শ্যামাসুন্দরী নদীকে মারছে কারা?

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

বাঁচায় নদী, বাঁচাও নদী-৫১

শ্যামাসুন্দরী নদীকে মারছে কারা?

ড. তুহিন ওয়াদুদ ৯:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০১৯

print
শ্যামাসুন্দরী নদীকে মারছে কারা?

বাংলাদেশ সরকার যখন দেশের সব নদীর প্রাণপ্রবাহ ফেরানোর কাজে মনোযোগী হয়েছে তখনো রংপুর শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা শ্যামাসুন্দরী নদী নিয়ে আমাদের ভাবতে হয়, এ নদী মরে যাবে নাকি বাঁচবে? নদীর প্রতি মানুষ কতটা নির্মম আর অবহেলা প্রদর্শন করতে পারে শ্যামাসুন্দরীর প্রতি না তাকালে বলা কঠিন। রংপুর শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে শ্যামাসুন্দরী। নদীটি ঘাঘট নদের শাখা নদী এবং খোকসা ঘাঘট নদের উপনদী।

আজ থেকে মাত্র ২০ বছর আগেও এ নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ। মাছ ধরে খেতেন অনেকেই। অনেক প্রবীণই জানিয়েছেন তারা এ নদীতে নৌকা চলতে দেখেছেন। একজন প্রবীণ এ কথাও জানিয়েছেন এক সময় এ নদীর পানি পান করা হতো। সারাদিন এ নদীতে শিশু কিশোররা সাঁতার কাটত। কুড়ি বছর আগের এ নদীর সঙ্গে বর্তমান এ নদীর তুলনা করলে আগের নদীর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।

কুড়ি বছর আগে জলের প্রকৃত রংটাই ছিল। এখন জলের রং আর নেই। কালো কুচকুচে। নোংরা। কুড়ি বছর আগে এ নদীর পাশে মানুষের একটুখানি দাঁড়াতে ইচ্ছে করত। আর আজ এ নদীর জলের দুর্গন্ধে দাঁড়ানো যায় না। নাকের সামান্য অনুভূতিও যাদের আছে তারা নদী এলাকা পার হওয়ার সময় নাকে হাত দিয়ে পার হন। যারা এ নদীকে ৫০-৬০ বছর থেকে দেখে আসছেন তাদের ভাষ্যে নদীর যে প্রস্থগত আকৃতির খবর পাওয়া যায় এখন আর সেই অবস্থা নেই।

প্রশ্ন হলো, কেন হচ্ছে এই অবস্থা? এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের কি কোনো উপায় নেই? প্রথমেই আসা যাক নদীতে পানির প্রকৃত রঙের প্রবাহ ফেরানো যাবে কিনা সে বিষয়ে। এ নদীর যে পানি তা আসে বৃষ্টি থেকে, ঘাঘট নদ থেকে। বৃষ্টির পানিও নোংরা নয়, ঘাঘটের পানিও নোংরা নয়। তাহলে প্রথমেই আমাদের নোংরা পানি যাতে শ্যামাসুন্দরীতে না আসে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। শ্যামাসুন্দরীর নোংরা পানি বন্ধ করার জন্য বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

এই নদীর পানি দূষিত করার কাজ কারা করছে এটি কারও অজানা নয়। শহরে যারা চলেন তারা যে স্থানে শ্যামাসুন্দরী পাশ দিয়ে চলেন তারা নাক বন্ধ করে নদীটির দিকে তাকালেই চোখে পড়বে সরকারের টাকায় তৈরি করা অসংখ্য পয়োনিষ্কাশনের মুখ এসে পড়েছে এই নদীতে। তাহলে যারা দীর্ঘদিনে পৌরসভা এবং পরবর্তীতে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন প্রথামত তাদের ওপর এ দায় বর্তায়।

সরকার যদি খুঁজে বের করে যে প্রকৌশলীরা মিলে পয়োনিষ্কাশনের দূষিত পানি শ্যামাসুন্দরী নদীতে ফেলার ব্যবস্থা করেছে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারত তাহলে আগামীতে আর এ রকম প্রকল্প গ্রহণ করত না। নদীতে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ফেরাতে হলে সিটি করপোরেশনকে প্রথমে এই অন্যায়ের দায় শিকার করে নদী রক্ষায় সচেষ্ট হতে হবে। বর্তমান রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান। তিনি নির্বাচিত হওয়ার আগে এবং নির্বাচিত হওয়ার অব্যবহিত পর অনেক সভায় বলেছেন এ নদী তিনি রক্ষা করবেন। জানি না তিনি কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন কিনা? তবে এখন পর্যন্ত কোনো চেষ্টা দৃষ্টিতে পড়েনি।

সিটি করপোরেশন এ নদীটির ওপর নির্যাতন করছে। বাংলাদেশের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন দেশের সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছে। সেই রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলতে হয়, জীবন্ত শ্যামাসুন্দীর ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো বন্ধ করা জরুরি। শুধু যে দূষিত পানি ফেলা হচ্ছে তা নয়। শহরের বর্জ্য ফেলার জন্যও অনেকেই এ নদীকেই বেছে নিয়েছেন। নদী তীরবর্তীদের কাছে যেন এটা নদী নয়, ভাগাড়।

