আসাদুজ্জামান নূর ও নীলফামারীর অগ্রগতি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

আসাদুজ্জামান নূর ও নীলফামারীর অগ্রগতি

জাহাঙ্গীর আলম সরকার ১০:১৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৯

print
আসাদুজ্জামান নূর ও নীলফামারীর অগ্রগতি

প্রকৃতিতে এখন শীতের আগমনধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বসন্তের অপেক্ষায় বড় হওয়া ফুলচারায় দেখা মিলছে অনাগত মঞ্জুরিবিন্যাস। এমন এক মৃত্তিকা থেকে লিখছি, যেখানে জন্ম নিয়েছেন বেশ কিছু ব্যক্তি; যারা কলোত্তীর্ণ হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়।

নূরলদীনের পদচারণামুখর মৃত্তিকায় দেশভাগের পর অখ- পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার মন্ত্রী খয়রাত হোসেন, দেশের নবম প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল, কণ্ঠশিল্পী হরলাল রায়, রথীন্দ্রনাথ রায় ও সুরের পাখি মহেশচন্দ্র প্রমুখ মহত্তম ব্যক্তির কর্মধন্য নীলফামারী। ১৯৪৬ সালের ৩১ অক্টোবর হিমালয়ের পাদদেশের সেই সিক্ত উর্বর ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন আসাদুজ্জামান নূর। নীলফামারীর আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেন সমকালীন ইতিহাসের কিংবদন্তিসম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন উদ্ভাসিত ব্যক্তিত্ব, স্বচ্ছ রাজনৈতিক খ্যাতি, সততার অনন্য দৃষ্টান্ত ও মহত্ত্বের অধিকারী জননেতা আসাদুজ্জামান নূর এমপি।

অসাম্প্রদায়িক চিন্তার ধারক ও বাহক জননেতা আসাদুজ্জামান নূর একটি আলোকবর্তিকা। সাদামাটা, সহজ-সরল একজন মানুষের সংস্কৃতিকর্মী থেকে সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হওয়ার গগনজোড়া বিচ্ছুরিত নূরের গল্প একদিনের নয় যে, তা মাত্র একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে শেষ করা যাবে। দেশ, সমাজ, মানুষের মঙ্গল কামনাই তার একমাত্র ব্রত। অভিনয়, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতিতে তিনি সাফল্যের চিহ্ন রেখেই চলেছেন; এ তার একক নির্মিত, একক যোগ্যতার ফসল। এ কারণেই তিনি আজ জ্যোতির্বলয়ের সামনে। বর্তমান জাতীয় অগ্রগতির ধারক ও বাহক তার নিজ জেলাকে উন্নীত করেছেন এক অনন্য সাধারণ উচ্চতায়।

৪৭’-এ দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে দেশব্যাপী শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। পাকিস্তান আমলে ছাত্র আন্দোলন থেকে তার এ দীর্ঘ গন্তব্যের পথচলা শুরু। নীলফামারী সরকারি কলেজে পড়ালেখা করা অবস্থায় আসাদুজ্জামান নূর আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালে তার প্রতিবাদী কণ্ঠের কারণে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের নীলফামারী কলেজ শাখায় জিএস নির্বাচিত হন। এরপর নীলফামারী থেকে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। একজন সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে প্রগতিশীল নানা আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন ঢাকার রাজপথেই। এসব কিছুই তার জীবনের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস বৈকি।

আসাদুজ্জামান নূর এমপির মনের গহিনে বসবাস করে নীলফামারীর সাধারণ মানুষ এবং খেটেখাওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। জাতীয় অগ্রগতির মহাপরিকল্পনার কর্মপরিসরে তার চেতনায় নীলফামারীর অবকাঠামোগত এবং আর্থ-সামাজিক ভাবনা মুহূর্তকালের জন্যও কম গুরুত্ব পায়নি; যার প্রতিফলন আমরা পাই নীলফামারী শহর থেকে নীলফামারীর প্রান্তিক অঞ্চলজুড়ে সর্বত্রই। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০১ সালে নীলফামারীতে প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তরা ইপিজেড, যেখানে প্রায় ৩২,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান। ইপিজেড নীলফামারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চল থেকে মঙ্গা দূর হয়েছে।

বর্তমানে উত্তরা ইপিজেডে প্রায় ৪০০ জন বিদেশিসহ ৩২,০০০ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানে ১৭টি দেশি-বিদেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন করছে এবং আরও ৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান শীঘ্রই উৎপাদন আরম্ভ করতে যাচ্ছে। আগামী ৫ বছরের এখানে প্রায় ৬০,০০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

আসাদুজ্জামান নূর এভাবেই নীলফামারী জেলায় বহুমুখী উন্নয়নের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছেন। একটি বার্তা নীলফামারীবাসীর আশান্বিত করে যে, সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের একই সুতোয় সংযুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। দীর্ঘ সড়করেখা তৈরিতে স্থলভাগ থেকে প্রান্তিক অঞ্চলে গমনাগমন সম্ভব হয়েছে। আন্তঃজেলাগুলোতে যাতায়াতের যোগাযোগ হয়েছে নিরন্তর, সহজতর ও দ্বিমুখী। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অধিকতর সমন্বয় ও মিথস্ক্রিয়ার দিগন্ত। সংগত কারণেই এ জনপদে সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, পণ্য প্রবাহের সঙ্গে অর্থনৈতিক গতিশীলতা সূচিত হয়েছে, যোগসূত্র রচিত হয়েছে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে শহুরে মানুষের। পূর্বে যে গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগত সারাদিন, বর্তমানে সেই দুর্ভোগের অবসান ঘটেছে। ফলে সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে পর্যটনের, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে।

আসাদুজ্জামান নূরের প্রচেষ্টায় নীলফামারীর গ্রামীণ জনপদ বদলে যাচ্ছে। উন্নয়ন আর অগ্রগতির সঙ্গে সমন্বয় করতে থাকা নীলফামারীর বিভিন্ন গ্রাম ঘুরলে এখন অবাক হতে হয়। বিগত দুই দশকে অনেকটা নীরবেই বদলে গেছে এ সব জনপদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি। একটা দুর্বিষহ স্থিতাবস্থার পর যে উন্নয়ন নীলফামারীকে সচল করেছে, সাধারণ মানুষ সে দিকেই ছুটছে। সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় নীলফামারী বদলে গেছে নানা মাত্রায়। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে নীলফামারীতে উন্নয়ন ঘটেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্য-প্রযুক্তিতে উন্নয়ন, যুব উন্নয়ন, খাদ্য উৎপাদনে উন্নয়ন, শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়ন, কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন ইত্যাদি। ২০০১-২০০৮ সালের মধ্যে নীলফামারীর যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থাৎ নতুন রাস্তা নির্মাণ হয়েছিল ১৮০ কিলোমিটার। অন্যদিকে ২০০৯-২০১৩ সময়কালের মধ্যে ৪৬৬ কিলোমিটার নতুন রাস্তা হয়েছে নীলফামারীতে। একই সঙ্গে জননেতা আসাদুজ্জামান নূরের দক্ষতার কারণে ২০১৪-২০১৮ সময়কালের মধ্যে এ অঞ্চলের মোট ৯০০ কিলোমিটার রাস্তা পাকা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে নীলফামারীতে শিক্ষাক্ষেত্রেও উন্নয়ন ঘটেছে। নীলফামারীতে প্রচুর রেজিস্টার বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে। এ সব বিদ্যালয়ে প্রচুরসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে তার অবদান নতুন করে বলার কিছু নেই। ১৯৭২ সালে তার অভিনয় জীবন শুরু হয় মঞ্চদল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে। এই নাট্যদলের ১৫টি নাটকে তিনি ৬০০ বারের বেশি অভিনয় করেছেন। এই দলের দুটি নাটকের নির্দেশনা প্রদান করেছেন, যার মধ্যে দেওয়ান গাজীর কিসসা বহুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। নূর ১১০টিরও বেশি টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। টেলিভিশনে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে এইসব দিনরাত্রি (১৯৮৫), অয়োময় (১৯৮৮), কোথাও কেউ নেই (১৯৯০), আজ রবিবার (১৯৯৯) ও সমুদ্র বিলাস প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৯৯)।

রেডিওতে প্রচারিত তার নাটকের সংখ্যা ৫০-এরও অধিক। টেলিভিশনের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো শঙ্খনীল কারাগার (১৯৯২) ও আগুনের পরশমণি (১৯৯৪)। সংস্কৃতিতে অবদান রাখার জন্য ২০১৮ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। সংস্কৃতি অঙ্গনের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র রাজনীতির মাঠেও একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।

বিগত দুই দশক ধরে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে নীলফামারীর উন্নয়ন আর অগ্রগতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশ ও জনকল্যাণে তার অবস্থান হিমালয়সম। গগনচুম্বী খ্যাতি আর সম্মানের স্বর্ণচূড়ায় আরোহণ করেও নীলফামারীর প্রান্তিক জনপদের মানুষের প্রতি তিনি সরলভাবেই দুর্বল। সম্মান ও ক্ষমতার কোনো প্রভাব পরাভূত করতে পারেনি তাকে।

অসহায়, দুস্থ মানুষের কোমল চাহনির প্রতি তার শ্রদ্ধা চিরকালের। তার দৃষ্টির মধ্যে দ্যুতি ছড়ায় নীলফামারীর সবুজ প্রান্তর। এ অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষের সঙ্গে তার হৃদয় মিলিত হয় আকাশ আর জলের অজানা এক মিলনরেখায়।

জাহাঙ্গীর আলম সরকার
আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক
advsagar29@gmail.com