উচ্চশিক্ষায় নেই উন্নত শিক্ষা

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

উচ্চশিক্ষায় নেই উন্নত শিক্ষা

তুহিন ওয়াদুদ ৯:৫৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

print
উচ্চশিক্ষায় নেই উন্নত শিক্ষা

আমাদের দেশে উন্নত শিক্ষার ধারণা নেই বললেই চলে। আছে উচ্চশিক্ষার ধারণা। উচ্চশিক্ষাকে উন্নত শিক্ষা বলে আমরা ভুল করি। মূলত আমাদের দেশে উন্নতশিক্ষার ধারণা সমাজের তলানিতে পড়ে আছে। রাজীব-অভিজিৎ-দীপন-বিজয়-নুসরাত-আবরারসহ অনেক মৃত্যু আমাদের মানবিক আবেগকে জাগিয়ে তোলে কিন্তু মানবিক মূল্যবোধের অভাবে আমাদের বৃদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ঘটে না। আমরা শুধু মৃত্যুকে দেখি, মৃত্যুর কার্যকারণ সন্ধান করি না। আমরা খুনের বিচার চাই, কিন্তু খুনি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়াই না। খুনি গড়ে তোলার নেপথ্যে খুনির বিচার চাওয়া মানুষগুলোরও কি ভূমিকা নেই?

আমরা উচ্চশিক্ষা বলতে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাকে বুঝি। প্রকৌশলী হওয়া কিংবা চিকিৎসক হওয়ার মধ্যে উন্নতশিক্ষার অনুপস্থিতিতি হেতু আমরা চরম দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী এবং নির্মম চিকিৎকদের অহরহই পাই। শুধু তাই নয়, উচ্চশিক্ষিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যেও উন্নতশিক্ষা না থাকার কারণে তারাও অপরাধমূলক সমাজের পথেই হাঁটছেন। এদের যদি মনুষ্য জ্ঞানের বিকাশ ও চর্চা থাকত তাহলে তারা সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতেন।

সবচেয়ে মেধাবী বলে পরিচিত চিকিৎসক-প্রকৌশলীগণ সততার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে না পারার মূলেও উন্নতশিক্ষারই অভাব। দলবেঁধে এক দল মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে যেভাবে খুন করেছে সেটি তার দৃষ্টান্ত মাত্র। হাতে গুণে যে দু’চারজন মানবিক মূল্যবোধের চিকিৎসক-প্রকৌশলী পাওয়া যায় তারা চরম প্রতিকূলতায় নিজেদের ব্যক্তিগতভাবেই প্রস্তুত করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো বিষয়ে ভর্তি হলে ভালো উচ্চশিক্ষা আর তুলনামূলক কম ভালো বিষয় ভর্তি হলে কম উচ্চশিক্ষারও একটি ধারণা সমাজে বিদ্যমান। এ বিষয়গত ভালো-মন্দের দিকটিও আবার উন্নতশিক্ষার ধারণা না থাকার কারণে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। ভালো বিষয় বলতে বুঝি সেই সব বিষয়কে যেসব বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করলে দ্রুতই চাকরি পাওয়া যাবে। আর তুলনামূলক খারাপ বিষয় সেই সব, যেগুলোর বিষয়ভিত্তিক চাকরির ক্ষেত্র কম।

উন্নতশিক্ষার ধারণা আমাদের সমাজের কোনো স্তরেই পাওয়া যায় না। পরিবারে বাবা-মা উন্নতশিক্ষার ধারণা সন্তানদের দেন না। অধিকাংশ বাবা-মা উন্নতশিক্ষা সম্পর্কে জানেনই না। জানার মতো সুযোগ তারাও পাননি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের যে নীতিবোধ, সৌহার্দ্যবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা শেখাবেন সেই সংস্কৃতি আজো গড়ে ওঠেনি। মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষা পদ্ধতিতে কোথাও মনন গঠনের পাঠক্রম কিংবা কোনো অনুশীলন পদ্ধতি রাখা হয়নি। এখন তো আবার জেএসসি নামক এক পরীক্ষার ভূতে ওসব ভাবারও সময় নেই। নবম-দশম শ্রেণি যেন মানবিক গুণাবলী শেখার সময় নয়। মানবিক গুণাবলী চর্চা করার মধ্য দিয়ে যে সময় ব্যয় করতে হবে সেটাকে নষ্ট সময় বলতেই প্রস্তুত শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক। ফলে মাধ্যমিকের গণ্ডিতে উচ্চশিক্ষার চেষ্টা সুদূর পরাহত।

উচ্চমাধ্যমিক পড়ালেখার সময় খুবই কম। মাত্র দুবছর। এ দুবছরে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য ভালো ফলাফলের চেষ্টায় পাঠক্রমের বাইরে আর যে কোনো শিক্ষাই সামাজিকের কাছে বাতুলতা মাত্র (!)। এক্ষেত্রেও শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক-শুভাকাক্সক্ষী সবাই অভিন্ন মতই দিয়ে থাকেন। সবাই শুধু এ-প্লাসের দাস।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের নিমিত্তে। ফলে এখানেও আর উন্নত শিক্ষার ধারণা তাদের দেওয়ার কোনো পথ খোলা রইল না। রাষ্ট্র দাবি করবে মানবিক সমাজ, আর সমাজ একজন মানুষকে বড় করে তুলবে মানবিকতার শিক্ষা না দিয়ে এতে কোনো দিনই মানবিক সমাজ পাওয়া যাবে না।

