ডেঙ্গু প্রকোপের প্রতিকার

ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ২ আশ্বিন ১৪২৬

ডেঙ্গু প্রকোপের প্রতিকার

আশেক মাহমুদ ৯:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০১৯

print
ডেঙ্গু প্রকোপের প্রতিকার

ডেঙ্গু এখন ভয়-আতঙ্কের নাম, মহামারীর নাম, মৃত্যুর নাম। কেউ কেউ বলছে, ডেঙ্গু নিয়ে গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রচারণায় বলা হচ্ছে ডেঙ্গু নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। পত্র-পত্রিকা, টিভি ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হচ্ছে ডেঙ্গুর মহামারীর খবর। কেউ কেউ জনপ্রিয় মিডিয়ায় বলছে-অনেক ক্ষেত্রে আতঙ্ক নিজেই মৃত্যুর পথ সৃষ্টি করে, তাই আতঙ্ক থেকে সরে এসে সতর্ক হওয়াই অধিক কাম্য।

আমরা যে যার মতো ভাষার খেলা খেলি না কেন, ডেঙ্গু যে বাস্তব সত্য আর এর প্রকোপ যে বেড়েই চলছে তাতে কারও আপত্তি নেই। রাজনৈতিক ভাষায় ‘গুজব’, প্রচলিত ধর্মীয় ভাষায় ‘গজব’, মিডিয়ার ভাষায় ‘মহামারী’ আর বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষায় ‘মহা-আতঙ্ক’ বলা হলেও ডেঙ্গুর প্রতাপ যে সত্য-এ নিয়ে এখন আর কারও দ্বিমত নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে গত পাঁচ আগস্ট তথ্য দেওয়া হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ২,০৬৫ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ৮৫ জনের অধিক মারা যায় ডেঙ্গুর প্রকোপে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার বরাতে বলে হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকিতে আছে, যার অধিকাংশই গ্রীষ্মম-লীয় দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

এ থেকে স্পষ্ট, সব আতঙ্ক গুজব থেকে আসে না, অনেক আতঙ্কের জন্ম হয় বাস্তবতা থেকে। যেমন ফ্রয়েডের মতে, সেক্সুয়াল টেনশন থেকে আতঙ্ক বা প্যানিকের সৃষ্টি। সে কারণে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের নারী ও কিশোরীরা অতি মাত্রায় প্যানিকে আক্রান্ত থাকে। আরও বড় পরিসরে মনোবিজ্ঞানী ক্লার্ক (১৯৮৬) এই বলে মত প্রকাশ করেন যে, মানুষ যখন জটিল পরিস্থিতির শিকার (Critical event) তখনই মানুষ অতি মাত্রায় প্যানিকে আক্রান্ত হয়। ক্লার্কের মতে, মনের অভ্যন্তরীণ দিক আর বাহ্যিক উদ্দীপক উভয়ই মানুষকে উদ্বিগ্নতার মধ্যে রাখতে পারে। অন্যদিকে বেক ও তার সহযোগীদের (১৯৮৫) গবেষণায় প্রমাণিত হয়, মানুষের মনোজগতে বিরাজিত প্যানিক বা উদ্বিগ্নতার প্রধান কারণ হলো ‘sense of vulnerability’ বা দুরবস্থার অনুভূতি।

এর মানে মানুষ নিজের ও নিজের পরিবার নিয়ে অতি মাত্রায় তখনই আতঙ্কিত থাকে, যখন বুঝতে পারে যে তাদের জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রোগীদের সংখ্যা যত বাড়ছে ততই বাড়ছে আতঙ্ক। ঘরে ঘরে সবাই ভয়ে আতঙ্কে দিন রাত পার করছে-এই চিন্তায় যে কখন কাকে ডেঙ্গু আক্রমণ করে বসে। এই অস্থিরতা থেকে কারও রেহাই নেই। এমনকি, যারা বলছে ডেঙ্গু নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই, তারা আরও বেশি মাত্রায় দুশ্চিন্তায় থাকছে; যারা বলছে অন্য দেশের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা কম, তারা আরও বেশি মাত্রায় আতঙ্কে ভোগে, এমনকি দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি দেয়। কিন্তু বাস্তবতা উদ্ভূত আতঙ্ক কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইতিবাচক হতে পারে, কেননা এতে সাবধানতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আর তাই ডেঙ্গু নিয়ে কথা চালাচালি আর কথার মারপ্যাঁচে না গিয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কেন বাড়ছে আর কি করে জনগণকে এর প্রকোপ থেকে রেহাই দেওয়া যায় সে চিন্তা করতে হবে সবার আগে।

বিপদ ও সতর্কতা-১
স্বল্প পরিসরে জমানো পানি ডেঙ্গুর উৎস। লন্ডনের এক গবেষণা থেকে প্রকাশ করা হয়, বাংলাদেশে চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত গর্তগুলোতে জমে থাকা পানি ছিল ডেঙ্গু বিস্তারের প্রধান উৎস। সবাই দেখেছে মেট্রো রেলের কাজ করতে গিয়ে গর্তগুলোতে কীভাবে পানি জমা থাকত, এ নিয়ে কারও কোনো ভাবনাই ছিল না। পর্যাপ্ত মনিটরিং এর ব্যবস্থা থাকলে এমনি হতো না। বিজ্ঞানভিত্তিক মনিটরিং এ ক্ষেত্রে খুবই জরুরি।

