পাটের বহুমুখীকরণে করণীয়

ঢাকা, বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ | ১ কার্তিক ১৪২৬

পাটের বহুমুখীকরণে করণীয়

আবু আফজাল সালেহ ৯:৪০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০১, ২০১৯

print
পাটের বহুমুখীকরণে করণীয়

একসময় পাট ছিল আমাদের একমাত্র রপ্তানি পণ্য। কিন্তু বিদেশি চক্রান্ত, সুদক্ষ পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে প্রায় মরে গেছে এ শিল্প। বর্তমান সরকার এ খাতকে গতিসঞ্চার করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। যার ফলও আমরা হাতেনাতে পাচ্ছি।

সম্প্রতি পাটের উৎপাদন বাড়ছে। উন্নতির গ্রাফচিত্র আমরা তুলে ধরতে পারি। ২০১২-১৩ অর্থ বছর থেকে পাটের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাটের উৎপাদন ছিল ৫১ লাখ মেট্রিক টন। সর্বশেষ অর্থবছরে পাটের উৎপাদন হয়েছে ৯২ লাখ মেট্রিক টন। এতে দেখা যাচ্ছে প্রতি বছর পাটের উৎপান বাড়ছে। পাটের রপ্তানিও বেড়েছে। যেমন ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে পাট রপ্তানি হয়েছে ৪১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। আগের বছর একই সময়ের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেড়েছে।

২০১৪ সালে দেশের পাটের উৎপাদন ছিল ৬৫ লাখ বেল (এক বেল সমান ১৮২ কেজি), ২০১৫ সালে ৭০ লাখ বেল, ২০১৬ সালে ৮৫ লাখ বেল এবং ২০১৭ সালে ছিল ৯২ লাখ বেল। দেশে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯১ দশমিক ৯৯ লাখ বেল কাঁচাপাট উৎপাদন হয়েছে। কাঁচাপাট রপ্তানি হয়েছে ১৩ দশমিক ৭৯ লাখ টন। পাট রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এ খাতে রপ্তানি আয় ১ হাজার ২৯৪ দশমিক ৬৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিশ্বের মোট পাটের ৩৩ শতাংশ উৎপাদন করে এবং কাঁচাপাটের প্রায় ৯০ শতাংশই রপ্তানি করে।

আমাদের ব্যবহারিক জীবনে পাটের গুরুত্ব অপরিসীম। পাট থেকে উৎপাদিত পণ্য যেমন-বস্ত্র, থলে, দড়ি, কাঁচি, সূক্ষ্ম বস্ত্র ও কার্পেট প্রভৃতি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিনিয়ত ব্যবহার হয়ে থাকে। আমাদের পাট থেকে তৈরি ‘জুটন’ পৃথিবীর নানা দেশে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। আমাদের পাটকলের তৈরি কার্পেট পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এখনো বিশেষভাবে সমাদৃত।

এ ছাড়া পাটের তৈরি ঝুড়ি, শিকে এবং কারুকাজ শোভিত অন্যান্য দ্রব্য বিদেশিদের দৃষ্টি কাড়ছে। এগুলো রপ্তানি করে বাংলাদেশ এখনো যথেষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বাজারে পাটের তৈরি চালের বস্তা ও সুতলি থেকে গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার সৃষ্টি হয়েছে।
পাটপণ্যের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক ব্যাগ, সেমিনার ফাইল ও প্রমোশনাল পণ্য, নানা ধরনের গৃহস্থালী, বাহারি সাজসজ্জায় ব্যবহৃত পণ্যসামগ্রী অন্যতম। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা থাকলেও ধারাবাহিকভাবে বছরে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে গত বছর প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে।

পাটের বহুমুখীকরণ যত বাড়ানো যাবে ততই পাটের অর্থনীতিতে অবদান বাড়বে। শুধু পাটেই নয় যেকোনো পণ্যের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। আমরা যতই আধুনিক হচ্ছি ততই রুচিবোধে ভেরিয়েশন আসছে। এ কারণেই বহুমুখীকরণ ছাড়া অন্য উপায় কম ফলপ্রসূ হবে। মানুষের রুচির ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। খাপ খাওয়াতে তাই পাটের বহুমুখীকরণে সুষ্ঠু পরিকল্পনা দরকার।