বর্তমানে আমরা সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই বলে জিকির করি। আমাদের এই স্বাধীনতা চাওয়া শুধু রাজনৈতিক কারণে। বাস্তবে এই বঙ্গভূমিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি কোনো কালে ছিল? ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ এর মুখপত্র ছিল ‘শিখা’ পত্রিকা। এই শিখাগোষ্ঠীর কালজয়ী লেখক কাজী আবদুল ওদুদ কিংবা আবুল হুসেনের বস্তুনিষ্ঠ অপ্রিয় সত্য লেখার দায়ে প্রকাশ্যে বিচার করা হয়েছে। আবুল হুসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক ছিলেন। তিনি লজ্জায় অপমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন।

মুখে শুধু বড় বড় বুলি আওড়ালে চলবে না। আয়নায় নিজের মুখটিও দেখা চাই। ঘটনাবিশেষে বাকস্বাধীনতা দাবি করলে এটাতে কোনো ফলই আসবে না। আমাদের সমাজে প্রগতিবাদী মানুষের সাইনবোর্ড নিয়ে অনেকেই আছেন। লেবাসধারী অসংখ্য প্রগতিশীল কিন্তু কট্টর মৌলবাদী মানুষ গিজগিজ করছে সবার চারপাশে। এরা কেউ বাক-স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ নয়। ফলে মনে করা হয় নির্দিষ্ট ইস্যুতে কথা বলার স্বাধীনতা থাকতে হবে। যদি বাক-স্বাধীনতা চাইতে হয়, তাহলে সব ঘটনাতেই চাইতে হবে। তবে এ কথার অর্থ এরকম নয়, যে লাগামহীন কথা বলার নাম বাক-স্বাধীনতা।

বাংলাদেশের কোথাও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সর্বত্র উন্নতশিক্ষার বীজ রোপণ করতে হবে। নয়তো একেকটি হত্যাকা-, একেকটি পাশবিক নির্যাতন আমাদের ভীষণরকম আতঙ্কিত করতেই থাকবে। আজ একজন, আগামী কাল আরেকজনকে শিকার হতে হবে। একটি সমাজগঠন প্রক্রিয়ায় যদি বস্তুনিষ্ঠ, যুক্তিসংগত কাঠামো না থাকে সেই সমাজ কখনো শিক্ষিত সমাজ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। আপনি ঘুষখোরের প্রশংসা করবেন, ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছে আত্মমর্যাদা বিক্রি করবেন, ভদ্র শুদ্ধাচারীদের বোকা বলবেন আর সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন সেটি হবে না।

সমাজে যদি প্রকৃত শিক্ষা বিতরণ করা হতো তাহলে একজন ঘুষখোর সন্তানের বাবা সন্তানের আয়ের উৎস সন্ধান করতেন। একজন বন্ধু প্রকাশ্যে ঘুষখোর কিংবা সন্ত্রাসী বন্ধুতে এড়িয়ে চলতেন। অপরাধী বাবা-মায়ের সন্তানেরা লজ্জায় সঙ্কুচিত হতেন। স্ত্রী-স্বামীকে সৎ পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করতেন। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা কোনো নিম্নস্তরে গিয়ে ঠেকেছে যে, ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যা করাকে অনেকেই সমর্থন করেন। ক্রসফায়ারের মতো বিচারবিহীন হত্যার বর্বরতা অতীতে কখনো ছিল না। মাথাব্যথার কারণ সন্ধান না করে মাথাটাই কেটে ফেলার পক্ষে এই সমাজ দাঁড়িয়েছে।

সে জন্য আমাদের অবশ্যই উন্নতশিক্ষার পথে হাঁটতেই হবে। স্নাতকোত্তর পাস করলে একটি সনদ পাওয়া যায়। ওই সনদ একজন ভালো মানুষ হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা প্রদান করে না। বরং সনদের সঙ্গে যদি উন্নতশিক্ষার জ্ঞানটাও থাকত তবেই উচ্চশিক্ষা উন্নত শিক্ষায় পরিণত হতো। দিন দিন বাড়ছে তথাকথিক উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা। অন্যদিকে ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে আসছে ঋজু হয়ে দাঁড়ানো উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা।

দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর তাই যথার্থই বলেছেন- ‘বস্তুত বিদ্যা শিক্ষার ডিগ্রি আছে। জ্ঞানের কোনো ডিগ্রি নেই। জ্ঞান ডিগ্রিবিহীন এবং সীমাহীন।’ ডিগ্রি থাকুক অথবা না-ই থাকুক আমরা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই। আর উচ্চশিক্ষায় উন্নতশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

তুহিন ওয়াদুদ : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক
এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
wadudtuhin@gmail.com