জেলহত্যা দিবসের স্মৃতিকথা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

জেলহত্যা দিবসের স্মৃতিকথা

তোফায়েল আহমেদ ৯:৪৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০২, ২০১৯

print
জেলহত্যা দিবসের স্মৃতিকথা

যেদিন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়, সেদিন আমি ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি। ভয়ঙ্কর-বিভীষিকাময় দুঃসহ জীবন তখন আমাদের! ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেলে- ফাঁসির আসামিকে যেখানে রাখা হয়, সেখানেই আমাকে রাখা হয়েছিল। সহকারাবন্দি ছিলেন ‘দ্য পিপল’ পত্রিকার এডিটর আবিদুর রহমান। যিনি ইতোমধ্যে এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। আমরা দুজন দুটি কক্ষে ফাঁসির আসামির মতো জীবন কাটিয়েছি। হঠাৎ খবর এলো, কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে।

ময়মনসিংহে কারারুদ্ধকালে জেলখানার জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের নিষ্ঠুর দুঃসংবাদটি শুনে মন ভারাক্রান্ত হয় ও অতীতের অনেক কথাই মানসপটে ভেসে ওঠে। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতীয় চার নেতার কত অবদান। স্মৃতির পাতায় তার কত কিছুই আজ ভেসে ওঠে। দল পুনরুজ্জীবনের পর ’৬৪তে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু পুনরায় সাধারণ সম্পাদক ও তাজউদ্দীন আহমদ সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৬৬-এর ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে যে সর্বদলীয় নেতৃসম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন, সেই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন ভাই যোগদান করেন।

বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির ১৮, ১৯ ও ২০ তারিখ হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু মুজিব সভাপতি, তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রথম সহসভাপতি, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অন্যতম সহসভাপতি এবং এএইচএম কামারুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু যোগ্য লোককে যোগ্য স্থানে বসাতেন।

সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ পরম নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। আমরা ’৬৬-এর ৭ জুন হরতাল পালন করেছিলাম। সফল হরতাল পালন শেষে এক বিশাল জনসভায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম যে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তা আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখব, স্বাধীনতা ঘোষণার পর যখন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়, তখন এই জাতীয় চার নেতাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার পরিচালনা করেন ও বিজয় ছিনিয়ে আনেন। ’৭১-এর ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ গঠন করে, সেই পরিষদে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ অনুমোদন করে তারই ভিত্তিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গঠন করেন। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং উপরাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র ও পুনর্বাসনবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন এবং পরম নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদার মুক্ত করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ দূরদর্শিতার সঙ্গে সুন্দর-সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দেশ স্বাধীনের পর ’৭১-এর ১৮ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে আমি ও রাজ্জাক ভাই বিজয়ীর বেশে প্রিয় মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করি। ২২ ডিসেম্বর জাতীয় চার নেতা ফিরে এলেন। আর ৯ মাস ১৪ দিন কারারুদ্ধ থাকার পর পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে মুক্ত হয়ে বিজয়ের পরিপূর্ণতায় জাতির পিতা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি। ’৭১-এর ২২ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারের নেতাদের তথা জাতীয় চার নেতাকে আমরা বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাই। ’৭২-এর ১১ জানুয়ারি তাজউদ্দীন আহমদের বাসভবনে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা বিষয়ে সব পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাবেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন বঙ্গবন্ধু স্বয়ং; সৈয়দ নজরুল ইসলাম শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী, তাজউদ্দীন আহমদ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী যোগাযোগমন্ত্রী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হওয়ার। মাত্র ২৮ বছর বয়সে আমি মন্ত্রীর পদমর্যাদা পেলাম। সেই থেকে বঙ্গবন্ধুর কাছে থেকেছি শেষ দিন পর্যন্ত।

৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড যখন ঘটে, তখন জেলখানার এক হাবিলদার, নাম সামাদ, শরীয়তপুরে বাড়ি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমাকে ও রাজ্জাক ভাইকে জেলহত্যাকারী খুনি রশীদ, ফারুক, ডালিম জেলখানায় যারা গিয়েছিল, তারা আমাদের খুঁজেছে। রাজ্জাক ভাই আর জিল্লুর রহমানকে পাঠিয়েছিল কুমিল্লা কারাগারে। আমাকে আর আবিদুর রহমানকে ময়মনসিংহ কারাগারে। ময়মনসিংহ কারাগারেও জেলের মধ্যে মেজর আরিফ নামে এক সেনা কর্মকর্তা আমাকে হত্যা করার জন্য প্রবেশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান ও কর্নেল শাফায়াত জামিল তারা ময়মনসিংহ পুলিশকে খবর দেওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করে কারাগার প্রটেক্ট করেছিল।

আমি যখন ময়মনসিংহ জেলখানায়, আমার ছোট্ট মেয়েটি যখন আমাকে দেখতে যেত, তখন সে বারবার জিজ্ঞেস করত, ‘আব্বু তুমি কবে বাড়ি যাবে।’ আমি তার উত্তর দিতে পারতাম না এবং আমার সঙ্গে থাকতে চাইত। কারণ সে তো বুঝত না। এই কারাগারে বসেই খবর পাই যে, আমার বড় ভাবি ১ জানুয়ারি ’৭৬-এ এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন এবং আমার স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে তাকে কোলে তুলে নিয়ে আপন সন্তানের মতো লালন-পালন করে। এখন সে আমারই ছেলে। আমার মেয়ের এক ছেলে আর তার দুই মেয়ে। তাদের সঙ্গে আমি ভালো সময় কাটাই।

জীবন সায়াহ্নে এসে ৭৬ পেরিয়ে ৭৭ বছরে পদার্পণ করেছি। আমার এই ক্ষুদ্র জীবন বিশ্লেষণ করে দেখি যে, জীবন আমার ধন্য। আমি ইতিহাসের মহামানব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর, স্নেহ, ভালোবাসা পেয়েছি। মায়ের দোয়া পেয়েছি। বাংলাদেশের মানুষের স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি। আমার জীবন তৃপ্ত, কানায় কানায় পরিপূর্ণ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে আমি যা চেয়েছি, তাই পেয়েছি। এখন আমার একটিই কামনা, যা আমার মা বলেছিলেন- মৃত্যুর আগে আমি যখন মাকে নিজ হাতে খাওয়াচ্ছিলাম, বলেছিলেন, ‘তুমি কি আমাকে মরতে দিবে না।’

আমি বলেছিলাম, ‘মা, আপনি যদি চলে যান, আমাকে দোয়া করবে কে?’ তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে রেখে গেলাম। তিনিই তোমাকে দেখবেন।’ এটিই ছিল মায়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা। সেই মায়ের দোয়ায় খুব ভালো আছি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে প্রতিমন্ত্রী হয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী, আবার ২০১৩ সালে শিল্প ও গৃহায়ণমন্ত্রী, এর পর ২০১৪ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধ করে আমরা এই দেশ স্বাধীন করেছি। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল- একটি স্বাধীনতা, তিনি পূরণ করেছেন। আজ তার স্বপ্নের বাংলাদেশকে যে তিনি সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, সেই কাজটি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজকে এগিয়ে চলেছে। জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার আরাধ্য স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করে প্রিয় বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। মহান নেতাদের সেই চেতনা ও স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারলেই তাদের আত্মা চিরশান্তি লাভ করবে এবং আমরা সেই লক্ষ্যেই নিয়োজিত।

তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি