মৃত্যু ডেকে আনছে পার্থেনিয়াম

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬

মৃত্যু ডেকে আনছে পার্থেনিয়াম

আলম শাইন ৯:১৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৯

print
মৃত্যু ডেকে আনছে পার্থেনিয়াম

পার্থেনিয়াম একটি উদ্ভিদ; একটি আগাছার নাম। এটি অন্য দশটি উদ্ভিদের মতো নয়, যে কোনো প্রতিকূল পরিবেশে বাঁচতে সক্ষম আগাছাটি। বিশেষ করে ফসলের ক্ষেত কিংবা রাস্তার ধারে জন্মে। আগাছাটিকে বেঁচে থাকতে হলে কোনো ধরনের যত্নআত্তির প্রয়োজন পড়ে না। খুব সহজেই প্রকৃতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এটি আমাদের দেশের নিজস্ব উদ্ভিদ নয়, এসেছে মেক্সিকো থেকে। ছড়িয়ে পড়েছে গোটা উপমহাদেশে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, চীন, পাকিস্তান, নেপাল ও ভারতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সুবাদে আমাদের দেশেও এসেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলার রাস্তার দু’ধারে বেশি নজরে পড়ছে। এ ছাড়াও দেশের অন্যান্য জেলায় কমবেশি দেখা যাচ্ছে। তবে এখনো ফসলের ক্ষেতে দেখা যায়নি। এটি ছড়িয়েছে কয়েকভাবেই। গরুর গোবর, গাড়ির চাকার সঙ্গে লেপ্টে, সেচের মাধ্যমে এবং জুতার তলার কাদার সঙ্গে লেপ্টে ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়েছে বাতাসের মাধ্যমেও। অনেকের ধারণা এর বীজ গমের মাধ্যমে আমাদের দেশে এসেছে।

এ গাছ সাধারণত এক থেকে দেড় মিটার উচ্চতার হয়। অসংখ্য শাখা; ত্রিভূজের মতো ছড়িয়ে থাকে। ছোট ছোট সাদা ফুল হয়। ঠিক যেন ধনিয়া গাছের ফুল। হঠাৎ করে দেখলে যে কেউ ভুল করবেন ধনিয়া ভেবে। গাছটির আয়ুষ্কাল মাত্র তিন-চারমাস। আয়ুষ্কালের মধ্যে তিনবার ফুল ও বীজ দেয় গাছটি। ফুল সাধারণত গোলাকার, সাদা, পিচ্ছিল হয়। এ গাছ তিন-চারমাসের মধ্যে চার থেকে পঁচিশ হাজার বীজের জন্ম দিতে সক্ষম।

এ আগাছাটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। গবাদিপশু চরানোর সময় গায়ে লাগলে পশুর শরীর ফুলে যায়। এ ছাড়াও তীব্র জ্বর, বদহজমসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। আর পশুর পেটে গেলে কেমন বিষক্রিয়া হতে পারে তা অনুমেয়। বিশেষ করে গাভী পার্থেনিয়াম খেলে দুধ তিতা হয়ে যায়। ওই দুধ অনবরত কেউ খেলে সে লোকের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।

শুধু পশুই নয়, আগাছাটি মানুষের হাতে পায়ে লাগলে চুলকে চুলকে লাল হয়ে ফুলে যায়। পাশাপাশি ত্বকে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। আক্রান্ত মানুষটি ঘনঘন জ্বর, অসহ্য মাথাব্যাথা ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগতে থাকে। এমনকি মারাও যেতে পারে। ভারতের পুনেতে পার্থনিয়ামজনিত বিষক্রিয়ায় ১২জন মানুষ মারা যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে পর্যন্ত। এতসব ভয়ঙ্কর বিষয়াদি জানতে পেরে পরিবেশবিদরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। আতঙ্কিত হয়েছেন কৃষিবিদরাও।

কৃষিবিদরা এ আগাছা নিয়ে বেশ শঙ্কিত। তারা এটিকে বিষাক্ত আগাছা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এটি শুধু বিষাক্তই নয়; যে কোনো ধরনের ফসলের ব্যাপক ক্ষতিও করে। প্রায় চল্লিশ থেকে নব্বই শতাংশ ফসল কম ফলে যদি কোনো ক্ষেতে পার্থেনিয়াম থাকে। ইত্যাদি সব ক্ষতিকর দিকগুলো পর্যালোচনা করে কৃষিবিদরা গাছটিতে পুড়িয়ে ফেলতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

যেমন: এটি কেউ কাটতে গেলে ব্যক্তির হাতে-পায়ে লাগতে পারে। পোড়াতে গেলে ফুলের রেণু দূরে উড়ে বংশবিস্তার ঘটাতে পারে। আবার ব্যক্তির নাকে, মুখেও লাগতে পারে। তাতে করে তিনি মারাত্মক বিষক্রিয়ায় পড়তে পারেন। এ ক্ষেত্রে খুব সতর্কতার সঙ্গে প্রথমে গাছটিকে কাটতে হবে। হাতে গ্লাভস, চোখে চশমা থাকলে ভালো হয়। পা ভালো মতো ঢেকে রাখতে হবে। মোটা কাপড়ের প্যান্টের সঙ্গে বুটজুতা পরা যেতে পারে, সঙ্গে মোটা কাপড়ের জামাও পরতে হবে।

গাছকাটা হলে গভীর গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে। এ ছাড়াও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আগাছা নাশক ব্যবহার করে এ গাছ দমন করা যায়। সেক্ষেত্রে ডায়ইউরোন, টারবাসিল, ব্রোমাসিল আধাকেজি পাঁচশো লিটার পানিতে মিশিয়ে হেক্টর প্রতি প্রয়োগ করতে হবে। আবার প্রতি হেক্টরে দুই কেজি ২.৪ সোডিয়াম লবণ অথবা এমসিপি চারশো লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করেও এ আগাছা দমন করা যেতে পারে।

সবচেয়ে ভালো হচ্ছে জৈবিক প্রক্রিয়ায় দমন করলে। তাতে করে ক্ষতির সমূহ সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই পদ্ধতিতে নানা ধরনের পাতাখেকো অথবা ঘাসখেকো পোকার মাধ্যমে পার্থেনিয়াম দমন করা সম্ভব।

তবে সুখবরটি হচ্ছে আমাদের দেশে এখনো পার্থেনিয়ামের বিষক্রিয়ায় কেউ আক্রান্ত হননি। গবাদি পশুর ব্যাপারেও সে ধরনের উদ্বেগজনক খবর আমাদের কানে এসে পৌঁছায়নি। কাজেই আমাদের উচিত এখনই সতর্ক হওয়া। যে সব জেলায় পার্থেনিয়ামের সন্ধান পাওয়া গেছে সেখানে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা মাধ্যমে কৃষকদের অবহিত করা এবং গাছ নিধনের জন্য পরামর্শ দেওয়া। তাতে করে এই বিষাক্ত আগাছা থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।

পার্থেনিয়াম সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য রয়েছে, যা না জানালেই নয়। আগাছাটি মানুষ এবং গবাদি পশুর যেমন ক্ষতি করে তেমনি আবার উপকারও করে। এর রয়েছে কিছু ওষুধি গুণ। এই আগাছা থেকে মানুষের প্রচণ্ড জ্বর, বদহজম, টিউমার, আমাশয়সহ নানা ধরনের জটিল রোগের প্রতিষেধক তৈরি হচ্ছে। এমনকি গবেষকরা মরণব্যাধি ক্যান্সারেরও প্রতিষেক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি উপকার কিংবা অপকার দুটিতে সক্ষম পার্থেনিয়াম। তাই বলে যত্রতত্র এ আগাছার বংশ বিস্তার কারও কাম্য নয়।

ওষুধের প্রয়োজনে সংরক্ষিত এলাকায় এটি চাষাবাদ হতে পারে কিন্তু সেটি আমাদের দেশের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। সুতরাং আমরা এটিকে নিধন করাই শ্রেয় মনে করি। আমাদের কৃষকদেরও সেই পরামর্শ দিব আমরা। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে কাউন্সিলিং করতে হবে ব্যাপকভাবে। তবে পার্থেনিয়াম থেকে রেহাই পাওয়া যাবে; অন্যথায় এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে আমাদের দেশে। যেমনি ছড়িয়েছে ব্রাজিল থেকে আগত কচুরিপানা। যেটি এখন দেশের সমস্ত জলাশয় গ্রাস করে নিয়েছে। সুতরাং আমরা পার্থেনিয়াম নিয়ে ভাবি, না হলে এডিস মশার মতো এর বিস্তার দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তখন সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

উদহারণটি হচ্ছে, আগাছাটি নিয়ে কৃষিবিদরা কড়াকড়িভাবে সতর্কতা জারি করা সত্ত্বেও এই বিষাক্ত উদ্ভিদের ফুল দেশের বিভিন্ন দোকানে বিক্রির খবর আমরা জানতে পেরেছি। মারাত্মক ফুলটি সম্পর্কে না জেনেই দোকানি বিক্রির জন্য সাজিয়ে রেখেছেন। আর ক্রেতাও না জেনে সেই ফুল কিনে মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করছেন। কাজেই এখনই সতর্ক হতে হবে আমাদের। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে পার্থেনিয়াম চেনাতে হবে আমজনতাকে। নচেৎ এক সময় আয়ত্তের বাইরে চলে গেলে মহামারীর দিকে মোড় নেবে। কাজেই আমরা সাবধান হই!

আলম শাইন : কথাসাহিত্যিক
কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ
alamshine@gmail.com