হ-য-ব-র-ল হালচাল

ঢাকা, রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

হ-য-ব-র-ল হালচাল

প্রসেনজিৎ হালদার ৯:৫৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৬, ২০১৯

print
হ-য-ব-র-ল হালচাল

এভাবেই চলছে। কেউ শুনছেন না কারও কথা কিংবা শুনলেও এক কান দিয়ে নিচ্ছেন আর অন্য কান দিয়ে বের করছেন। প্রতিটি স্থানে, প্রতিটি পর্যায়ে একই রকম ঘটনা ঘটছে। চলতে-ফিরতে, খেতে-ঘুমাতে পরিস্থিতিও প্রায় এক রকম। রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেমে থেমে চলছে। ক্ষমতাসীন ব্যতীত পথে ঘাটে অন্য কোনো পোস্টার দেখা যায় না। খাদ্যের ভেজাল দেওয়া বন্ধ হচ্ছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। বিচার চেয়ে জটিলতায় ভুগতে হচ্ছে বাদী-বিবাদীদের। কারণ, মামলার পাহাড় জমা হয়ে আছে।

উচ্চশিক্ষা লাভ করেও হতাশ বেশির ভাগ যুবক-যুবতী। মিলছে না সোনার হরিণ (সরকারি চাকরি) বা ভালো চাকরি। রাস্তার নাম হয়েছে ‘ডাকাত’। সেখানে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। চিকিৎসা নিতেও অর্থে ভর করে যেতে হচ্ছে বিদেশে। দেশে যারা নিচ্ছেন তাদের খুব সহজে মুক্তি মিলছে না। ভরপুর ব্যবসা থাকলেও বাকি থাকছে পোশাক কারখানার বেতন-ভাতা। পাশ হচ্ছে রেকর্ড বাজেট। হচ্ছে স্মরণকালের বৃহৎ প্রকল্প। এত কিছুর মধ্যে কে কাকে নিয়ে ভাববার সময় পায়? সবাই তাই যার যার কাজে ব্যস্ত।

সেদিন রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়া দিয়ে হেঁটে হেঁটে অফিসে যাচ্ছি। দূতাবাসগুলোর মাঝামাঝি রাস্তা দিয়ে দুই নারী একই ফুটপাত ধরে এগিয়ে আসছেন। খুব দূরে নয়। খানিকটা এগোতেই পাশ দিয়ে হেঁটে চলা বয়স্ক নারী ওই দুই নারীকে উদ্দেশ করে কিছু একটা বললেন। তাতেই ক্ষেপে গিয়ে দুই ভদ্রমহিলা বয়স্কাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকলেন। বৃদ্ধাও কম গেলেন না। অর্থাৎ, দুপক্ষই যাচ্ছেতাই গালি দিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনও নির্বাক শ্রোতা। সব ভুলে মুহূর্তের মধ্যে যে যার গন্তব্যের উদ্দেশে ছুটলেন। বয়স্ক মহিলা বলেছিলেন এ রকম- ‘একটু ঢেকে চললে কি হয়।’ ব্যস, এই কথাতেই চটে গিয়ে দুই পক্ষই একে অপরকে গালি দিলেন। আর আমরা যারা নীরব দর্শক ছিলাম তারাও কাজের ধান্দায় পরক্ষণেই ভুলে গেলাম। ভাবলাম, এগুলো নিত্যদিনের।

ডেঙ্গুতে কাতর দেশ। দুর্ভোগ সীমাহীন। এরই মধ্যে আসন্ন ঈদের আনন্দে মজেছেন অনেকেই। তবে, ডেঙ্গু রোগী এবং তাদের পরিবার নিয়ে ভাববার লোক নেই। সরকার আর সচেতন মানুষের কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও তাতে কিছু যায় আসে না। এবারের ঈদ যে কেমন কাটবে তাও বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু তারপরও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট বেশির ভাগ মানুষ। দেশি-বিদেশি জরিপও তাই বলে। তবে এখনো মাঝামাঝিতে থাকা আমপাবলিকরা ন্যায্য দাবি নিয়ে হাতড়ে বেড়ান চারপাশ। যে সমাজে অতি ধনীর সংখ্যা বেশি সেখানে অতিদরিদ্র থাকাও স্বাভাবিক। তাই বলে অভাব নেই কোনো কিছুরই। বাজারে সবজি-মাছের দাম আকাশচুম্বী হলেও তা পচে না। কৃষক ধান পুড়িয়ে দিলেও তাদের দিকে তোড়জোড় দিয়ে নজর পড়ে না। আর বিচার-শাস্তি-মুক্তির লোভে কাঁদে সাধুজন-অপরাধীরা। এই আমাদের হালচিত্র।

