আবরার হত্যায় দায়ী অপরাজনীতি

ঢাকা, শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

আবরার হত্যায় দায়ী অপরাজনীতি

আবদুল জব্বার ৯:৩০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০১৯

print
আবরার হত্যায় দায়ী অপরাজনীতি

পর পর তিন মেয়াদে দেশ পরিচালনা করছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড দেশে অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগের এক শ্রেণির নেতা-কর্মীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সরকারের অর্জনসমূহ ম্লান করে দিচ্ছে। নানা রকম দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতা শোভন ও রাব্বানীকে অপসারণ করার পরও বন্ধ করা যায়নি দলটির নেতা-কর্মীদের অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে গত ৬ অক্টোবর নির্মমভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। হত্যার শিকার হওয়ার আগে শেষ চার ঘণ্টার নির্মম নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে আদালতে আসামিদের দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে। ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা কে কীভাবে অসহায় আবরার ফাহাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে তা এখন পরিষ্কার।

১৩ অক্টোবর আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় রিমান্ডে থাকা মুজাহিদুর রহমান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এর আগে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বুয়েটের ছাত্র ইফতি মোশাররফ সকাল, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন এবং অনিক সরকার। চারজন আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী ১৪ অক্টোবর বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন শেরেবাংলা হল শাখার ছাত্রলীগের মেসেঞ্জার গ্রুপে একটি নির্দেশনা দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে মেসেঞ্জার গ্রুপে উত্তর দেয় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহা। গ্রুপে সে লেখে ওকে (আবরার) বাড়ি থেকে ফিরতে দেন।

এরপর ৬ অক্টোবর বিকালে গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া থেকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ফিরে আসেন আবরার। এ দিন রাত ৮টার পর আবরারকে হলের কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে যায় তানিম, সাদত, সাইফুল ও অভি। এরপর সবাই মিলে আবরারকে শিবিরের কর্মী উল্লেখ করে চড়-থাপ্পড় এবং ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। এদিন রাত সাড়ে ১২টার পর্যন্ত পর্যায় ক্রমে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে পিটিয়ে তারা হত্যা করে আবরার ফাহাদকে। ঘটনার পর কোনো অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে।

কেউ এ ঘটনার পর পালিয়েও যায়নি। এ রাতের বর্বরতম হত্যাকা-ের ঘটনা আমাদের বেদনাহত ও শোকাহত করে। কোনো সভ্যসমাজে কোনো বিবেকমান মানুষ এরকম ঘটনা ঘটাতে পারে না। আবরারের শোকাহত পরিবারের সঙ্গে গোটা জাতি এখন শোকাহত।

পুলিশ ইতোমধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা আদালতে ১৬৪ ধারা মতে লোমহর্ষক হত্যাকা-ের বর্ণনা দিয়েছে। ঘটনার পর বুয়েটসহ সারা দেশের শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ক্ষমা চেয়েছেন বুয়েটের ভিসি। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত ১৯জন শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণসহ মামলার খরচ প্রদানে সম্মত হয়েছেন। সেই সঙ্গে বুয়েটের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকারীদের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার দাবি জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবরারের পিতা-মাতাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, স্বজন হারানোর বেদনা আমি বুঝি। তিনি আবরার হত্যা মামলা দ্রুত শেষ করার জন্য আইনমন্ত্রীকে নির্দেশ প্রদান করেছেন। যেখানেই অনিয়ম সেখানেই অভিযান পরিচালনা করার জন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি নির্দেশ প্রদান করেছেন তিনি।

আজ দুঃখ ও পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয় এ দেশে ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরাই একদিন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ওই সময়ে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি ছিল সমগ্র দেশবাসীর। ছাত্ররা নিজেদের সমস্যাসহ গণমানুষের সব রকমের সমস্যা নিয়ে রাজপথে নেমে আন্দোলন-সংগ্রাম করতেন।

তৎকালীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতেন। এখানে উল্লেখ্য, ভিয়েতনামের মুক্তিকামী জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে গিয়ে ১৯৭৩ সালে ১ জানুয়ারি মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালীন পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মতিউল/কাদের নিহত হয়েছিলেন। সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারবিরোধী আন্দোলনে ডা. মিলন শহীদ হয়েছিলেন। এরকম অনেক গৌরবোজ্জ্বল আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল তৎকালীন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা।

১৯৬৭ সালে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় আমি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হই। এরপর ৬৮/৬৯ সালের গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযদ্ধকালীন সময়ে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠিত হলে আমি ওই গেরিলা বাহিনীতে যোগদান করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করি।

এরপর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে বিজয়ীর বেশে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালের মার্চ/এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ত্রয়োদশ জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি একজন ডেলিগেট হিসেবে ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলাম।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘নীতির যেখানে মিল সেখানেই মনের মিল হয়’। বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীদের একসঙ্গে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। এদিন খুব কাছে থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখা ও তার বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।

দেশবাসীর প্রত্যাশা সব রকম দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর পদক্ষেপ এবং বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন দেশে ছাত্র অপরাজনীতির অবসান ঘটবে। দেশের ছাত্রসমাজ অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পুনরায় ফিরে পাবে।

আবদুল জব্বার
সদস্য, পাবনা প্রেস ক্লাব
zabbar.pabna@gmail.com