে কথা এখনো ফেরে। আমি তাকে দেখিনি। তার নাম কুমারখালী-খোকসার মানুষের কাছে নিঃশ্বাসের মতো বর্তমানেও প্রাণময়। কুমারখালী-খোকসার একটি পরিবারই এখনো পর্যন্ত বংশানুক্রমিকভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আদর্শ ধারণ করে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে, এর বাইরে দ্বিতীয় আর একটি পরিবার পাওয়া কঠিন হবে। শুধু কঠিন নয়, কঠিনের থেকেও কঠিন। এ পরিবারটি শহীদ গোলাম কিবরিয়ার পরিবার।

তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আদর্শের সৈনিক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন সহযোদ্ধা ছিলেন। ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার সন্তান আবুল হোসেন তরুণ ও স্ত্রী সুলতানা তরুণও সংসদ সদস্য ছিলেন। এই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের তরুণ সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ বর্তমান সংসদ সদস্য।

এসব জানা কথা, কুমারখালী-খোকসার মানুষ জানে। কুমারখালী-খোকসার প্রতিটি পাখ-পাখালি, নদী-নালা, খাল-বিল ধূলিকণাও এ কথা জানে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এ পরিবারের গভীর সম্পর্ক যেমন রাজনৈতিক, তেমনি আত্মিক। এ পরিবারটিকে নির্দিষ্ট একটি গণ্ডি বা চার দেয়ালের মধ্যে আটকে ফেলানো সম্ভব নয়। গোটা কুমারখালী-খোকসাই যেন এ পরিবারের পরিবার। এই সময়কালেও সেই বন্ধন তারা ধরে রেখে চলেছে, অনুমান করি।

মসনদের গরম অহংকার দেমাগ তাদের দখল করতে পারেনি। যে কারণে এ পরিবারটি এখনো এলাকার মানুষের আশা-ভরসার জায়গাটি ধরে রাখতে পেরেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় বহু নেতাকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। হত্যা করে তাদের জনপ্রিয়তাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাস্তবে হয়েছে এর উল্টো। গোলাম কিবরিয়াকেও হত্যা করে তার জনপ্রিয়তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল তার খুনিরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেও এ রকমই এক স্বপ্ন দেখেছিল বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তানের খুনিরা। তার বন্ধু ঘনিষ্ঠ সহচর গোলাম কিবরিয়ার ক্ষেত্রেও তাদের উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন।

এসব বিখ্যাত মানুষের জীবনেও কিছু কিছু মানুষ তাদের কর্ম দিয়ে, সততা দিয়ে, নিষ্ঠা দিয়ে, বিশ্বাস দিয়ে, ত্যাগ দিয়ে আপনের অধিক আপন হয়ে ওঠেন, হৃদয়ের মানুষ হয়ে ওঠেন, আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠেন। তারা সন্তান না হয়েও সন্তান, ভাই না হয়েও ভাই- পরিবারের রক্তের না হয়েও রক্তের অধিক হয়ে ওঠেন। কালের যাত্রায় এসব সম্পর্কের সব হয়তো আবিষ্কৃত হয় না, অনেক ক্ষেত্রেই থেকে যায় অনাবিষ্কৃত। শহীদ গোলাম কিবরিয়ার জীবনেও এরকম কিছু বিশেষ মানুষ ছিলেন। যারা তার হৃদয় ও আস্থা- দুটোই দখল করেছিলেন। এদের অনেকেই হয়তো এ পৃথিবীর মায়া মমতা ত্যাগ করে চলে গেছেন। বেঁচে আছেন কেউ কেউ- মৃত্যুর সঙ্গে ধুঁকছেন প্রতিটি নিঃশ্বাস। এদেরই একজন আব্দুল বারী মোল্লা।

‘বারী মোল্লা’ নামে কুমারখালীর মানুষ একসময় একনামে তাকে চিনতেন, জানতেন। এখনকার তরুণ সমাজে এ নামটি সেভাবে পরিচিত নয়। গোলাম কিবরিয়ার সবচেয়ে বেশি স্নেহধন্য বলতে সে সময় যে দু-চারটি নাম উচ্চারিত হতো, বারী মোল্লা ছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম একজন।

বারী মোল্লার বাড়ি সান্দিয়াড়ার রাজাপুর গ্রামে। বর্তমানে তার বয়স সাতানব্বই বছর। তিনি গোলাম কিবরিয়ার অন্ধ অনুসারী ও অনুগত ছিলেন। নিঃস্বার্থ ও নির্মোহ মানুষের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তিনি। ব্যক্তিগত লোভ-লালসা কখনোই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। এলাকার উন্নয়ন- এলাকার মানুষের কল্যাণসাধনই তার কাছে মূল ছিল।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গোলাম কিবরিয়ার নির্দেশ মেনেই তিনি অস্ত্র হাতে রাজাপুর গ্রামে রাজাকার আল বদরদের প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন। গোলাম কিবরিয়া যুদ্ধের সময় সান্দিয়াড়ার রাজাপুর এলাকায় রাজাকারদের প্রতিরোধ করার জন্য তিনজনকে তিনটি কাঁটা রাইফেল দিয়েছিলেন। এর মধ্যে একজন ছিলেন আব্দুল বারী মোল্লা। অন্য দুজন সিরাজুল ইসলাম ও আব্দুল মালেক।

সিরাজুল ইসলাম ‘সিরাজ দোকানদার’ ও আব্দুল মালেক ‘মালেক ডাক্তার’ নামে পরিচিত ছিলেন। এ দুজন এখন আর বেঁচে নেই। কমান্ডার লুৎফর রহমানের নির্দেশ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী এই তিন জন কাঁটা রাইফেল নিয়ে নিজের এলাকায় স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তারা রাতের পর রাত জেগে প্রতিরোধের শক্ত প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

রাজাকাররা বহুভাবে চেষ্টা করেও রাজাপুর এলাকাতে ঢুকতে পারত না। যে কারণে রাজাকাররা বারী মোল্লাসহ অন্য দুজনকে বিভিন্নভাবে হত্যার চেষ্টা করেছিল। তারা সফলকাম হতে পারেনি। রাজাকাররা বুঝতে পারত না কতজনের কাছে অস্ত্র আছে- কতজন রাত জেগে পাহারা দেয়! অস্ত্রহাতে তিনজন গ্রামের বিভিন্ন জায়গাতে এমন কৌশলে অবস্থান গ্রহণ করতেন, এমনভাব দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতেন, এমনভাবে গুলি ছুড়তেন- স্বাধীনতা বিরোধীদের ধারণা জন্মেছিল এরা সংখ্যায় অনেক, এদের কাছে অনেক অস্ত্র আছে। তাদের কৌশলী অবস্থানের কারণে রাজাপুর গ্রাম মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ছিল।

১৯৭৩ সালে গোলাম কিবরিয়া জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কুমারখালী-খোকসা এলাকার তার প্রিয় সহকর্মীদের নিজের বাসায় আমন্ত্রণ জানান। মিলনমেলাতে পরিণত হয় কুমারখালী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত তার বাড়ির প্রাঙ্গণ। তিনি সবার কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমরা কে কী চাও?’ নেতা-কর্মীদের মধ্যে কেউ তার এলাকার গরিব মানুষের জন্য অর্থ সাহায্য চাইলেন, কেউ রিলিফ সহযোগিতা চাইলেন, কেউ ঘর করার জন্য টিন চাইলেন। আব্দুল বারী মোল্লা কিছুই চাইলেন না। গোলাম কিবরিয়া জিজ্ঞেস করলেন, সবাই তো কিছু না কিছু চাচ্ছে। বারী, তুই তো কিছু চাইলি না। বারী মোল্লা বললেন, আপনি আমার রাজাপুর গ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুল করে দেবেন।

এ কথা শুনে গোলাম কিবরিয়া খুব অবাক হন। তিনি কল্পনাও করেননি সদ্য স্বাধীন দেশে বৈষয়িক এবং বস্তুগত কিছু না চেয়ে, এরকম অভাবনীয় কিছু কেউ চাইতে পারেন! তিনি বিস্ময়ে একটু নীরব থেকে বললেন, ‘আচ্ছা, তোর গ্রামে আমি প্রাইমারি স্কুল দেব।’ বলেই তিনি সবার সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফোন করে এ বিষয়টি জানান এবং নিজের কাছে খুব গর্ব অনুভব করেন। ফোন রেখেই বারী মোল্লাকে বললেন, ‘তোর গ্রামে স্কুল হবে। স্কুল করার জন্য একখণ্ড জমি দিতে পারবি তো?’

আব্দুল বারী মোল্লা কোনো কিছু না ভেবে সঙ্গে সঙ্গেই তাতে সম্মতি জানিয়ে দেন। তিনি নিজে জমি দিতে না পারলেও তার বড় মেয়ের শ্বশুর এদিল মোল্লাকে জমি দিতে সম্মত করেন। সেই জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। নেতা আর শিষ্যের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্মৃতিস্বরূপ এ প্রতিষ্ঠানটি এখন এলাকায় আলোর ফোয়ারা হয়ে আছে।

সাংসদ গোলাম কিবরিয়া বারী মোল্লা ও তার পরিবারকে এতটাই স্নেহ করতেন, পারিবারিক সম্পর্কের মতো তাদের সম্পর্কের গভীরতা ছিল। পরবর্তীতেও এই সম্পর্ক দুটি পরিবারই রক্ষা করেছে। গোলাম কিবরিয়ার সন্তানরা বারিক মোল্লাকে বড় ভাইয়ের মতো মান্য করেন এবং তার স্ত্রী নুরুন্নাহারকে ‘বু’ ডাকেন। রাজাপুরে তাদের বাড়িতে কখনো গেলে কদমবুসি করে সম্মান করেন।

আব্দুল বারী মোল্লা বর্তমানে বয়সের ভারে ক্লান্ত- মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। যে কোনো সময় নিভে যেতে পারে তার জীবনপ্রদীপ। তিনি তার নেতা বলতে- রাজনৈতিক আদর্শ ও পারিবারিক অভিভাবক বলতে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা গোলাম কিবরিয়াকেই বুঝতেন। রাজনীতিতে আত্মার আলোমাখা সম্পর্ক আর হৃদয়ের টানটা যেন নিভে না যায়। যে আলোটা স্বর্ণআলোর মতো কুমারখালী-খোকসার মানুষের মধ্যে দীপ্যমান করে রেখে গেছেন গণ-মানুষের দরদি নেতা শহীদ গোলাম কিবরিয়া।

ড. রকিবুল হাসান : বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