ভারী ধাতুর দূষণ বন্ধ করুন

ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ২ আশ্বিন ১৪২৬

ভারী ধাতুর দূষণ বন্ধ করুন

মোতাহার হোসেন ৯:০৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০১৯

print
ভারী ধাতুর দূষণ বন্ধ করুন

মাটি দূষণের ফলে কৃষি জমিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব হচ্ছে মূলত দেশের শিল্পাঞ্চলের নিকটস্থ জমিতে। এ রকম বিস্তারিত তথ্য উপাত্ত দিয়ে বাস্তবে ফসলি জমির মাটি দূষণের ভয়ানক চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায়।

সম্প্রতি এ ধরনের তথ্য উপাত্ত দিয়ে একাধিক পত্রিকায় খবরও প্রকাশিত হয়েছে। খবরে বলা হয়, সাভারে ইপিজেড এলাকার আশপাশে কৃষি জমিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে সর্বনিম্ন সাড়ে আটগুণ ও সর্বোচ্চ ৩৮গুণ বেশি মাত্রায় কোবাল্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ক্রোমিয়ামের সর্বোচ্চ মাত্রা পাওয়া যায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১১২ গুণ বেশি।

একইভাবে পাওয়া যায় উচ্চমাত্রার টিটেনিয়াম, ভেনাডিয়ামসহ ১১টি ভারী ধাতু। এসবের মধ্যে আছে কোবাল্টসহ একাধিক তেজস্ক্রিয় রাসায়নিক উপাদানও। পাশাপাশি শিল্প বর্জ্য নিকটস্থ জমিতে গেলে তা মাটিকে করে দূষিত। গবেষণা প্রতিবেদনটি এরই মধ্যে বিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নালেও প্রকাশিত হয়েছে।

বিষয়টির যদি ব্যাখ্যা ও বৈজ্ঞানিক সত্যতা থাকে তাহলে তা কীভাবে এড়ানো যায় সে নিয়ে আমাদের বিজ্ঞানীদের ভাবতে হবে এখন থেকেই। ফসলি জমিতে ভারী ধাতুর মিশ্রণে সৃষ্ট দূষণে ধানে যেমন ক্ষতিকর উপাদান মিশে যায় তেমনি তা মানবদেহের জন্যও ক্ষতি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের একজন খ্যাতিমান শিক্ষক বলেন, ২০১৫-১৬ সালে এই গবেষণা করা হয়েছিল, যা ২০১৭ সালে এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ইকোলজি রিসার্চে প্রকাশিত হয়। এটি একটি বিশ্বমানের গবেষণা বলেই স্বীকৃত হয়েছে। ওই গবেষক বলেন, মাটিতে বিপজ্জনক মাত্রায় কোবাল্ট, টিটেনিয়াম, ক্রোমিয়াম খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের জন্য বড় ধরনের হুমকি। শিল্পবর্জ্য উপযুক্ত মাত্রায় পরিশোধন ও ব্যবস্থাপনা না করার ফলেই সেগুলো বাইরে চলে এসে মাটি, পানি ও বাতাসসহ সব কিছু দূষিত করে ফেলছে।

এ সংক্রান্ত গবেষকদলের আরেক সদস্য পরমাণু শক্তি কেন্দ্র ঢাকার গবেষক রাজেদা খাতুনের অভিমত হচ্ছে- ‘আমরা দেখতে চেয়েছিলাম মাটিতে শিল্পবর্জ্যরে প্রভাব কেমন। তা খুঁজতে গিয়েই আমাদের গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়ানক কিছু তথ্য চিত্র। এসব মাটিতে হেভি মেটাল দূষণের প্রভাবে তা ফসল হয়ে খাদ্যচক্রে শরীরে ঢুকে মানুষের বিপদ ডেকে আনছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সাভারের যে এলাকায় কাজ করেছি তার আশপাশে অনেক ধরনের কলকারখানা হয়েছে। এসব থেকেই মাটি দূষিত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় ওই সব কলকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মাটি, পানি, পরিবেশ বা জনস্বাস্থ্য কোনো কিছুর জন্যই নিরাপদ নয়।’
গবেষকরা বলছেন, দেশে খাদ্যচক্রে রাসায়নিক দূষণের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের পরও শিল্প-কারখানায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো নিরাপদ পর্যায়ে না আসায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ফসলি জমি হয়ে ফসলজাত খাদ্যে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সহায়তাপুষ্ট ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির একজন উপদেষ্টার অভিমত হচ্ছে, ‘ফসল যেহেতু মাটিতে জম্মায়, তাই সেই মাটি হেভিমেটালে দূষিত হলে তা স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যশস্যে ঢুকবে; এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

ফসলজাত খাদ্য উপাদানে এসব থাকলে সেটা আগুনের তাপেও পুরোপুরি নষ্ট হয় না, বরং মানুষের শরীরে ঢুকে স্বাস্থ্যের নানা রকম বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে অথবা বিপদ ডেকে আনার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে কিডনি, লিভার, মস্তিষ্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ভারী ধাতু। ক্যান্সারের ঝুঁকি তো আছেই। ইন্টারনাল হরাইজন রিসার্চ পাবলিশিং করপোরেশনের এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ইকোলজি রিসার্চে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ঢাকার সাভারের কৃষিজমিতে ভারী ধাতু দূষণের বিষয়টি উঠে আসে। এতে বলা হয়, ৯টি স্থানের মাটির উপরিভাগ ও গভীর থেকে ১৮টি নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়।

