সেবক যেভাবে প্রভু সাজে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সেবক যেভাবে প্রভু সাজে

আবু বকর সিদ্দীক ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৫, ২০১৯

print
সেবক যেভাবে প্রভু সাজে

ধামরাই বাজার কৃষি ব্যাংক শাখার ম্যানেজার সোহরাব জাকিরকে স্যার না বলায় সেবাগ্রহিতা কৃষক জাকির হোসেনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বের করে দিয়েছেন। গতকাল সকালের সোনাঝরা রোদে এ খবরটি এক ছোপ কালি লেপে দিয়েছে। কৃষক জাকির ফসল ফলান, তার ঘাম মাখে উর্বর মাটি। উন্নয়নশীলতার অগ্রযাত্রায় তিনি একটি গবাদী পশুর খামার করতে চেয়েছিলেন, দাদন ব্যবসায়ীদের এড়িয়ে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন ব্যাংকে, ম্যানেজারকে আপন মনে করে ভাই ডেকেছিলেন, অবশেষে গলাধাক্কা খেয়ে সেখান থেকে বের হয়ে এলেন।

গতকাল কয়েকটি অনলাইন মাধ্যমের খবরে দেখলাম, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওই ম্যানেজার বলেছেন, তাকে স্যার বলতে অসুবিধা কোথায়? ভয়ানক ঔদ্ধ্যত্বপূর্ণ এ আচরণের আপাদমস্তক একজন দাম্ভিক কৃষকের ব্যাংকে চাকরগিরি করে কীভাবে তা মাথায় ঢোকে না। সকালে ম্যানেজারের স্কুলগামী সন্তান যে নাস্তাটা করেছে, তিনি যা খেয়েছেন এবং শরীরের যে পোশাকটি চড়িয়ে স্যার হয়েছেন, তা কোথা থেকে এসেছে? কৃষকের প্রতি ফোঁটা ঘামের বিনিময়ে তিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে স্যারগিরি করছেন, মঙ্গলগ্রহ থেকে আসা এই ম্যানেজার নিশ্চয়ই কোনো পরিবারে বেড়ে ওঠেননি। আমাদের সংস্কৃতির প্রাণের ডাক ‘ভাই’। এ ভাষা, এ দেশ সবই পেয়েছি ভাইয়ের অবদানে, সেই ভাই ডাকটি ওনার ভীষণ অপছন্দ হয়েছে প্রভুসুলভ আচরণের কারণে।

রাজনীতির বাইরে সুশাসন ও সুব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সেবকদের রয়েছে বড় ভূমিকা। আচার-আচরণে সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনীতিবিদদের গরমিল হলে মিডিয়ায় গুরুত্ব পায়; কিন্তু পেশাজীবী সেবকরা যাচ্ছে-তাই করলেও তা সামনে আসে না। জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা যেভাবে জানা যায়, জনপ্রশাসনের নৈরাজ্যজনক আচরণ ও অনিয়মের খবরগুলো অন্ধকারেই থাকে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, জনগণের ঘামঝরানো টাকায় ডাক্তার-পুলিশ-ব্যাংকারদের বেতন হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উল্টো এসব পেশাজীবীরা জনগণের সঙ্গে ‘প্রভু’র মতো আচরণ করেন। যারা তাদের বেতন দেয়, তাদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরায়। এর বাইরে ইতিবাচক সেবকরা বরাবরই কোণঠাসা, স্যার সম্বোধন শুনতে অভ্যস্ত প্রভুদের দাপটে তারা এক কোণে পড়ে থাকেন। সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাবে আমাদের সরকারি চাকুরে বা সেবকদের সেবার মান উল্টোপথে, তারা বরাবরই সেবা নিতে অভ্যস্ত, দিতে নয়।

’৪৭-এর আগে এ ভূখণ্ডে ব্রিটিশ শাসনের চিত্র ভেসে আসে। রাণী ভিক্টোরিয়া সেখানকার ক্রিমিনালদের সাগর পাড়ে এ শ্রীখণ্ডে পাঠিয়েছিলেন উৎপাত থেকে বাঁচতে। তারা স্যুট টাই পরে জাহাজভরে এসে সহজ-সরল পুরবাসীকে লাল বন্দুক দেখিয়ে বলল, ‘অহন থিকা আমগোরে সার কয়া ডাকবি’। চালু হয়ে গেল স্যার তৈরির কারখানা। আজ এখানে সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের লর্ড ভাবেন।

সময়ের বদলায় পাল্টে গেছে বৃটেনের সরকারি চাকুরে বা সেবকদের মনোভঙ্গি। আদিম যুগে সেখানকার সিভিল সার্ভিসের লোকেরা জনগণের কাছ থেকে স্যার-ম্যাডাম শোনার প্রত্যাশা করত, এখন নিয়ম করে তারা জনগণকে স্যার-ম্যাডাম ডাকে। তারা সভ্যতায় ফিরেছে, আমরা আদিমতায় মেতেছি।