আসছে ঈদ, হিড়িক পড়েছে ব্যবসার। ক্রেতারাও ঝাঁকে ঝাঁকে মার্কেটে যাচ্ছেন। জামা-কাপড়, জুতো, মনিহারি বাদ যাবে না কোনো কিছু। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যেতে হবে, আত্মীয়স্বজনকে দিতে হবে উপহার। এই খুশিতেই ঈদের কেনাকাটা। গলাকাটা দাম আর ব্যাগভর্তি হয়রানির সঙ্গে এবার বাড়ি যাচ্ছে ডেঙ্গু। তারপরও বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে পোহাতে হবে সীমাহীন ভোগান্তি নিয়েই।

রাস্তার ঝক্কি আর হয়রানির ভিড়েও গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিকরাই সব থেকে লাভবান। তাদের ক্ষমতাই বেশি। একের পর এক মানুষ খুন করে গেলেও নামমাত্র আন্দোলন-অবরোধ হয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবেও শান্তি পায় না এদেশের মানুষ। আয়-আয়ু বাড়লেও মানসিকতা বড় হচ্ছে না। উল্টো কুঁচকে যাচ্ছে। কেউ কারও কথা শুনতে রাজি নয়। না সরকার, না প্রশাসন, না সাধারণ মানুষ। এভাবেই চলছে।

হ-য-ব-র-ল এই আমাদের দেশ উন্নতির মহাসড়কে ধাবমান। উদ্দেশ্য, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। তাও ২০৪১। ২০২১ এবং ২০৩০ সালের যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে তাও দেখতে পাবে সাধারণ মানুষ। দুর্নীতি গ্রাস করলেও গত হওয়া শাসনামলের মতোই আবার চলমান দলের গোমর ফাঁস হবে। তখন, আবার হয়তো কোনো তত্ত্বাবধায়ক কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক অথবা গণতান্ত্রিক দল ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতিবাজ-অপরাধীদের মুখোশ খুলে ফেলবে। তাতে যত বাধা আসুক আর যত মানুষ দুর্ভোগে পড়ুক কিছু যায় আসবে না।

হাল এমন যে, ধনীদের ধন বাড়ছে, নিঃস্ব হচ্ছে গরিব। তবুও সাধারণের ঘাড়ে ঋণের বোঝা বাড়ছেই। নিত্যপণ্যে দাম কমানো হয়নি। ধান পুড়লেও বিদেশ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে চাল আমদানি হয়। আর ব্যাংক থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়েও আদালতে করা রিটে তা ভোগ করে চলে খেলাপিরা। মন্ত্রীপর্যায় থেকে শত আশ্বাসের পরও কিছু যায় আসে না। আসল কথা হচ্ছে, ‘আমি তো ভালো আছি’। হ্যাঁ, আপনার ভালো থাকাটাই মুখ্য ব্যাপার। এতে দশ বিশ পঞ্চাশজন পড়ে গেলেও ক্ষতি নেই। লক্ষ্য পূরণ হওয়া চাই।

দেশে প্রচুর পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদনের ঘাটতি নেই। দাম বেশিও মানুষের কাছে জন্য সমস্যা নয়। টাকা আজকাল ‘তেজপাতা’। পকেট বোঝাই বড় বড় নোট। ব্যবসায়ীরাও এর সুযোগ নিচ্ছে। সময়মতো দুই টাকার পণ্য দশ টাকায় বিক্রিতে এরা ভীষণ পটু। এ দৃশ্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু, স্থানীয় বাজারে যে পটোলের দাম মাত্র ১০ টাকা তা রাজধানীতে এসে কীভাবে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়! কারণও সবার জানা, ‘রাস্তার খরচ’। প্রকাশ্য চাঁদাবাজিতে লিপ্ত ক্ষমতাশালী পোশাকধারী কিংবা দুর্বৃত্ত-সন্ত্রাসীরা। কেউ পার পাবে না। সন্দেহ হলেই বিপদ সাধারণের। আর, যারা অনৈতিক কাজ এবং দুর্নীতিতে জড়াচ্ছে তারাও দীর্ঘ সময় চুপসে থাকছে।

