নীলনকশাকারীদের শ্বেতপত্র চাই

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড

নীলনকশাকারীদের শ্বেতপত্র চাই

ড. এম এ মাননান ৯:২১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০১৯

print
নীলনকশাকারীদের শ্বেতপত্র চাই

সে দিনটা ছিল না উজ্জ্বল আলোর। সকাল বেলার আকাশটা ছিল হালকা মেঘে ঢাকা। দখিনা সমীরণে আর্দ্রতার ছিল না কোনো প্রতাপ। মধ্য-আগস্টের সে দিনটি বাংলাদেশের রাজধানীতে নামিয়ে এনেছিল চাঁদের কলঙ্ক। কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পায়নি রাজধানীবাসী। হঠাৎ বেতারে ভেসে এলো আতঙ্কজনক অভাবিত একটি দুঃসংবাদ; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়া আর দেশে সামরিক শাসন জারি হওয়ার খবর।

বেতারের খবর শোনামাত্রই হতভম্ব আমরা কয়েকজন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম পশ্চিম রাজাবাজারের রাস্তায়। দেখি, অনেক লোকজনের ভীতসন্ত্রস্ত পদচারণা। এগিয়ে গেলাম শুক্রাবাদের দিকে। মিরপুর রোডে ওঠা মাত্রই চোখে পড়ে আর্মিবেষ্টিত ট্যাংকের বহর, ৩২ নম্বর রোডের মাথায়। ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে মূল রাস্তায়। চলে গেলাম পাশ দিয়ে হেঁটে কলাবাগানের দিকে, দাঁড়ালাম কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের রাস্তায়, মিরপুর রোডে, অনেক লোকের সঙ্গে। কাউকে চিনি না। হাজারো মানুষ সারা রাস্তায়। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক, মেঘের ছায়া চেহারায়। টুঁ শব্দটি নেই কারও মুখে। এত লোকের সমাগম অথচ কোনো শব্দ নেই। ভাবা যায় না। কেউ কেউ ফিস ফিস করে পাশের জনের সঙ্গে কথা বলছেন আবার আশপাশে ভীত নয়নে তাকিয়ে দেখছেন। দুপুর পর্যন্ত থেকে চলে গেলাম বাসায়। আমার যাওয়ার কথা ছিল টিএসসিতে, যেখানে যাওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুরও। আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল তিনি আজ ৯টার দিকে টিএসসিতে ভাষণ দেবেন; বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে ঘোষণা দেবেন, দেবেন বিশেষ মর্যাদা। এমনটাই শোনা যাচ্ছিল কয়েক দিন ধরে ক্যাম্পাসে। অথচ, হঠাৎ আকাশ ভেঙে পড়ল ঢাকার বুকে। বিকালের দিকে রাস্তায় ট্যাংকবহর নিয়ে নেমে পড়ল সেনারা।

বাসায় এসে ভাবছিলাম, কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটাল। কেন ঘটাল? কারা এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করল? যে মানুষটি মৃত্যুর গহ্বর থেকে ফিরে এসে শক্ত হাতে দেশের বৈঠা ধরেছেন, তাকে কেন সপরিবার নিঃশেষ করে দিল? কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। বেশ কয়েক মাস ধরেই রাজনীতির মাঠে টালমাটাল একটা ভাব দেখা যাচ্ছিল। ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার পর বঙ্গবন্ধু মাত্র সময় পেয়েছেন ১৩১৪ দিন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ভেঙে দুভাগ হয়ে গেল- একটি গ্রুপ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নাম ধারণ করল। এ সেই জাসদ যার সক্রিয় উদ্যোক্তা-সদস্যরা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা শুরু করে দিল। আমরা জানতাম, তখনো বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় সংস্থায় ও পাবলিক প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে আসীন ছিল পাকিস্তানের লেজুড়রা। তারা কেন পাকিস্তানের প্রধান শত্রু বঙ্গবন্ধুকে সাহায্য করবে? এমনিতরো বহু ধরনের চিন্তাভাবনা মাথায় খেলতে লাগল। মনের গহিনে একটা পাথরের মতো বোঝা নিয়ে উঠে পড়লাম। প্রচণ্ড অস্বস্তির মধ্যে রাত নেমে এলো।