পাটের মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০ ও বিধিমালা-২০১৩ আছে। কিন্তু মোড়কজাতের বাইরেও পাটের অন্যান্য বিষয়েও আইন করা দরকার। বিপণন, বীজ, সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা আইনে সংযোজন করা যেতে পারে। পলিথিন উৎপাদন, বিপণন, ব্যবহার বন্ধ ও পাটপণ্যের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে চাহিদা অনুযায়ী গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন এবং এর প্রচার বাড়াতে হবে।

মানসম্মত পাট উৎপাদন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, পাটকলের আধুনিকায়ন, পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এই পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘জাতীয় পাটনীতি-২০১৮’-এর খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। পাটের গুরুত্বের বিষয়টি প্রকাশের জন্য সরকারে যে আন্তরিকতা তা প্রশ্নাতীত। কারণ বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ২০১৭ সালেই সর্বপ্রথম ৬ মার্চকে জাতীয় পাট দিবস হিসেবে পালন করা হয়। প্রতিবারই নতুন স্লোগান নিয়ে সরকার প্রচার ও প্রসার বাড়াতে সচেষ্ট।

পাটের উন্নয়ন ও বহুমুখীকরণের জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দরকার গবেষণা। এক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কৃষিক্ষেত্রে প্রচুর গবেষণা হয়। তার ফলশ্রুতিতেই কৃষিতে আমাদের প্রচুর উন্নতি হয়েছে। আসলে কোনো বিষয়/সেক্টরে উন্নয়নের জন্য প্রচুর গবেষণার ক্ষেত্র থাকতে হবে। অদৃশ্য এ উন্নয়নে আমাদের জোর দিতে হবে। এটা অবশ্য সব সেক্টরের জন্য প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি।

ভালোমানের বীজের অভাব সবসময়েই থাকে। অনেক ক্ষেত্রে চোরাইপথে আসা ভারতীয় নিম্নমানের পাটের বীজে আশানুরূপ ফল পাই না আমরা। নিজস্ব বীজ উৎপাদনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। না হওয়া পর্যন্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণে ভালো বীজ আমদানি করতে করে কৃষকের মধ্যে বিতরণ/বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পাট চাষ, সংরক্ষণ ও বিতরণের উন্নয়নে কৃষি ঋণের সহজীকরণ করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংগুলোর ওপর তদারকি বাড়াতে হবে।

পাটের কম দাম পান প্রান্তিক কৃষকরা। কৃষকের চেয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি লাভবান হয়। তারা আবার সিন্ডিকেটও তৈরি করে থাকে। তাই কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পাট ক্রয়ের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। এসব নেতিবাচকদিকগুলো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবে এবং পাটচাষে ঝুঁকবে।

পাটসংশ্লিষ্ট কুটির শিল্পের জোরদারকরণ প্রকল্প হাতে নিতে হবে। দক্ষ জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে বহুমুখীকরণে তাড়াতাড়ি ফল পাব আমরা। তাদেরও পুনঃপুন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ থেকে দক্ষতর জনবল হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে বৈচিত্র্য আনতে পারব। সরকারের নতুন নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারবে তারা। পাট ও পাটসামগ্রী বিপণনে হাটবাজার সম্প্রসারণ করতে হবে, গুদাম মেরামত বা নতুন তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের মাঝে ব্যংকগুলোকে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থাকরণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

পাট একটি পরিবেশবান্ধব পণ্য। পরিবেশবিনাশী পলিথিন এমন একটি রাসায়নিক বস্তু যা পচনশীল নয়। এটি পোড়ালেও দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়া বের হয়ে পরিবেশ নষ্ট করে। এটি যেখানে পড়ে থাকে সেখানে থেকেই কৃষি ফসলের জমিতে মাটির রস চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। বিভিন্ন খাল-বিল, নদী-নালা, ড্রেন, নর্দমা-সব জায়গায় পরিত্যক্ত পলিথিন জমে জমে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে থাকে। সেজন্যই পলিথিনের বিকল্প হিসেবে শুধু বাংলাদেশে নয়, আমাদের প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে ক্যারিং ব্যাগ হিসেবে পাটের তৈরি ব্যাগ অনায়াসে ব্যবহার করা হচ্ছে।

