নারীর ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত সমতায়ন

ঢাকা, শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

নারীর ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত সমতায়ন

মৌ ইসলাম মুক্তা ৯:৩৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

print
নারীর ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত সমতায়ন

‘পিতা রক্ষিত কৌমারে, ভর্তা রক্ষিত যৌবনে। রক্ষন্তি স্থবিরে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্য মহর্তি’ (মনুসংহিতা)। অর্থাৎ কুমারীকালে পিতা, যৌবনে স্বামী এবং বার্ধক্যে পুত্ররা রক্ষা করিবে নারীকে। নারী স্বাধীনতার অযোগ্য। সভ্যতার উষালগ্ন থেকে পুরুষ নারীকে সাজিয়েছে অসংখ্য কুৎসিত অভিধায়, নারীকে পদদলিত করে পুরুষ জায়গা করে নিয়েছে সভ্যতার স্বর্ণশিখরে। এ সভ্যতার সব কেন্দ্রেই রয়েছে পুরুষ এবং পুরুষ একে সৃষ্টি করেছে নিজ স্বপ্ন ও স্বার্থানুসারে। পুরুষতান্ত্রিক এ সভ্যতায় পুরুষ মুখ্য, নারী গৌণ, পুরুষ শরীর, নারী ছায়া, পুরুষ মালিক, নারী দাসী। হাজার বছর ধরে নারী যতটা আলোচিত প্রাণী, তা অন্য প্রাণীর তুলনায় নগণ্য।

নারী কী? বাংলা অভিধানে নারী হচ্ছে ললনা, রমণী, স্ত্রী, কামিনী, নিতম্বিনী, অন্তঃপুরবাসিনী, অন্তঃপুরিকা, বামা, মানবী, শর্বরী প্রভৃতি। নারী সুন্দরী ও মনোরম তাই সে ললনা, রমণী, স্ত্রী। নারী কামনা জাগায় তাই সে কামিনী, নিতম্বিনী। নারী অন্তঃপুরে থাকে তাই সে অন্তঃপুরবাসিনী, অন্তঃপুরিকা। সমাজে এই নারীর সংজ্ঞা, এই তার পরিচয়।

পুরুষতন্ত্রের এই সমাজে জন্ম থেকেই নারীকে করা হয় অধীন, তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় সে হবে নম্র, কোমল, তাকে শিখতে হবে ঘরের সব কাজকর্ম, হয়ে উঠতে হবে সর্বগুণাধার, হতে হবে নিখুঁত, নিখাদ, আবদ্ধ থাকতে হবে ঘরে। এভাবেই জন্মের পর থেকে নারীকে সংসারের কাজকর্ম ও সন্তান লালন পালনে লিপ্ত করে তাদের মেরুদণ্ডহীন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হয় এবং বাধ্য করা হয় পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হতে। এজন্যই সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছেন- ‘কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং হয়ে উঠে নারী।’

পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীর অবস্থান সর্বনিম্নেই বলা যায়। সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি ও শিক্ষার পরিবর্তন হলেও সমাজে নারীর মানসম্মান, মর্যাদা ও অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সমাজের পুরুষের চোখে নারী আজও সেই ভোগের বস্তু, অনন্ত কামক্ষুধা, কামনার উদ্রেককারী, পুরুষ যাকে দেখলেই ‘তেঁতুল’, ‘মাল’, ‘আইটেম’, ‘বোমা’, ‘পটাকা’ অভিধায় ভূষিত করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। আজও এ সমাজ নারীর প্রতি সংঘটিত যেকোনো নির্যাতনের জন্য নারীকেই দায়ী করে। এ দেশে নারীর ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান হলেও সমতায়ন দৃশমান নয়। আজও পারিবারিক নির্যাতন, গণপরিবহনে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, কর্মক্ষেত্রে স্বীকৃতিবিহীন শ্রম, সম্পত্তি থেকে নারীকে উচ্ছেদ ‘নারীর সমতায়ন’ শব্দটিকে বারংবার কলুষিত করছে।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন নারীর মধ্যে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন ৮৬ জন, গণপরিবহনে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন ৯২ জন নারী। কর্মজীবী নারীদের মধ্যে ১৬.২% নারী যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গড় নারী নির্যাতনের অভিযোগ সংখ্যা ১৮৩০২.৪৩, যা নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়টিকে ভাবিয়ে তোলে।

এত মামলা করেও শেষ পর্যন্ত লড়ে যাচ্ছেন খুব কমসংখ্যক নারী, যার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে মামলার বিলম্ব নিষ্পত্তি, অপরাধীদের বেকসুর খালাস ও জামিন, ভুক্তভোগীদের প্রাণনাশের হুমকি ও নিরাপত্তার অভাব। শতকরা হিসেবে রায় ঘোষণার হার ৩.৬৬ এবং সাজা পাওয়ার হার ০.৪৫ শতাংশ, যা আশাব্যঞ্জক।

