বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ

ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ২ আশ্বিন ১৪২৬

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ

জাহাঙ্গীর আলম সরকার ৮:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০১৯

print
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ

মুক্তিযুদ্ধের সময় সমগ্র ভারতে সহস্রাধিক শরণার্থী শিবির খোলা হয়েছিল। প্রায় এক কোটি মানুষ দেশান্তরিত হয়, আশ্রয় নেয় সীমান্তবর্তী চার ভারতীয় রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ের মাটি ও মানুষ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। শুধু তাই নয় বরং এ রাজ্যগুলো অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়ে আরেক ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতার রক্তাক্ত যুদ্ধে। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি অন্যতম প্রধান রাজ্য। এ রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের হাজার বছরের সম্পর্ক। ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, কালচারে এক ও অভিন্ন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মানুষ। দেশভাগের পর অখণ্ড বাংলা খণ্ডিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য একাত্তর সালে হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম পরিচালনার জন্য একটি ছোট্ট বাংলাদেশের প্রতীক। এ রাজ্যের মানুষের ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রকাশ প্রবহমান নদীর স্রোতের মতোই চিরন্তন। একাত্তরে সে প্রমাণ আমরা পেয়েছি। দেশ ভাগের পর কাঁটাতারের কারণে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও দুই অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসা ফুরিয়ে যায়নি। একাত্তরে যখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পাকসেনাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন থেকে জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মাটিতে পা রাখেন, তখন সেখানকার মানুষ তাদের পরম মমতায় আগলে রাখেন। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের অবদান বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা পেতে পারি।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট সীমান্ত ৪০৯৬ কিলোমিটার। এটি পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সীমান্ত। এর মধ্যে ২২১৭ কিলোমিটার শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে। সে কারণে বর্বর পাকিস্তানি সেনা অভিযানে দেশত্যাগীদের সিংহভাগ ঢুকে পড়ে পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যটির আয়তন ৮৮ হাজার ৭৫২ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বিভিন্ন রাজ্যে সর্বমোট ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন শরণার্থী প্রবেশ করে। এদের মধ্যে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করে ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৪ জন। এই পরিসংখ্যানের বাইরেও বিপুলসংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় লাভ করে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে।

দীর্ঘ ২৩ বছরের সামরিক এবং ধর্মতান্ত্রিক নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে বাঙালি জনতার সংগ্রাম ঘটে একাত্তর সালে। অনিবার্যভাবে শুরু হয় ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ধ্বংসযজ্ঞ ও লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। একই সঙ্গে একাত্তর সাল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবের।

মুক্তিযুদ্ধের সব কর্মকাণ্ড যদিও পরিচালিত হয়েছে পূর্ববঙ্গ, সাবেক পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মাটিতে তথাপিও যুদ্ধ কর্মকাণ্ডের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে সীমান্তবর্তী ভারতের ভূখণ্ডে সেখানকার সরকার ও সর্বস্তরের মানুষের সার্বিক সহযোগিতায়। পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যদের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও বর্বর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের মাটিতে যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সর্বাধিক শরণার্থী বিপর্যয়। এ ঐতিহাসিক ঘটনাবর্তে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত সরকার এবং সেই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষ ও দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর অবদান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার একদিকে আশ্রয় দিয়েছিল শরণার্থীদের। অন্যদিকে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানগুলো পরিণত হয়েছিল মুক্তিফৌজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। একাত্তরে এ রাজ্যের শরণার্থী শিবিরে অক্সফাম জিবি শরণার্থীদের সহায়তায় দিন-রাত কাজ করেছেন। যুক্তরাজ্যের অক্সফাম রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বিমানে পশ্চিমবঙ্গ রেডক্রসকে ১৬১৮ প্যাকেটে ওষুধ, ভ্যাকসিন ও অন্যান্য জিনিস পত্র পাঠিয়েছিল। জাপান এয়ার লাইনসের একটি বিমানে পশ্চিম জার্মানি থেকে ভারতীয় রেডক্রসকে ২০ প্যাকেট প্রাথমিক সাহায্য পাঠিয়েছিল। সুইজারল্যান্ডের সুইজ রেডক্রস ১৫০ কার্টনে বেবি ফুড পাঠিয়েছিল ভারতীয় রেডক্রসকে। অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৮ প্যাকেট ওষুধ এবং বিওএসির একটি বিমানে ৩৩ প্যাকেট কলেরা ভ্যাকসিন এসেছিল। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি বিমানে ২১০ কার্টনে বিভিন্ন রকমের সাহায্য-সামগ্রী এসেছিল। লন্ডন ওয়ার-জন ওয়াল্টের পক্ষ থেকে ১৪৭ প্যাকেট টিনের খাদ্য এসেছিল। এছাড়া লুফথানসা বিমানে পশ্চিম জার্মানি থেকেও শরণার্থী শিবিরের জন্য সাহায্য-সামগ্রী এসেছিল।

একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর দমননীতির বিরুদ্ধে মুক্তিপাগল জনতার মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে নিত্যদিন মিছিল-মিটিংয়ে মুখর ছিল পশ্চিমবঙ্গ। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের স্বীকৃতির দাবিতেও পশ্চিমবঙ্গের মানুষজন সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিল। প্রতিদিন দলে দলে নারী-পুরুষ কেউ-বা মাথায় একটি পুটলি নিয়ে শরণার্থী হয়ে চলে এসেছিলেন এ রাজ্যে। এসব মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও অন্নের সংস্থান করার বিষয়টি ছিল রীতিমতো একটি চ্যালেঞ্জ। গড়ে প্রতিদিন চল্লিশ হাজার শরণার্থী প্রবেশ করেছে ভারতে।

প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ১৬ মে ১৯৭১ সালে বাগডোগরা এয়ারপোর্টে নেমে সেখান থেকে হলদিবাড়ি ও দেওয়ানগঞ্জ শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। তিনি শরণার্থীদের বলেন যে, ভারত গরিব দেশ এবং ভারতের লোকরাও গরিব; তবুও ভারত সাধ্যমতো এই শরণার্থীদের সেবা করবে। তৎকালে হলদিবাড়ি শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী ওই কথাগুলো উচ্চারণ করেন। শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রধানমন্ত্রী খুব সংক্ষিপ্ত আকারে বক্তৃতা করেন। কিন্তু তার বক্তৃতায় কোনো বাহুল্য ছিল না। তিনি শরণার্থীদের একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেন না, তারা ভারতের বহু সমস্যার মধ্যে আর একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছেন; তবুও ভারত এটাকে আপনজনের ব্যাপার বলে মনে করছে।

মার্কিন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের পর ওয়াশিংটনে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার ৩০০ শিশু মারা যাচ্ছে। তিনি ছিলেন সিনেটের শরণার্থী সংক্রান্ত জুডিসিয়ারি সাব-কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, নতুন বৈদেশিক সাহায্য বিলে কংগ্রেস যদি কোনো অর্থ মঞ্জুর না করে তবে তিনি শরণার্থীদের জন্য ২৫ কোটি ডলার মঞ্জুরির জন্য একটি বিল পেশ করবেন।

শরণার্থী শিবিরে বিবর্ণ মুখ দেখে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ চুপ করে বসে থাকেনি বরং যে যার অবস্থান থেকে সর্বত্রভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। কর্মীরা প্রায় প্রতিটি প্রশিক্ষণ শিবির ও শরণার্থী শিবিরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্টে একাকার হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষগুলো ত্রাণসামগ্রী, কাপড় ও চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু করেন। সুনামির ঢেউয়ের মতোই সাধারণ মানুষের স্রোত পশ্চিমবঙ্গে আছড়ে পড়লেও সেখানকার অধিবাসীরা হাল ছেড়ে দেননি। সার্বিক অবস্থা দেখে শরণার্থী সাহায্যে রাষ্ট্রসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উ-থান্ট শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান।

একদিকে পশ্চিম পাকিস্তানি ঘাতক সামরিক সরকার, অন্যদিকে মুক্তিকামী জনতা। যাই হোক, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র। কেউ কেউ ডাক্তারের পাশে থেকে শরণার্থীদের সেবা-শুশ্রুষায় নিয়োজিত হয়ে যায়। এভাবেই কেউ ধাত্রী প্রশিক্ষণ, নার্স প্রশিক্ষণ নিয়ে শরণার্থী শিবিরে কাজ করেছেন অবিরত। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মাস কয়েকের মধ্যে এ সব অঞ্চলে হাজার হাজার শরণার্থী এসে অবস্থান করলে এক অমানবিক অবস্থার জন্ম নেয়। উল্লিখিত অঞ্চলের ভূমিপুত্ররা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বসবাসের স্থান দেওয়ার পাশাপাশি খাবারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

একাত্তরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে যারা শরণার্থী শিবিরে দিনভর কাজ করতেন। সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একাত্তর সালে পশ্চিমবঙ্গ পরিণত হয়েছিল হাজার হাজার শরণার্থীদের শেষ আশ্রয়স্থল। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি ধনী, গরিব ও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। এ অবদান নগণ্য নয় বরং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য।

একাত্তরে পশ্চিমবঙ্গ আভাস দিয়েছিল সীমান্তের ওপারের মানুষ এবং এপাড়ের মানুষগুলোর সঙ্গে একাত্মতার। এ আভাস মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিভিন্ন রসদ জোগান দিয়েছিল সেটি শুধু মুক্তিসেনাদের উৎসাহিত করেনি বরং তাদের বাহুতে নতুন করে বল সংযোজিত হয়েছিল। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় বরং ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত রসদ পাঠানো হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী শিবিরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, আহতদের রক্তদানের ব্যবস্থা করতে কোনো প্রকার কাল বিলম্ব করা হয়নি। শুরুর দিকে একটু কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে শরণার্থীদের জন্য সুসময় আসতে থাকে। প্রতিটি শরণার্থীকে কলেরা ভ্যাকসিন, মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট, দুধ এবং সবচেয়ে বড় যেটা দু’বেলা পেটপুরে ভাতের জোগান দেওয়া হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরের মানুষ তথা রাজনীতিবিদ, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী, গৃহিণী, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ শ্রমজীবী যারা ইতিহাসের যুগ-সন্ধিক্ষণে নিজেদের আবেগ ও যুক্তিতে বরণ করে নিয়েছিলেন এক কোটি শরণার্থী। একাত্ম হয়েছিলেন পরম বন্ধু হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাতারে।

নিজেদের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা বিবর্ণ মুখগুলোর জন্য পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে বাংলাদেশের মাটি, রচিত হয়েছে আরেক অমোচনীয় ইতিহাস। এসব ঘটনাবর্তে মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরের মানুষের অবদান বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কখনো ওষুধ, কখনো খাদ্য কিংবা কখনো সেবার মাধ্যমে বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যে ঋণের জালে আবদ্ধ করেছে, তা বোধ করি কোনো দিন ভুলতে পারবে না বাংলাদেশের মানুষ।

জাহাঙ্গীর আলম সরকার : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক।
advsagar29@gmail.com