ওই পরীক্ষায় মাটির উপরি অংশে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ভারী ধাতু পাওয়া যায়। মাটির গভীরে এর মাত্রা কিছুটা কম। গবেষণাকালে মাটিতে ধাতুর সহনীয় মাত্রা ধরা হয় ক্রোমিয়ামে ১-১০০ পিপিএম, কোবাল্টে ১-৪০ পিপিএম, কপারে ২০-৩০ পিপিএম, ম্যাঙ্গানিজে ৮০-৭০০০ পিপিএম, নিকেলে ৫-৫০০ পিপিএম, জিংকে ১০-৩০০ পিপিএম। পরীক্ষায় ওই এলাকার মাটির উপরিভাগে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ২১২ পিপিএম এবং গভীর অংশে সর্বনিম্ন ৬৮ দশমিক ৮২ পিপিএম। দুই স্তর মিলে গড়ে উপরিভাগে ২৭৫৩ থেকে ৪৫৯৮ পিপিএম আর নিচের স্তরে ১০৩৯ থেকে ১৭৬৩ পিপিএম। কোবাল্ট পাওয়া যায় মাটির উপরিস্তরে সর্বোচ্চ ১৫৮৬ পিপিএম এবং গভীর স্তরে সর্বনিম্ন ৩৪২ পিপিএম। গড়ে উপরি ভাগে ১০২২ পিপিএম এবং নিচের স্তরে ৭০৪ পিপিএম। পরীক্ষায় কপারের দূষণ মাটির উপরি ভাগে পাওয়া না গেলেও নিচের স্তরে এর মাত্রা সর্বোচ্চ ১৩৫৪ পিপিএম পাওয়া যায়। জিংক মাটির নিচের স্তরে পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ৬১০৫ পিপিএম আর উপরি ভাগে সর্বনিম্ন ৩৮ পিপিএম।

নিকেল মাটির উপরি ভাগে পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ২৫৬৬ পিপিএম আর নিচের স্তরে সর্বনিম্ন ১০৮ পিপিএম। ভেনাডিয়াম পাওয়া যায় উপরিস্তরে ২৬৫ পিপিএম এবং নিচের স্তরে ১৯৮ পিপিএম। শুধু ভেনাডিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার মধ্যে পাওয়া যায়। এছাড়া টিটেনিয়াম পাওয়া যায় মাটির উপরিস্তরে ২৯৫৮ থেকে ৮৩৩৫ পিপিএম আর নিচের স্তরে ৪৬৮২ পিপিএম। এর সহনীয় মাত্রা ধরা হয় সাধারণত শূন্য দশমিক ১ থেকে ১০ পিপিএম। ওই গবেষক দলের এক সদস্য বলেন, ‘প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে আমাদের গবেষণাটি হরাইজন রিসার্চ পাবলিশিং করপোরেশনের এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ইকোলজি রিসার্চে প্রকাশিত হয়েছে।

এরপরও এখন পর্যন্ত আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার উদ্যোগ নিচ্ছে না কেউ। কিন্তু এই কাজ মৃত্তিকা সম্পদ বিভাগ, কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নিজস্ব উদ্যোগে গবেষণা করে এর প্রতিকারের উপায় বের করা এখন সময়ের দাবি। অবশ্য আরেকজন গবেষক বলেন, ‘আমাদের গবেষণাটি বাংলাদেশের মাটি, ফসল, পরিবেশ তথা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় একটি সতর্কতার ইঙ্গিত দিয়েছে। সরকারের উচিত এদিকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।’

মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. বিধান কুমার ভান্ডার অভিমত হচ্ছে, ‘ফসলি জমিতে হেভি মেটালের মাত্রা কি আছে না আছে, তা নিয়ে এর আগে আমাদের তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। তবে এ বছরই একটি কার্যক্রম শুরু হয়েছে ছোট আকারে। ওই কাজ শেষ হলে আমরা ফলাফল বুঝতে পারব।’ তিনি আরও বলেন, শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো না হলে তা থেকে মাটি দূষণ ঘটবেই। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, মাটি সুস্থ না থাকলে কৃষিজাত খাদ্যচক্র নিরাপদ থাকবে না, যার ক্ষতিকর প্রভাব জনস্বাস্থ্যে পড়তেই পারে।

আমাদের আশঙ্কা এভাবে মাটির দূষণ অব্যাহত থাকলে তা ধীরে ধীরে বেড়ে মাটিকে মারাত্মকভাবে দূষণ করবে। আর তা হবে একই সঙ্গে কৃষির জন্য, ফসলের জন্য এমনকি মানুষের জন্য মহা অশনিসংকেত। তাই সময় থাকতে মাটির দূষণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় গবেষণা, এর প্রতিকারে শিল্প কারখানায় ইটিপি স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে অনুসরণ করা, মাটির গুণাগুণ রক্ষায় রাসায়সিক সার, কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে জৈব সার, জৈব প্রযুক্তি প্রয়োগ নিশ্চিত করা- এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে।

এসব করা না গেলে মাটি দূষণে কৃষি জমি, ফসলি জমি দূষণ হবে, তখন এই মাটিতে উৎপাদিত ফসল জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে নিশ্চয় এমনটি কারও কাম্য নয়।

মোতাহার হোসেন : সাংবাদিক, কলামনিস্ট
motaherbd123@gmail.com