পাটের কোনোকিছুই ফেলনা নয়। ছোট-বড় সবধরনের পাটগাছ থেকে পাতা নিয়ে পুষ্টিকর পাটশাক খাওয়া যায়। এ পাটশাক শুকনো হিসেবেও দীর্ঘদিন ঘরে সংরক্ষণ করে খাওয়ার সুযোগ থাকে। পাটের পুরো মৌসুমে জমির মধ্যে যে পাতা পড়ে, তা উক্ত জমির জৈব পদার্থ যোগে উর্বরতা বাড়াতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পাটের শিকড়, গাছ, পাতা থেকে সার যোগ হলে পরবর্তী ফসল আবাদে ওই জমিতে আর কোনো বাড়তি সার প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে না।

বর্তমানে বাংলাদেশের পাটশিল্পে বেশ কিছু সমস্যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এ ছাড়া স্থবিরতা বা রপ্তানি মূল্য হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি; পুরনো যন্ত্রপাতির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস; শ্রমিক সমস্যা; বহুবিস্তৃত দুর্নীতি; অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, মূলধন ঋণে উচ্চসুদের হার আদায়, রাষ্ট্রায়ত্ত মিলে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, অনিয়ন্ত্রিত অপচয়, বিদ্যুৎ ঘাটতি, অদক্ষ বা আধা দক্ষ শ্রমিক, অধিক জনবল নিয়োগ, জবাবদিহির অভাব, সর্বস্তরে দুর্নীতি, যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণ ও স্থলাভিষিক্ত নীতির শূন্যতা, রুগ্ন ট্রেড-ইউনিয়ন চর্চা ইত্যাদি সমস্যা এ শিল্পের অন্তরায়। এ বিষয়গুলো ভালোভাবে দেখতে হবে বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে পাট পণ্যের চাহিদা প্রায় ৭.৫০ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে ৪.৬০ লাখ মেট্রিক টন, যা প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও বেশি। পাট থেকে উন্নতমানের ভিসকস সুতা উৎপাদন হয়। পাটখড়ি জ্বালানির প্রধান উৎস হলে গত কয়েক বছর ধরে পাটখড়ির চারকোল বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ থেকে আয় হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে পাট থেকে তৈরি হচ্ছে চা। এতে জীবনরক্ষাকারী উপাদান আছে। প্রচলিত ব্যবহারের পাশাপাশি বহুমুখী ব্যবহারের ফলে পুনরুদ্ধার হচ্ছে রপ্তানি বাজার। দেশব্যাপী পাটের আবাদ, উৎপাদন ও দাম বেড়েছে। দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার পাটের চট বা জিও টেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি হয়েছে।

সবমিলিয়ে পাটকলগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর বিশদ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দেশে ও বিদেশে পাটের বাজার বাড়াতে পাটজাত পণ্যের প্রদর্শনী, মেলা, প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন দূতাবাসের মাধ্যমে বিদেশে প্রচারের কাজ তরান্বিত করতে হবে। কোয়ালিটি উন্নয়ন করতে হবে পণ্যে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।

যত প্রশিক্ষণ তত দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং তারা বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করবে। আর দরকার জনসচেতনতা সৃষ্টি।
ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে পলিথিন বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক জিনিসপত্র ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে ইতিবাচক জনমত গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি-মিডিয়া-বেসরকারি সেক্টর সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে আমরা ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব। ইতিমধ্যে সবার প্রচেষ্টাই আমরা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হয়েছি।

আবু আফজাল সালেহ : উপপরিচালক বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি), লালমনিরহাট
abuafzalsaleh@gmail.com