বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট

মিল্টন বিশ্বাস ৯:২৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০১৯

print
বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট

‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ (২০১৫) গ্রন্থের ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি’ অংশে ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’, ‘বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সেনাবাহিনী’ এবং ‘ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড’-তিনটি প্রবন্ধে শেখ হাসিনা আবেগ, যুক্তি ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছেন। তবে কেবল এই গ্রন্থের প্রবন্ধসমূহ নয়, অন্য রচনায় পিতার আদর্শের ঘনিষ্ঠ এক উত্তরসূরি হিসেবে তাঁকে আমরা দেখতে পাই। আসলে বঙ্গবন্ধুকন্যা, লোকায়ত মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘শেখের বেটি’ শেখ হাসিনা আমাদের প্রজন্মের কাছে কিংবদন্তি নেতা। কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন তিনি; তাঁর রয়েছে একাধিক প্রকাশিত গ্রন্থ। লেখক হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ৩ নভেম্বরে জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত করেছিল। পরিবার-পরিজন হারিয়েও শেখ হাসিনা এ দেশের সাধারণ মানুষের জন্য ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। শুরু হয় তাঁর নেতৃত্বের যুগ। স্বৈরশাসক ও জল্লাদের দেশ পুনরায় সোনার বাংলা হয়ে ওঠার প্রত্যাশায় মুখরিত হয়।

আগেই বলেছি শেখ হাসিনার একাধিক গ্রন্থে পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কথা উচ্চারিত হয়েছে। কেবল পিতা নন একজন রাজনীতিবিদ ও সফল রাষ্ট্রনায়কের ভিন্ন দিক নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে দেখেছেন নানানভাবে। রাষ্ট্র, ষড়যন্ত্র আর এ দেশীয় সমাজ সবই শেখ হাসিনার নখদর্পণে।

বিংশ শতাব্দীর জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে। বাংলাদেশের জাতির জনককে সপরিবারে নিধনযজ্ঞের মধ্য দিয়ে বর্বরতার চূড়ান্ত সীমা স্পর্শ করেছে সেই ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা পাকিস্তান সেনা ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামসের বর্বর আচরণের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ১৫ আগস্টের ঘটনায়। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা সে সময় বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে রক্ষা পান জাতির পিতার উত্তরাধিকার। জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার অনেক গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধে ১৫ আগস্ট বারবার মর্মস্পর্শী ঘটনা হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে। তাঁর অনুভূতি কখনো ক্ষোভে আত্মপ্রকাশ করেছে। আবার কখনো বা আবেগসিক্ত হয়ে তিনি নিজেকেও পিতার মতোই দেশ ও জনগণের জন্য অকাতরে নিবেদন করতে চেয়েছেন। ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণার কৃতিত্ব তাঁরই।

শেখ হাসিনার বিভিন্ন গ্রন্থে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যেসব ঘটনা যখন যেভাবে চোখে পড়েছে, অনুভব করেছেন, সেভাবে লেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষায় : ‘আমি রাজনীতি করি এ দেশের মানুষকে ভালোবেসে। দেশের শহর, গ্রাম, যেখানেই আমি সফরে যাই মানুষের দুঃখ-কষ্ট মনকে দারুণভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে। প্রকৃতির কাছে মানুষ যেমন অসহায়, আবার গোষ্ঠীস্বার্থের কাছেও মানুষ কত অসহায়, নিগৃহীত, শোষিত। আমার এই রাজনৈতিক জীবনে এসব ঘটনা যখন যেভাবে চোখে পড়েছে, অনুভব করেছি, সেভাবে লেখার চেষ্টা করেছি।’

৭৫-এর ১৫ আগস্টের ঘটনাকে শেখ হাসিনা চিহ্নিত করেছেন ‘ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর তুলনা করেছেন বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার নির্মম পরিণতির সঙ্গে। প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যতে কেউ যেন বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের কথা উচ্চারণ করতে না পারে সেজন্য সপরিবারে এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আপসহীন সংগ্রামী ভূমিকা যেখানে নতুন প্রজন্মের কাছে আদর্শস্থানীয় হওয়ার কথা ছিল, তার পরিবর্তে সেখানে হত্যাকারী সামরিক জান্তার অপকর্মের মহিমাকীর্তি প্রশংসিত হয়েছে। এসব পরিস্থিতিও ব্যাখ্যা করেছেন শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর নিজের শান্তি প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু নিজে নিরন্তর শান্তির স্বপক্ষে কাজ করেছেন। পিতাকেই তিনি স্মরণ করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলার সময় তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন যৌক্তিক কারণে। অবৈধ ও অসাংবিধানিক ক্ষমতা চর্চার ধারা সম্পর্কে তার অভিমত হলো, ‘জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমল থেকেই এই ধারা বেগবান হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে স্বৈরশাসকরা সব উন্নয়নের চাকা স্তব্ধ করে দেয়।’

বস্তুত শেখ হাসিনা রাজনৈতিক মঞ্চে ব্যক্তিগত আবেগকে উপস্থাপনে সংযত থাকেন কিন্তু তার গ্রন্থসমূহে বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে নানা কথার ভেতর ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ঘটনা ও তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় তিনি আবেগসিক্ত তবে যুক্তিবাদী ও স্পষ্টকথনে প্রজ্ঞাবান। বিশ্বখ্যাত তথা জগৎবরেণ্য রাজনীতিবিদ হয়েও তিনি বিচিত্র বিষয়ে গ্রন্থ রচনায় সিদ্ধহস্ত- তাঁর রচিত প্রবন্ধগ্রন্থগুলো পাঠ করলেই তা উপলব্ধি করা যাবে। বঙ্গবন্ধুকে জানতে হলে শেখ হাসিনাকে বুঝতে হলে, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রত্যয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য বারবার তাঁর গ্রন্থ পাঠ জরুরি। নতুন প্রজন্মের নেতা-নেত্রীকে তাঁর জীবন ও গ্রন্থের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দীক্ষা নিতে হবে। মূলত, বঙ্গবন্ধুকেন্দ্রিক মতামত, বিশ্লেষণ এবং ইতিহাসধর্মী সব গ্রন্থ-ই আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের জন্য অত্যাবশ্যক।

লেখক : মিল্টন বিশ্বাস, অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।