নীলফামারী জেলার যত নদ-নদী

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬

বাঁচায় নদী, বাঁচাও নদী-৫৩

নীলফামারী জেলার যত নদ-নদী

ড. তুহিন ওয়াদুদ ৯:৪৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৯

print
নীলফামারী জেলার যত নদ-নদী

নীলফামারী জেলা দিয়ে কতগুলো নদী প্রবাহিত হয়েছে এই পরিসংখ্যান একসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওয়া যাবে না। এর প্রধানতম কারণই হচ্ছে নদীর প্রতি একরকম চরম উদাসীনতা। নদীর সংখ্যা খুঁজে বের করার জন্য দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানই এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়-কোনো মন্ত্রণালয় এ দায়িত্ব পালন করেনি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে। তাদের সেই তালিকা অসম্পূর্ণ।

যদি নদীর কাজ করতে হয় তাহলে প্রথমেই জানতে হবে নদীর সংখ্যা। তারপর নদীগুলো মাঠপর্যায়ে কোন অবস্থায় আছে সেসব খুঁজে বের করতে হবে। অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারিভাবে এখন দেশের সব উপজেলায়, জেলায়, বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে নদী রক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদিও কোন উপজেলায় কতটি নদী আছে সেই পরিসংখ্যান না থাকে তাহলে ওই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কীভাবে নদীর রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেত পারবেন? সেজন্য কোন জেলায়, কোন উপজেলায় কতটি নদী আছে সেগুলোর বাস্তব অবস্থা কী তা অবশ্যই জানতে হবে।

নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে ২৬টির ওপর নদী বয়ে গেছে। মাঠ পর্যায়ে দীর্ঘদিন অনুসন্ধান করে যে নদীগুলো পেয়েছি সেই নদীগুলো হচ্ছে- আউলিয়াখান, ইছামতী, করতোয়া, কলমদার, কুমলাল, খড়খড়িয়া, খলিসাডিঙি, ঘাঘট, চারা, চারালকাঠা, চিকলি, চেকাডারা, তিস্তা, দেওনাই, দেওনাই (হরিণচড়া-লক্ষ্মীচাপ), ধাইজান, ধুম, নাউতারা, নেংটি ছেঁড়া, বামনডাঙা, বুড়িখোড়া, বুড়িতিস্তা, বুল্লাই, যমুনেশ্বরী, শালকি, স্বরমঙলা। এর মধ্যে ২৪টি নদী পাড়ে আমি সশরীরে গেছি। কোনো কোনো নদীর পাড়ে কয়েকবার করে গেছি।

উল্লেখিত নদীগুলো পুরনো কাগজে নদী হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ নদীগুলোর মধ্যে এমন একটি নদীর নামও বলার উপায় নেই যে, নদীটি ভালো আছে। কোনো না কোনোভাবে মনুষ্যসৃষ্ট সংকটে নদীগুলো হাঁসফাঁস করছে। উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা বলা হয় তিস্তা নদীকে। এই তিস্তা পূর্বে অনেক গভীর ছিল। প্রস্থ বর্তমানে যে পরিমাণ তার চেয়ে অনেক কম ছিল। বর্তমানে প্রস্থে বেড়েছে আর কমেছে গভীরতা। অনেক স্থানে সমতল জমির চেয়ে নদীর তলদেশ এখন উঁচু হয়েছে। ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করার কারণে নদীর পানিপ্রবাহ শুষ্ক মৌসুমে আর নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ সরকারও যে নদীটির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করছে তারও নজির নেই। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সেচপ্রকল্প এ নদীর পানিতে। এখন পানির অভাবে সেই সেচপ্রকল্প আর ঠিকমতো চলছে না।

করতোয়া নামের একটি নদী নীলফামারীর সৈয়দপুরে বাঙালিপুর ইউনিয়নের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অনুমান করা হয় এটি হচ্ছে আদি করতোয়ার শেষ চিহ্ন। এখনো এই করতোয়ায় পূজা দেওয়া হয়।

আউলিয়াখান নদী এক সময় অনেক বড় নদী ছিল। এই নদীর বর্তমান অবস্থা খুবই করুণ। খড়খড়িয়া নামের নদীটি সৈয়দপুর পৌরশহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ নদীটির অবস্থা খুবই খারাপ। নদীর দু’পাশ ক্রমে দখলের হাতে চলে যাচ্ছে। যেটুকু প্রবাহ আছে সেটুকুও চরম দূষণের শিকার। এ নদীর পানি এখন চরম দুর্গন্ধযুক্ত।

নীলফামারী জেলা শহর গড়ে উঠেছে বামনডাঙা নদীর পাড়ে। এ নদীর তীরে শাখামাছা নামের বিশাল বন্দর গড়ে ছিল। বর্তমানে বন্দরটিকে বড় বাজার বলে উল্লেখ করা হয়। আজ এ নদীটি চরম দখলের শিকার। নদীটির পাশে দাঁড়ালে মনটাই খারাপ হয়ে যায়। দখল-দূষণে এ নদীটির প্রাণ ওষ্ঠাগত।

দেওনাই নামের একটি বড় নদী আছে। এই নদীর একটি শাখা নদী আছে। শাখা নদীটিও দেওনাই নামে পরিচিত। সে কারণে যে দুটি ইউনিয়েনের ভেতর শাখা নদীটি গেছে সে দুটি ইউনিয়নের নাম যুক্ত করে বলা হচ্ছে দেওনাই (হরিণচড়া-লক্ষ্মীচাপ)। এ নদীটি ডোমার উপজেলা এবং নীলফামারী সদর উপজেলাকে আলাদা করেছে। নদীটি একটি দখলদার চক্রের হাতে প্রায় চলেই গিয়েছিল। স্থানীয় ব্যক্তিরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। আমি সেখানে গিয়ে দেওনাই (হরিণচড়া-লক্ষ্মীচাপ) সুরক্ষা কমিটি করে দিয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় জনগণের অগ্রণী ভূমিকায় আমরা এ নদীটি দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছি।

স্বরমঙলা নামের একটি বড় নদী নীলফামারীর সৈয়দপুর বাসস্টান্ডের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো। এখনো স্থানীয়দের কাছে এ নদীর যৌবনের রূপ সম্পর্কে শোনা যায়। উন্নয়নের চাপে পড়ে এ নদীটিও হাঁসফাঁস করছে। বাসস্টান্ড থেকে কয়েকগজ পূর্বে তাকালে দেখা যাবে এটি ছোট সেতুর রেলিং আছে। কিন্তু নদী দেখা যাবে না। সেতু বরাবর ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। আরেকটু ভাটিতে গেলের দেখা যাবে অনেক অট্টালিকা গড়ে উঠেছে এ নদীর বুকে। আরও ভাটিতে গেলে এ নদীটির কিছু চেহারা চোখে পড়বে।

ঘাঘট নামের যে নদীটি রংপুর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গাইবান্ধার শহর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় মিলিত হয়েছে, এ নদীটি ছিল বিশালকায়। দিনের পর দিন এ নদীর প্রস্থ কমে আসছে। নদীটি ছিল তিস্তার শাখা নদী। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় যে যেখান থেকে নদীটি শুরু হয়েছে সেই উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পূর্বে আউলিয়াখান নদীর পানি গিয়ে মিলিত হতো তিস্তায় সেই মুখও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন আউলিয়াখান নদীর পানি এসে পড়ে ঘাঘট নদে। তিস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে ঘাঘট নদীর পানি প্রবাহ কমেছে। নেংটি ছেঁড়া নদীটি রংপুর-সৈয়দপুর মহাসড়কের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি এক সময় বিপুল পানির প্রবাহ নিয়ে প্রবাহিত হলেও বর্তমানে সরু খাল সদৃশ হয়েছে।

নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে কয়েকটি আন্তঃসীমান্তীয় নদী প্রবাহিত হয়েছে। তিস্তা, বুড়িতিস্তা, দেওনাই হচ্ছে আন্তঃসীমান্তীয় নদী। নীলফামারী জেলা কয়েকটি নদী ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে খনন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু কোনোটি বিজ্ঞানসম্মতভাবে খনন করা হচ্ছে না। বর্তমান সরকার নদী রক্ষায় বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করছে।
আমরা আশা করব, সরকারি তালিকায় থাকুক আর নাই থাকুক যে নদীগুলো পুরোনো দলিলে নদী হিসেবে উল্লেখ আছে সেগুলোকে সরকার তালিকাভুক্ত করবে। এমনকি কোনো নদী যদি পুরনো কাগজে নদী হিসেবে নাও থাকে বাস্তবে নদী হিসেবে থাকে সেগুলোকেও নদীর তালিকায় যুক্ত করবে। এভাবে নদীগুলোকে রক্ষায় সরকার কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। জেলা এবং উপজেলা নদী রক্ষা কমিটিগুলোও নদী রক্ষা অগ্রণী ভূমিকা পালন করলে নদী রক্ষা অনেকটা সহজ হবে। ২০১৯ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন দেশে সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে রায় প্রদান করেছেন। নদী দখল করাকে ফৌজদারি অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর অভিভাবক ঘোষণা করেছে। আমরা মনে করি, এই রায়ও নদীয় রক্ষায় অনেক বড় ভূমিকা পালন করবে।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : সহযোগী অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
রংপুর ও পরিচালক রিভারাইন পিপল
wadudtuhin@gmail.com