এ বছর ২০১৯ সালের চলমান বর্ষায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। এত বৃষ্টিপাতেও অনেক স্থানে শক্ত আবর্জনা ভাসিয়ে নিতে পারেনি। কোথাও কোথাও আবর্জনা জমাট বেঁধে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। এসব আবর্জনা ফেলাও বন্ধ করা সম্ভব হয়নি আজ অব্দি।

এখন আসা যাক নদীর প্রস্থ নিয়ে। নদীর প্রস্থ কখনো কমে না। দৃশ্যমান নদীকে যে কেউ ভরাট করতে পারে, দখল করতে পারে। সরকারি অসৎ কর্মচারী আর অসাধু ব্যক্তি মিলে অবৈধ কাগজপত্র তৈরি হতে পারে। তার ওপর অট্টালিকাও গড়ে উঠতে পারে। তাই বলে নদীর যে প্রস্থ ১৯৪০ সালের মানচিত্রে চিহ্নিত হয়েছে তা তো আর ক্ষয়ে যায়নি। সেই প্রস্থরেখা আজ অব্দি বহাল আছে। তাহলে রংপুর জেলা প্রশাসন তো এক সপ্তাহের মধ্যে মাত্র ২০ কিলোমিটার নদীর প্রস্থ মেপে সীমানা চিহ্নিত করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী যখন হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছেন নদী রক্ষার জন্য তখন শহরের প্রাণ এ নদীটি কেন রক্ষা পাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত কয়েক বছরে অনেকবার নদীকে বাধাহীন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এবং হাইকোর্টের রায় দুটোই লঙ্ঘিত হচ্ছে রংপুর শহরের প্রাণ বলে পরিচিত শ্যামাসুন্দরীর ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে শ্যামাসুন্দরী খননের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে। যতদূর জানি, তারা এখন পর্যন্ত শ্যামাসুন্দরী নদীর সীমানা চিহ্নিত করতে পারেনি। সীমানা চিহ্নিত না করে নদী খনন করতে গেলে অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে নদী বাঁচানো যাবে না।

শ্যামাসুন্দরী খনন করতে হবে ১৯৪০ সালের নদীর প্রস্থ অনুযায়ী। এতে করে নদীর প্রকৃত প্রস্থ পাওয়া যাবে। নদীর প্রকৃত প্রস্থ পাওয়া গেলে আশা করি একটি স্বাস্থ্যবান নদীই আমরা পাবো। রংপুর সিটি করপোরেশন যদি ক্রমাগত শ্যামাসুন্দরী নদীর সর্বনাশ করতে থাকে তাহলে আমরা আশা করি কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় সরকার তাদের নিবৃত্ত করবে।

বর্তমানে শ্যামাসন্দুরীর যে করুণ অবস্থা তাতে নদীর বেঁচে থাকা কঠিন। বলা যায় শ্যামাসুন্দরী এখন মৃত্যুপথযাত্রী। শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচাতে না পারলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের অভিসম্পাত ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার থাকবে না। রংপুরের উত্তর প্রজেন্মর সুস্থ জীবন যাপনের জন্য এ নদীকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো বিকল্প নেই। এ নদীটি প্রকৃত রূপে ফেরানো গেলে রংপুর শহর হয়ে উঠবে একটি আদর্শ শহর। এ নদীকে কেন্দ্র করে শহরের সৌন্দর্যই পাল্টে যাবে। মানুষের কাছে এ নদী হয়ে উঠবে এক প্রাণের প্রবাহ।

বর্তমান এ নদীটি আরও দুটি নদীকে দূষিত করার জন্য দায়ী। শহরের সাতমাথা নামক স্থানে খোকসা ঘাঘট নামের নদীতে শ্যামাসুন্দরী ময়লা-দূষিত পানি বহন করে নিয়ে ফেলে। সেই পানি আবার রংপুরের অদূরে ঘাঘট নদে গিয়ে পতিত হয়। শ্যামাসুন্দরী রক্ষা পাওয়ার মানে হচ্ছে খোকসা ঘাঘট এবং ঘাঘট নদীও রক্ষা পাওয়া।

শ্যামাসুন্দরী রক্ষার্থে সরকারি এবং স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া নদীটি রক্ষা করা সম্ভব হবে না। আমরা মনে করি, একটি বিভাগীয় শহরে সরকারের উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তা থাকেন তাদের সবাই এগিয়ে আসবেন এ নদীটি রক্ষায়।

পুনশ্চ : সাধারণের ধারণা, এটি একটি খাল। কিন্তু গতিপ্রকৃতি এবং ধরন অনুযায়ী এটি নদী। জমিদার জানকী বল্লভ সেন ১৮৮১ সালে নদীটি পুনরায় খনন করেন এবং তার মায়ের নামে নাম দেন শ্যামাসুন্দরী।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : সহযোগী অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
রংপুর ও পরিচালক রিভারাইন পিপল
wadudtuhin@gmail.com