এ দেশে নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী বিরোধীদলীয় নেত্রী, নারী স্পিকার, নারী শিক্ষামন্ত্রী ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ শব্দটিকে প্রতিষ্ঠা করলেও প্রকৃতপক্ষে ‘নারীর সমতায়ন’কে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বাংলাদেশের নারীনেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘দেশের প্রচলিত আইন এবং দৃষ্টিভঙ্গি নারীর সমতার পথে প্রধান বাধা। প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী হলেই নারীর সমতা বা ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না। আগে নিশ্চিত করতে হবে তারা কাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন।’

তার মতে, আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় যেসব নারী ‘নারীর ক্ষমতায়ন’কে প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা মূলত পুরুষতন্ত্রের আদর্শেই দীক্ষিত নারী। তাই কোনো নারীর একক ক্ষমতায়ন নারীর ক্ষমতায়ন বা সমতায়ন নিশ্চিত করে না।

শুধু রাজনীতি বা বিচারক্ষেত্রে নয়, নারী পেশা, মজুরি এমনকি নিজ ঘরেও অসাম্যের শিকার। কর্মক্ষেত্রে নারীর মজুরি অনেক খাতেই পুরুষের তুলনায় কম। ‘বিশ্ব কর্মসংস্থান ও সামাজিক পরিস্থিতি : নারীর অবস্থান ২০১৮’, ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১’ অনুযায়ী যেখানে ৭৫ শতাংশ পুরুষ কাজের সুযোগ পান, সেখানে নারী পান ৪৯ শতাংশ। ৪২ শতাংশ নারী ঘরের কাজ করেন যেখানে পুরুষ শতকরা কাজ করেন ২০ শতাংশ।

পুরুষের গড় বেকারত্ব ৫.২ শতাংশ, যেখানে নারীর গড় বেকারত্ব তুলনামূলক বেশি, যার পরিমাণ ৬ শতাংশ। শতকরা ৬৩ জন নারী বাল্যবিয়ের শিকার, পুরুষের ক্ষেত্রে তা মাত্র শতকরা ১ জন। ৯২ শতাংশ পুরুষ জমির মালিকানা পান, নারীদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, মাত্র ২.২ শতাংশ। ৮২ শতাংশ পুরুষের বিপরীতে মাত্র ১৪ শতাংশ নারী বাড়ির মালিকানা পান।

উপরের সমীক্ষাই নারীর প্রতি অসাম্য ও অন্যায়ের ভয়াবহ উদাহরণ, যা নারীর অগ্রযাত্রাকে মন্থর ও নারীর সমতায়ন ব্যাহতকে নির্দেশ করছে।
‘নারীর সমতায়ন’ কখনোই আমূল নারীবাদকে সমর্থন করে না, যার একটি ধারা ‘নারী সমকামী স্বাতন্ত্র্যবাদ’, যার মূলতন্ত্র হচ্ছে পুরুষাধিপত্য বিলুপ্ত করা এবং এর উপায় হচ্ছে পুরুষের সঙ্গে কোনো সম্পর্কে না আসা। ‘নারীর সমতায়ন’ নিশ্চিত করতে চায় যে, কোনো গর্ভবতী মাকে ‘এবার মেয়ে হলে একদম খুন করে ফেলব’ হুমকি না শুনতে হয়, কোনো নবজাতক কন্যাশিশুর জায়গা যেন পরিত্যক্ত ডাস্টবিন না হয়।

ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের ‘ঘরের বাইরে পা রাখলে এই ঘরে আর তোর জায়গা হবে না’ এমন কথা না শুনতে হয়, কন্যা শিশুকে স্কুলে পাঠাতে কোনো বাবা-মা যেন কুণ্ঠাবোধ না করেন, কোনো মেয়েকে যেন পরিবার থেকে ‘অনেক পড়ালেখা শিখেছ, এবার ঘরের কাজ শিখো, মেয়েমানুষ এত পড়ালেখা দিয়ে কী করবে’ এ ধরনের কথা শুনতে না হয়। ‘নারীর সমতায়ন’ আরও নিশ্চিত করতে চায় যে, কোনো নারীকে যেন রাস্তা-ঘাটে উত্ত্যক্তের শিকার না হতে হয়, বাসে-ট্রেনে নারীদের যেন কনুইয়ের গুঁতো খেতে না হয়, নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র থেকে নারীরা যেন নিরাপদে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। সময় এসেছে বদলে যাওয়ার ও বদলে দেওয়ার, প্রয়োজন মননে আধুনিকতার ছোঁয়া, সমতায়নের উপলব্ধি।

মনে রাখতে হবে নারী শুধু নারী নয়, সে মানুষ, নারী তার লৈঙ্গিক পরিচয় মাত্র। পুরুষতন্ত্র নামক খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে যতই ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা করা হোক, সমতায়ন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। মনে রাখতে হবে, নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য মাত্র একটি ক্রোমোজোমের। এই একটি ক্রোমোজোমের পার্থক্যের জন্য একজন প্রভু ও আরেকজন দাসী। নারী বেঁচে থাকুক নিজ কাঠামোতে, নিজ আঙ্গিকে, নিজ সত্তায়। মানুষের প্রকৃতি ও যোগ্যতার পরিমাপ হবে লিঙ্গনিরপেক্ষ- এটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

মৌ ইসলাম মুক্তা : কলামিস্ট
immow87@gmail.com