উন্নয়নের রোল মডেল

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

উন্নয়নের রোল মডেল

ডা. মো. ফজলুল হক ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০১৯

print
উন্নয়নের রোল মডেল

সরকার যখন বড় বড় উন্নয়নের কাজে হাত দিতে যায় তখনই বিভিন্ন মহল থেকে বাধা চতুর্দিক ঘিরে ধরে। এক শ্রেণির মানুষ মনে করে এগুলো করে কী লাভ? শুধু টাকা খরচ। যেমন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের সময় অনেকেই বিরূপ মন্তব্য করেছিল, শুধু টাকা খরচ ছাড়া আর কিছু নয়। পদ্মা সেতু তৈরির প্রাক্কালেও দেশ-বিদেশের অনেক বাধা আসে। তবে সরকার সাহস করে কাজে হাত দিলেই হয়ে যায়। যার প্রমাণ এরই মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

সবার মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুখ দিয়ে যা বলেন, তাই বাস্তবায়িত হয়। অর্থাৎ যেই কথা সেই কাজ। বাংলাদেশ আয়তনে অনেক ছোট একটি দেশ কিন্তু এদেশের মাটি উর্বর, নদী-সমুদ্রের পানি উর্বর, মানুষের মন উর্বর ও কর্মক্ষম। সর্বোপরি আমরা বাঙালি জাতি পেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর মতো উদার মনের দেশপ্রেমিক নেতা যিনি বিশ্বের অদ্বিতীয় বললেও ভুল হবে না। অনেক পরিকল্পনা এঁকেছিলেন মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। তারই সুযোগ্য কন্যা, মাটি ও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি একের পর এক অকল্পনীয় কাজগুলো করে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়ক থেকে মহাশূন্যের দিকে দৃষ্টিপাত করে সাফল্য অর্জন করেছেন। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বাঙালিরা গর্ববোধ করে, নিজেকে সম্মানিত ভাবেন। বর্তমান সরকার আমাদের পরিচয় করে দিয়েছেন মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে।

সততা, আন্তরিকতা এবং দেশপ্রেম থাকলে সবই সম্ভব, যার উদাহরণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সফলভাবে মহাশূন্যে অবস্থান নেওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি সব টিভি চ্যানেলগুলো যথাযথ শক্তির সঞ্চার করছে। এরই পূর্বে বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে টিভি, রেডিওগুলো চলতো, ফলে দেশ হতে কয়েক কোটি টাকা খরচ হতো। আমাদের স্যাটেলাইট হতে প্রতি বছর অতিরিক্ত খরচ ছাড়াও আয় হবে প্রায় ৪০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

বর্তমানে অর্থনীতিতে ৭৪টি উদীয়মান দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৩৪তম অবস্থানে যা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার চেয়েও বেশি। এখানেই শেষ নয়, দেশে নতুনভাবে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। বর্তমানে ৩০টির অধিক টিভি চ্যানেল রয়েছে, যার স্যাটেলাইট ভাড়া ১১৩ কেটি ৪০ লাখ টাকা যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল হতে চলে যেত। এখন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থাকায় দেশের টাকা দেশেই থাকবে। দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে ১৮টি দেশ এগিয়ে আছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ২০০৬ সালে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ হতে ২০১৩ তে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০১৯ এ ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রতিবেদনে অর্জিত প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে রয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য মডেল দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের রোডম্যাপে বাংলাদেশের অবস্থানকে অত্যন্ত স্বর্ণোজ্জ্বল বলে অভিহিত করেন। অমর্ত্য সেন আরও বলেন, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তার মন্তব্যটি শতভাগ প্রতিফলিত হয়েছে ২০১৮ সালের মার্চে। এ সফলতার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘গ্লোবাল উইমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক জনসভায় মন্তব্য করেন উন্নয়নের দিক থেকে বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম পর্যায়ে। এ অবস্থানে দেশকে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বই প্রধান বিষয়। তাছাড়াও উল্লেখ করেন বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশকে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বহিঃবিশ্বে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, মাথাপিছু আয়, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদিসহ সব সেক্টরের উন্নয়নকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মাথাপিছু আয় ২০১৮ মার্চে ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলার যা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থান পাওয়ার তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

২০০৬ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৩ সালে ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৩ হাজার ৩৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৬ সালে রফতানি আয় ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৩ হাজার ৮৯৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪০ হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আরও বড় বিষয় হলো, গত সাড়ে চার বছরে মালয়েশিয়ায় আড়াই লাখ শ্রমিক প্রেরণ এবং ৬ লাখ বাংলাদেশিকে সৌদি আরবে চাকরি করার বৈধতা প্রদানের ব্যবস্থা।

২০০১-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ২ হাজার ৬০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ২০০৯-১২ সময়ে ৮ হাজার ৫৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫৪ হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালে বর্তমান সরকার মোট ৬ লাখ ৭৪ হাজার জনকে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে কম খরচে। স্বাস্থ্যসেবার নিমিত্তে ৩৬টি নার্সিং কলেজ স্থাপিত ও শিক্ষার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০ হাজার ৫০০ টি মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়ার ক্লাসরুম স্থাপনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা এবং ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি প্রদান করে। শিক্ষার উন্নয়নে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১ হাজার ৫০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, বর্তমানে শিক্ষার হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ঐতিহাসিক সমুদ্র বিজয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র সীমানা ও ১২ গ্যাস কূপ বাংলাদেশের স্থায়ী দখলে চলে আসে।

১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ৬২ বছর পর বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পায় ছিটমহলবাসী। ছিটমহলবাসীর স্লোগান ছিল ‘মুজিব দিয়েছে চুক্তি, হাসিনা দিয়েছে মুক্তি।’ আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক সেন্টার চালু করা হয়েছে। ২০০৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো ৩ হাজার ৬৩২ মেগাওয়াট, ২০১৩ সালে ৮ হাজার ৫৩৭ মেগাওয়াট, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০১৯ সালে এসে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ফলে বর্তমানে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বিদ্যুৎ লোডশেডিং তুলনামূলক অনেক কম। অন্যদিকে বছরের প্রথম মাসে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ৩৫টি মাদ্রাসাকে আইসিটি ল্যাবসহ মডেল মাদ্রাসায় উন্নীতকরণ ও ১০০টি মাদ্রাসায় ভোকেশনাল কোর্স চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি উচ্চশিক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। ২৫ হাজার ২৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং ১৩ হাজার ১০০ জন শিক্ষকের চাকরি সরকারীকরণ করা হয়েছে।

দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় ৭৫ লাখ নারীকে মাসে ৩০ কেজি হারে খাদ্যশষ্য প্রদান ও ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ, টিআর, কাবিখা, এবং খাদ্য নিরাপত্তা খাতে ৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা ব্যয় করছে বর্তমান সরকার। মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাস হতে ছয় মাস করা হয়েছে। সাক্ষরতার হার ২০০৬ সালে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৬৫ দশমিক ০৪ শতাংশ। দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০১৩ সালে ২৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। কর্মসংস্থান ২০০৬ সালে ২৪ লাখ, ২০১৩ সালে ৭৫ লক্ষ। পোশাক রফতানিতে বিশ্বের অবস্থান চতুর্থ এবং ২০১৩ সালে দ্বিতীয় স্থানে। ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ২০০৬ সালে ৫৭ লাখ, ২০১৩ সালে ৪ কোটি এবং ২০১৮ সালে ৮ কোটি ৮৩ লাখ জন।

সবমিলিয়ে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ডা. মো. ফজলুল হক
চেয়ারম্যান ও রেজিস্ট্রার, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর