বৈশ্বিক উষ্ণতায় এসএফসিক্স গ্যাস

ঢাকা, বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ | ১ কার্তিক ১৪২৬

বৈশ্বিক উষ্ণতায় এসএফসিক্স গ্যাস

সৈয়দ ফারুক হোসেন ১০:০১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০২, ২০১৯

print
বৈশ্বিক উষ্ণতায় এসএফসিক্স গ্যাস

সালফার হেক্সাফ্লুরাইড গ্যাস ‘এসএফসিক্স গ্যাস’ নামে আমাদের কাছে পরিচিত। সস্তা ও অদাহ্য এসএফসিক্স গ্যাস বর্ণ ও গন্ধহীন। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, অগ্নিকাণ্ডসহ বৈদ্যুতিক বিভিন্ন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এটি চমৎকার কাজ করে। মাঝারি ও উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক স্থাপনায় এটি অত্যন্ত কার্যকর প্রতিরোধক বা অন্তরক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী।

এই গ্যাস যতটুকু উপকারী তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিকর, বেশি ভয়ঙ্কর। বলা যায় নীরব ঘাতক। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে এসএফসিক্স গ্যাস ২৩ হাজার ৫০০ গুণ বেশি উষ্ণ। এই গ্যাস পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে টিকেও থাকে। নিঃসরিত এসএফসিক্স গ্যাস অন্তত এক হাজার বছর ধরে পৃথিবীকে উষ্ণতর করে চলতে পারে। এমন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলেই আজ বিশ্ব জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন। পরিবেশকে তছনছ করে দিচ্ছে এই গ্যাস। এরপরও এসএফসিক্স গ্যাস ব্যবহার বেড়েই চলছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে মানুষ দিনে দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বেশি ঝুঁকছে। এই পরিবর্তনের ফলে বৈদ্যুতিক সঞ্চালন ব্যবস্থায় দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আরও বেশি পরিমাণে সংযোগ, অতিরিক্ত সুইচ, সার্কিট ব্রেকারসহ নতুন নতুন সংযোজন হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে এসব সংযোজনকে সুইসগিয়ার বলে। সুইসগিয়ারে শর্টসার্কিটসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিরোধক বা অন্তরক হিসেবে সহজলভ্য বলেই ব্যাপকভাবে এসএফসিক্স গ্যাস ব্যবহার করা হয়। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এসএফসিক্স বায়ুমণ্ডলে মিশছে মূলত অন্তরক পদার্থের ফাটল বা ছিদ্রের মাধ্যমে নিঃসরিত হয়ে।

এই গ্যাসের মূল সমস্যা হলো, এটি বায়ুমণ্ডলে শোষিত বা প্রাকৃতিকভাবে এর উপাদান ভেঙে যায় না। তাই এটি বায়ুমণ্ডলকে অত্যধিক উষ্ণ করে চলেছে। এই সংকট মোকাবিলার একমাত্র উপায়, বায়ুমণ্ডল থেকে এসএফসিক্স অপসারণ করা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি জানিয়েছে, আগামী বছর এসএফসিক্সের বিকল্প কিছু কাজে লাগানো যায় কি না, তা পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকরণ শিল্পে সালফার হেক্সাফ্লুরাইড বা এসএফসিক্সের ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, অগ্নিকাণ্ডসহ বৈদ্যুতিক বিভিন্ন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করে এটি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী। তবে স্বল্পপরিচিত এই গ্যাসের নিঃসরণের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেক বেশি বেড়ে গেছে। কেবল ২০১৭ সালেই ইউরোপ মহাদেশে এই গ্যাসের যে পরিমাণ নিঃসরণ হয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে সড়কে অতিরিক্ত আরও ১৩ লাখ গাড়ি নামালে যতটা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হতো, তার সমান।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সস্তা ও অদাহ্য এসএফসিক্স গ্যাস বর্ণ ও গন্ধহীন। মাঝারি ও উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক স্থাপনায় এটি কার্যকর অন্তরক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কার্বন ডাইঅক্সাইডের চেয়ে এসএফসিক্স গ্যাস ২৩ হাজার ৫০০ গুণ বেশি উষ্ণ। এই গ্যাস পৃথিবীর বায়ুম-লে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে টিকেও থাকে। নিঃসরিত এসএফসিক্স গ্যাস অন্তত এক হাজার বছর ধরে পৃথিবীকে উষ্ণতর করে চলতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমানে এসএফসিক্সের নিঃসরণ হার কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় খুব কম হলেও ২০৩০ সাল নাগাদ তা ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই গ্যাসের মূল সমস্যা হলো, এটি বায়ুমণ্ডলে শোষিত বা প্রাকৃতিকভাবে এর উপাদান ভেঙে যায় না। এই সংকট মোকাবিলার একমাত্র উপায়, বায়ুমণ্ডল থেকে এসএফসিক্স অপসারণ। ইউরোপীয় কমিশন ২০১৪ সালে এসএফসিক্সসহ মানুষের প্রস্তুতকৃত ক্ষতিকর কিছু গ্যাস (এফ-গ্যাস নামে পরিচিত) নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ইউরোপজুড়ে ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম প্রস্তুত ও ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবল বিরোধিতার মুখে সে উদ্যোগ সফল হয়নি। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এসএফসিক্স বায়ুমণ্ডলে মিশছে মূলত অন্তরক পদার্থের ফাটল বা ছিদ্রের মাধ্যমে নিঃসরিত হয়ে।

উষ্ণ তাপমাত্রা শ্বাসকার্যে ব্যাঘাত ঘটায় এবং দেহে নানা রোগ সৃষ্টি করে। দূষিত বায়ুর কারণে মানবদেহে এলার্জি, কাশি, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যথা, ফুসফুসে ক্যান্সারসহ মারাত্মক রোগ হতে পারে। আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আগামী দিনের ভবিষ্যৎকে বাঁচাতে হলে উষ্ণতাপমাত্রার জন্য দায়ী এসএফসিক্স গ্যাসের কবল থেকে বাঁচাতে হবে পরিবেশকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব এখনই পৃথিবীর মানুষের উপরে পড়ছে, ঝড়-বন্যা-দাবানল-খরা যেভাবে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে, সেগুলো ভবিষ্যতে আরও বিপর্যয়কর হয়ে উঠবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আজকের শিশুরাই। যারা গাছপালা কেটে কলকারখানা আর বাসস্থান বানাচ্ছে, তাদের দোষের কারণে আমাদের ভুগতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলেছে। তাই এই সুন্দর পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে উষ্ণতার জন্য দায়ী এই এসএফসিক্স গ্যাসের নিঃসরণ থেকে আমাদের অতিদ্রুত মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

সৈয়দ ফারুক হোসেন
ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়