উচ্চমানের রাষ্ট্রে নিম্নমানের রাজনীতি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬

উচ্চমানের রাষ্ট্রে নিম্নমানের রাজনীতি

ইমরান মাহফুজ ৯:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৯

print
উচ্চমানের রাষ্ট্রে নিম্নমানের রাজনীতি

স্বা’অধীনদেশে ‘কায়দা করে বেঁচে থাকো’/আর মরে গেলে আয়োজন করব ‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’!
কাব্যিক ভাবনাটি গতকালের। সবাই দেখেছেন বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরারের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর সহপাঠী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিপুল আবেগ ও প্রতিক্রিয়া, তা ইতিহাসে বিরল। সহায় রাষ্ট্রের অসহায় নাগরিক! তবু সর্বস্তরের মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করেছে। তবে জাবির জুবায়ের ও পুরান ঢাকার বিশ্বজিতের খুনি ছাত্রলীগ সদস্যদের যদি বিচার ঠিকঠাক হতো তাহলে আবরারকে নির্মমভাবে জীবন দিতে হতো না। স্বপ্ন হারিয়ে কাঁদতে হতো না তার পরিবারকে।

সমাজের এ ঘটনাগুলো কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটছে এমন নয়- আবার শুধু ছাত্রলীগ এমন অপরাধ করছে এমন নয় বরং সারা দেশেই ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনগুলো নিয়মিতই গুম-খুন-হত্যা-ধর্ষণের মতো অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে পূর্বসূরিদের উৎসাহে। মনে রাখা দরকার, অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়াই নতুন সদস্যদের অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়া।

ষাটের দশকে আমাদের পূর্বপুরুষরা দেশমুক্তির জন্য যা করেছেন, তার নাম ছাত্র আন্দোলন। কিন্তু এ শব্দটি পরবর্তীকালে যখন ছাত্ররাজনীতিতে রূপ লাভ করল, তখন এখানে যুক্ত হয় মূলত দলের লেজুড়বৃত্তি এবং ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মী বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা পরিণত হন প্রতিপক্ষ দমনে সরকারের পেটোয়া বাহিনীতে। সেই সঙ্গে দলের পদ-পদবি নিয়ে ছাত্ররাজনীতিকে রাতারাতি টাকা কামানোর মেশিনে পরিণত করা হয় (দ্য ডেইলি স্টার, আমীন আল রশীদ)।

আজকের পরিস্থিতিতে ভীষণভাবে মনে পড়ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসের অসামান্য দলিল অসমাপ্ত আত্মজীবনী ১১০ পৃষ্ঠার একটা অংশ- ‘তখনকার দিনে আমরা কোনো সভা বা শোভাযাত্রা করতে গেলে একদল গুণ্ডা ভাড়া করে আমাদের মারধর করা হতো এবং সভা ভাঙার চেষ্টা করা হতো। ...আশ্চর্যের বিষয় সরকারি দল প্রকাশ্যে গুণ্ডাদের সাহায্য করত ও প্রশ্রয় দিত। ...মুসলিম লীগ নেতারা একটা ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল যাতে কেউ সরকারের সমালোচনা করতে না পারে।

মুসলিম লীগ নেতারা বুঝতে পারছিলেন না, যে পন্থা তারা অবলম্বন করেছিলেন সেই পন্থাই তাদের ওপর একদিন ফিরে আসতে বাধ্য। ওনারা ভেবেছিলেন গুণ্ডা দিয়ে মারধর করেই জনমত দাবাতে পারবেন। এ পন্থা যে কোনো দিন সফল হয়নি, আর হতে পারে না-এ শিক্ষা তারা ইতিহাস পড়ে শিখতে চেষ্টা করেননি।’

প্রকৃতভাবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে প্রচার করে মাঠে থাকা শাসক কি এই শিক্ষা নিয়েছেন? আমরা তা দেখি না। তাহলে পরবর্তী গল্প কেমন হবে ভাবছেন একবার! সময় সমাজ ইতিহাস খুবই নির্মম। আগুনের মতো পুড়িয়ে দেয়।

