ভেটেরিনারি বনাম প্রাণিসম্পদের দৈন্যদশা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬

ভেটেরিনারি বনাম প্রাণিসম্পদের দৈন্যদশা

ড. এম এ হান্নান ৯:৪৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

print
ভেটেরিনারি বনাম প্রাণিসম্পদের দৈন্যদশা

একটি জাতি কতটা সবল ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তার সবচেয়ে ভালো নির্ণায়ক হলো সে জাতির শিশুস্বাস্থ্য ও প্রাণিস্বাস্থ্য। প্রাণিস্বাস্থ্যের বা প্রাণীজ আমিষের ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রভাব পড়ে শিশুস্বাস্থ্য তথা সমগ্র মানবজাতির ওপর। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত ভেটেরিনারি ডাক্তাররা প্রাণিচিকিৎসা ও প্রাণী উৎপাদন ব্যবস্থাপনা সুরক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনের দ্বারা এদেশের মানুষের প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্বব্যাপী ভেটেরিনারি মেডিসিন একটি সম্মানজনক পেশা এবং বহু দেশে ভেটেরিনারি ডাক্তারদের মূল্যায়ন মানুষের ডাক্তারদের চেয়ে কম নয়, কারণ তারা বিশ্ব মানবকুলের প্রাণীজ আমিষ জোগানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাণিসম্পদ সেক্টরটি বাংলাদেশে অবহেলিত এবং এর কার্যকর উন্নয়নে আমাদের সরকারগুলোকে কখনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

 

গত শতাব্দীর আশির দশকের পর থেকে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের জনবল কাঠামোতে কোনো নতুন পদ সৃষ্টি বা বিদ্যমান পদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়নি। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ১৯৮৩ সালে যখন মোট জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটি এবং গবাদি পশুপাখির সংখ্যা ছিল ১১ কোটি (কৃষি শুমারি, ১৯৮৩-৮৪), তখন প্রতি উপজেলাতে ১ জন করে ভেটেরিনারি সার্জন ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পদ বণ্টন করে প্রাণিসম্পদ সেক্টরে প্রথম অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) গঠিত হয়। আজ প্রায় ৪ দশক পর দেশের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৭ কোটি এবং গবাদি পশুপাখির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪০ কোটি (সূত্র : প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের রিপোর্ট) হয়েছে, অথচ এই বিস্ফোরিত জনসংখ্যার প্রাণীজ আমিষের ঘাটতি মেটাতে বর্ধিত গবাদি পশুপাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাঠ পর্যায়ে অতিরিক্ত জনবল সংকুলানের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কাজেই, বর্তমানে ১ জন ভেটেরিনারি সার্জন দিয়ে একটি উপজেলার ৬-৭ লাখ গবাদি পশুপাখির সুচিকিৎসা কতটুকু নিশ্চিত করা যাচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়!

ওই অর্গানোগ্রাম হওয়ার সময় এদেশে শুধু বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহের ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদ থেকে প্রতি বছর ৫৫ জন ভেটেরিনারি ডাক্তার বের হতো। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে বাংলাদেশের ৮টি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় ও ১টি সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ থেকে প্রতি বছর প্রায় ১০০০ ভেটেরিনারি ডাক্তার বের হচ্ছেন এবং গত ৩ বছরে আরও ৪টি বিশ^বিদ্যালয়ে নতুন করে ভেটেরিনারি সায়েন্স কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল সংখ্যক ভেটেরিনারি ডাক্তারের কর্মসংস্থানের কোনো পদক্ষেপ বস্তুত দৃশ্যমান নয়।

ফলস্বরূপ, এই সেক্টরের পাসকৃত হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েটের আজ কোনো চাকরি নেই, চাকরির প্রত্যাশায় হন্য হয়ে তারা রাস্তায় ঘুরছেন। অথচ এই বেকার ভেটেরিনারি ডাক্তারদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের পশুপাখির সুচিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের আমূল উন্নয়নের সুযোগ ছিল।