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা যে নির্লজ্জ, জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ‘উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলের মহানায়ক’কে সরিয়ে দিয়ে যে ন্যক্কারজনক কাজটি করেছে, তা দেশকে বিশাল অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাদের সৃষ্ট অনিশ্চয়তা থেকে দেশকে উদ্ধার করেছেন, দেশবাসীকে খাদের কিনারা থেকে সরিয়ে এনে উন্নয়নের রাস্তায় দাঁড় করিয়েছেন। আর, একটি উন্নত দেশের স্বপ্ন সৃষ্টি করে সবাইকে নিয়ে একযোগে এগিয়ে যাচ্ছেন। উন্নয়নকে টেকসই করার জন্য এবং এখনো সক্রিয় স্বাধীনতাবিরোধীদের অব্যাহত চক্রান্ত চিরতরে নির্মূল করার প্রয়োজনেই দরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের খলনায়ক ও নীলনকশা প্রণয়নকারীদের স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। তা করবে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির সরকার। এ শে^তপত্রে থাকতে হবে:- কারা এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের কুশীলব ছিল; ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে হত্যাকাণ্ডের বিচার করার পথ কেন রুদ্ধ করা হয়েছিল এবং অধ্যাদেশ জারির পেছনে কারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল; লন্ডনে স্যার টমাস উইলিয়ামস (যিনি ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিশেষজ্ঞ আইনজীবী ছিলেন)-এর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য ‘শেখ মুজিব মার্ডার ইনকোয়ারি’ নামক যে তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল, সে কমিটির অগ্রগতি সম্পর্কিত তথ্যাদি; তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে উইলিয়ামস যখন দেখা করেছিলেন, তখন জিয়াউর রহমান তাকে ‘আইন নিজস্ব গতিতে চলবে’ বলার পরও আইন কেন নিজস্ব গতিতে চলতে পারেনি; দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিচারের পথ কেন রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল; জিয়ার আশ্বাস বাস্তবে পরিণত না হওয়ার পেছনের কী কী কারণ ছিল; হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কমিশনের আরও দুজন সদস্য আইনজীবী অব্রে রোজ এবং জেফ্রি টমাসকে কেন ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সফর করার অনুমতি দেওয়া হয়নি; কেন টমাস উইলিয়ামসকে বাংলাদেশ সরকার সে সময়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে; উক্ত তদন্ত কমিশন লন্ডনে বসেই যে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে যে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়, যেমন, ‘আইন ও বিচারকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া হয়নি, আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে না দেওয়ার জন্য সরকারই দায়ী এবং দায়মুক্তির বিধান তুলে নিয়ে বিচারের পথ উন্মুক্ত করতে হবে’- এ বিষয়গুলো সম্পর্কিত তথ্যাদি এবং অন্য প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি।

সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে যারা নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল তারা কেন এখনো অধরা, তাদের ব্যাপারে কেন দেশবাসী জানতে পারছে না, তাদের ব্যাপারে কেন সরকার শ্বেতপত্র তৈরি করে জনসমক্ষে প্রকাশ করছে না। এ বিষয়গুলোর সুরাহা করার সময় এসেছে। জনগণ হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদের সম্পর্কে জানতে চায়। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানোর জন্য, তাদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম, জাতির প্রতি ভালোবাসার বিষয়গুলো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়ার লক্ষ্যে জাতি প্রত্যাশা করে একটি বিস্তারিত তথ্যসমৃদ্ধ শ্বেতপত্র। আমরা বঙ্গবন্ধুকন্যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের নিকট থেকে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের প্রত্যয় নিয়ে থাকলাম।

লেখক : ড. এম এ মাননান, উপাচার্য
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।