বিপদ ও সতর্কতা-২
সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তায় রাস্তায় পানি জমে থাকে। পিচ ঢালা রাস্তাগুলোতে ছোট ছোট গর্ত সবারই চোখে পড়ে। এমনকি বৃষ্টি হলে সম্পূর্ণ পানি অপসারণের উপযোগী করে রাস্তা নির্মাণ করা হয় খুব কমই। সামান্য বৃষ্টিতেই যদি রাস্তায় রাস্তায় পানি জমা থাকে, সেখান থেকে ডেঙ্গুর লার্ভা বিস্তার লাভ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে দিকে লক্ষ্য না রেখে শুধু বাসা বাড়িকে দায়ী করা হবে অযৌক্তিক। আর রাস্তাঘাটের এ জীর্ণদশার জন্য প্রধান দায়ী হলো সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতি। দুর্নীতির মাত্রাধিক্যের জন্য নিম্নমানের সড়ক, নিম্নমানের সংস্কার। এ কারণে বৃষ্টির পানি রাস্তায় রাস্তায় জমে থাকছে, যা ডেঙ্গুর প্রকোপের জন্য অনেকাংশে দায়ী। সড়কের এই দুর্নীতির প্রকোপ না কমলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কি করে কমবে?

বিপদ ও সতর্কতা-৩
আমরা সাধারণ জনগণ বা নগরবাসী স্বভাবজাত কারণে অসতর্ক ও অপরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করি। এর পরিণতি আমাদেরই দেখতে হয়। আমরা নিজেরাই সাবধান থাকতে চাই না। আমরা জানতে চাই না বুঝতে চাই না কীভাবে ভালো থাকতে হয়, ভালো রাখতে হয়। বাসা বাড়িতে যেখানে সেখানে জমানো পানি দেখলেও তা সরানোকে বাড়তি ঝামেলা মনে করি। সে কারণে এডিস মশা আমাদের আরও ঝামেলায় ফেলে দেয়। তাই নিজেদের সতর্কতাকে গুরুত্বহীন করা মানে নির্বুদ্ধিতা।

বিপদ ও সতর্কতা-৪
প্রাথমিকভাবে ডেঙ্গুর লক্ষণ বোঝা মাত্রই ডাক্তারি চেকআপ করে নেওয়া দরকার। অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও রক্তের প্লাটিলেট টেস্ট করা উচিত। কেননা প্লাটিলেট স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম হলে তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্লাটিলেট বাড়াতে তাই ডাক্তারের পরামর্শ মতো খাবার গ্রহণ জরুরি।

বিপদ ও সতর্কতা-৫
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো ডেংভেক্সিয়া নামে একটি ভ্যাক্সিনের অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদনপ্রাপ্ত ভ্যাক্সিনটি ৯ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের মধ্যে চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসই প্রতিরোধ করবে। দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে এর ব্যবহার শুরু করতে হয়, তবে প্রথমবার আক্রান্ত হলে এটি ব্যবহার করা যায় না। আরও কয়েকটি প্রতিষেধক আরও কিছু দেশ থেকে আসছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অর্জনকে কাজে লাগাতে হবে অবশ্যই। তবে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো এসব ভ্যাক্সিনের যেন অপব্যবসা না হয় সে দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের সতর্ক থাকতে হবে।

বিপদ ও সতর্কতা-৬
ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতার জন্য অনেকেই যেভাবে ঝাড়ু দেওয়া আর পরিষ্কারের মহড়া দেখিয়েছে তা নাগরিকদের মধ্যে কোনো ইতিবাচক ফল দিয়েছে বলে মনে হয় না। অনেকেই এসব আয়োজনকে হাস্যকর ও তামাশা নামে অভিহিত করেছে। এসবের মধ্যে লোক দেখানোর মানসিকতা থাকে, এটা সবাই বুঝতে পারে। সবচেয়ে জরুরি হল সিটি করপোরেশনকে আধুনিকায়ন ও গতিশীল করা আর দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল করা।

জনগণ এমন প্রশাসন দেখতে চায় যাদের গতিশীল কর্মকাণ্ড দেখে জনতা আশ্বস্ত হবে। প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনহিতকর উদ্যোগই আতঙ্ক কমিয়ে দিতে পারে, কমিয়ে আনতে পারে ডেঙ্গুর মতো প্রকোপের মাত্রা ও মৃত্যুর সংখ্যা। আসলে সেবকের কাজ সেবা করা, আত্মপ্রচারণা নয়। সেবকের সেবাপরায়ণতা পারে গণমানুষকে স্বস্তি দিতে।

আশেক মাহমুদ : সহকারী অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ashmahmud@gmail.com