দুঃখজনকভাবে আয়নাও মলিন হয়। তখন আপন চেহারা দেখা যায় না। মনে রাখা ভালো, ‘মানুষ’ কখনো মানুষের জন্য আহত না হয়ে থাকতে পারে না। বাংলাদেশে ধনী গরিব সবাই মিলে আমরা একটি পরিবার।

পরিবারের প্রতিটি সদস্য আজ মানসিকভাবে ধর্ষিত, নির্যাতিত, অবহেলিত সেই সঙ্গে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আপনালোয় জেগে উঠেছে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। আর মানুষ হয়ে যদি মানুষ না বুঝি তা হলে কিসের রাষ্ট্র আর কিসের গণতান্ত্রিক সরকার! গণতন্ত্রের কোনো সংজ্ঞাই এ সমাজে আলো ফেলেনি। ফলে ফেলানীরাও ফেলনা হয়ে যায়। মমতাময়ী মা’রা কি পারে বুকের কষ্ট ফেলে দিতে? এমন ভাবনার সময় আকাশে উড়ে। মা মাটি মানুষের কাছে আসে না। অথচ এই সমাজে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু মেটালেই খুশি। কিন্তু তাও থেকেছে আসমানের আল্লাহর কাছে! অন্যদিকে কাগজে জনগণের রাষ্ট্র হলেও কোনো সিদ্ধান্তে এরা যেতে পারে না। স্বপ্ন দেখাটাও কখনো কখনো অপরাধ।

সাধারণ ভাবনায় জানি, রাষ্ট্রের ধর্ম দুর্বলকে রক্ষা আর দুর্জনকে প্রতিরোধ অথচ সমাজে আজ দ্বন্দ্ব-হানাহানি, রাজনৈতিক কলহ-অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয়, সহিংসতা বেড়েই চলছে। কখনো বা চলে রক্ষার নামে শুভঙ্করের ফাঁকি। স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে কিন্তু নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের নিম্নবর্গীয় স্বপ্ন গল্প, উপন্যাসের মতো মলাটবন্দি।

নিদারুণ কষ্টের শহরে অবশেষে বুঝলাম- সবার ‘স্বপ্নপূরণ হয় না, নিয়তির নিয়মে থাকে অধরা এবং প্রতিদিনকার মৃত্যু দৃশ্য চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় আমল বদল হলেও জনতার আমলনামা পরিবর্তন হয় না। অথচ এ শ্রেণির মানুষের ওপরই রাষ্ট্র টিকে থাকে!

একটা গল্প বলি, আমাদের বাড়িতে একটি কাপ আছে অনেক কাল আগের, তাতে দাদা রং চা খেতেন, বাবা আর একটু আয়েশী হয়ে দুধ চা, আমি আধুনিক ভাবনায় আর রুচিতে কফি খাই। ভেবে দেখুন এই ভূগোল ও জনসাধারণ জীবন চাওয়া পাওয়া খুব পরিবর্তন হয়নি।

অর্থাৎ সাধারণের অবস্থা একই, কৃষকের অবস্থা একই! শুধু শাসকের চেহারা বদলেছে, আয়েশী জীবনযাপন করছে। রাতারাতি বদলে গেছে কথিত শিক্ষিত সমাজ। কাপের অবস্থা একই থাকছে। যেমন শাসক, শোষণ...। স্বাধীন দেশের এহেন আচরণ, অদ্ভুতভাবে ভাবাচ্ছে...।

মনে রাখা দরকার আমাদের স্বাধীনতা এবং মুক্তির অন্যতম শক্তি শিক্ষার্থীরা। আর শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে একটি দেশ আগাতে পারে না। পারে না টেকসই উন্নয়ন করতে।

কেবল বড় বড় দালান, রাস্তা, ফ্লাইওভার, ব্রিজ আর বিশ্ববিদ্যালয় বানালেই হবে না-মানুষ বানাতে বা সুন্দর পরিবেশ তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। তাই এত কিছুর মাঝেও আশার জমিনে দাঁড়িয়ে বলি, সমাজ পরিবর্তনের দৃশ্য অদৃশ্য ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক বিচিত্র দহন থেকে সৃজনশক্তি প্রলুব্ধ হয়ে আসুক ভিন্ন স্বর। সুখী হোক বাংলাদেশ।

ইমরান মাহফুজ
কবি ও গবেষক