উল্লেখ্য, দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য, শাকসবজি ও ফলমূলের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে এবং মাছের চাহিদা মেটাতে মৎস্য অধিদফতরে মাঠ পর্যায়ে অধিকসংখ্যক কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করে গত ২০১৪ সালে নতুন অর্গানোগ্রাম বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা বর্তমান সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ফলস্বরূপ, এখন সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়, আর চাল ও মাছ উৎপাদনে চতুর্থ ( সূত্র : কৃষি সম্প্রসারণ এবং মৎস্য অধিদপ্তর)।

পক্ষান্তরে, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের উপাত্ত মোতাবেক দুধ ও ডিমের বার্ষিক উৎপাদন যথাক্রমে ৯৪.০৬ লাখ মেট্রিক টন এবং ১৫৫২ কোটি এবং দুধ ও ডিমের বার্ষিক ঘাটতি যথাক্রমে ৫৬.২৩ লাখ মেট্রিক টন ও ১৬০.৮৮ কোটি। দুধের বর্তমান উৎপাদন বার্ষিক চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও কম (৬২.৫৮%)। পরিণামে, বিদেশ থেকে নিম্নমানের গুঁড়া দুধ আমদানি করে আমাদের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। পাশাপাশি গরুর মাংসের দাম বেড়ে কেজি প্রতি ৫৫০ টাকা ছাড়িয়েছে।

মূলত, আমাদের অধিকাংশ খামারি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছোট্ট পরিসরে হাঁস-মুরগি, গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের খামার করছে; কিন্তু সকলে লাভবান হতে পারছেন না- কেউ কেউ হচ্ছেন নিঃস্ব। কারণ, ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ভুল চিকিৎসা ও অব্যবস্থাপনার দরুন বিভিন্ন সময় তাদের খামারে ঘাতক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব মহামারী আকার ধারণ করছে। কাজেই, আমাদের বিশাল বেকার-দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি লালন পালনে উদ্বুদ্ধ করণসহ প্রয়োজনীয় ভেটেরিনারি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তাতে একদিকে আমাদের খামারিরাই যেমন দেশের দুধ, ডিম ও মাংসের চাহিদার শতভাগ পূরণ করবে; অন্যদিকে এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি তথা বেকারত্ব ঘোচানোর এক উৎকৃষ্ট পন্থা হবে। কিন্তু সরকার প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে মাঠ পর্যায়ে জনবল কাঠামো বৃদ্ধি করে ভেটেরিনারি সেবা বিস্তারের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

এতে কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে তাদের পশুপাখির স্বাস্থ্য সেবা থেকে, আর দেশ বঞ্চিত হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর কর্তৃক প্রস্তাবিত একটি নতুন অর্গানোগ্রাম অর্থ মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অজানা কারণে আটকে আছে। সরকারের উচিত প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেকার ভেটেরিনারি ডাক্তারদের কর্মসংস্থান করে প্রান্তিক ক্ষুদ্র খামারিদের দোরগোড়ায় ভেটেরিনারি সেবা পৌঁছে দেওয়া। তাতে সবজি, চাল ও মাছের ন্যায় দেশকে নিরাপদ দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে।

আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষ এবং ৪৫ শতাংশ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল (সূত্র : প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের রিপোর্ট)। ফলে প্রাণিসম্পদ সেক্টরে জনবল নিয়োগের যে বন্ধ্যা অবস্থা চলছে, তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের প্রস্তাবিত নতুন অর্গানোগ্রাম বাস্তবায়নের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

আগামী ২০৪১ সালে স্বপ্নের উন্নত বাংলাদেশে সুস্থ-সবল ও মেধাবী উন্নত বাঙালি জাতি দেখতে চাইলে- প্রয়োজন নিরাপদ দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি টেকসই সমৃদ্ধশালী প্রাণিসম্পদ সেক্টর।

ড. এম এ হান্নান : পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক, অবিহিরো ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচার
অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন, জাপান
m.hannan1984@gmail.com