এক সময় যখন আর নিজেকে ঢেকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না তখনই ধরা পড়ছে। কিন্তু, ধরা পড়েও টাকার কুমিরদের ক্ষতি হয় না। মাঝে মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কিংবা অসুস্থতায় অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছে। কিন্তু, শেকড় তোলা যাচ্ছে না। কারণ, দুর্নীতি একপ্রকার ক্ষমতা। আর ক্ষমতা যার থাকে তার দাপট থাকাটাও স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিকতা যখন তক্বী-তনুর মতো কোমল প্রাণ যায়, তখন বিচার-তদন্ত থাকে শত মাইল দূরে। আহা হাল দেশের! এখনকার আয়রোজগার অতীতের তুলনায় অনেক বেড়েছে। দেশে যখন পোশাক রপ্তানি করে বিপুল টাকা আসছে তখনো বেতনবঞ্চিত হয়ে ধর্মঘটে নামছেন পোশাকশ্রমিকরা। অথচ, যে পণ্যের দাম সর্বোচ্চ তিনশ টাকা তার দাম নেওয়া হচ্ছে হচ্ছে বারশ টাকা। এ কাজ করেছে আমাদেরই জনপ্রিয় পোশাকে একটি ব্র্যান্ড। তাদের জরিমানাও করেছেন আদালত। কিন্তু থামেনি দুর্বৃত্তায়ন। প্রতিযোগিতামূলক এবং খোলামেলা বাজারের এই গুন। যার যতো প্রভাব, তারও দখলের পরিমান তত বেশি। হোক না অনিয়ম-দুর্নীতি অভিজ্ঞতা না থাকলে ঠকতে হবেই। ভোক্তার দিক বিবেচনায় সকল পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের কথা থাকলেও দুই টাকার পণ্য দশ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। আজকাল টাকাও যে কোন সমস্যা নয়।

রাস্তায় যানজট এবং বাড়তি ভাড়ার বিষয়টিও আমাদের জানা। অথচ, কিছুই করা যাচ্ছে না, তিনগুণ ভাড়া দিয়েই আমি যাতায়াত করব। তা না করতে চাইলে নিজস্ব পরিবহন অথবা হেঁটে বাড়ি পৌঁছাতে হবে। পকেটমার-চুরির কথাও অভিজ্ঞদের বলার কিছু নেই, এর সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে গাড়ি ভাড়া নৈরাজ্য। আর এর সঙ্গে সাধারণের ভোগান্তি একদম ফ্রি। একদা আমরা শক্তিশালী ছিলাম, আমাদের ভিত দুর্বল করা হয়েছে।

খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা-কোন দিকে সফল আমরা? বিবেচনা করলে সবদিকে। আবার, বিবেচনা করলে কোনো দিকেই না। সবার সুবিধা যেখানে নিশ্চিত হবে কেবলমাত্র সেখানেই সফলতা আসবে। কিন্তু, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুবিধা ভোগ করে অল্প কিছু লোক। সঠিক পন্থায় নিয়ন্ত্রণের অভাবে যুগের যুগ এভাবেই চলছে। একজন দেখার মানুষ থাকলে মাত্র তিনটি চোখ দিয়ে তিনি আর কত দেখবেন। তারপরও লাখো গালি শুনে উন্নয়নের চিন্তায় তার ভালো ঘুম হয় না। সবাই নিজের লোক হওয়ায় কিছু বলাও যায় না। এটি ক্ষমতাসীনের হাল।

লাখ লাখ কোটি টাকা উন্নয়ন পরিকল্পনায় খরচের কথা থাকলেও ‘বালিশ’ ওঠাতেই কল্পকাহিনীর মতো খরচ হয়ে যায়। সাধারণ জনগণের ঘাড়ে আজ বোঝার ওপর শাকের আঁটি চড়েছে। যতটুকু রাস্তা দিয়ে সবাই চলাচল করবে ততটুকুই বাকি আছে। যে সেখানে আছাড় খেয়ে পড়ছেন তার আর ওঠার ক্ষমতা থাকছে না। বিচার চাইলেও দেরি হচ্ছে। অপরাধ করে শাস্তি পেতেও দীর্ঘ সময় পার হচ্ছে। অর্থাৎ বাদী-বিবাদী উভয়ই ঝুলে থাকছে জীবিত লাশ হয়ে।

ছোট-বড় চুরি ছিনতাইয়ের প্রবণতা আগের তুলনায় কমলেও বেড়েছে ‘পুকুর চুরি’। অসৎ কাজের একদিক বন্ধ হলে অন্যদিক খুলে গেছে। আবিষ্কার হয়েছে নিত্যনতুন কৌশল। মলমপার্টি, অজ্ঞান পার্টির নামে নতুন মোড়কে পুরনো প্রকল্প চালু হয়ে সাধারণের সম্পদ লুট হয়। তাতে বলা বা করার কিছুই নেই। কারণ, যারা বলতে চায় বা করতে চায় তাদের সে ক্ষমতা নেই। আর, যারা দেখে তাদের চোখের মূল্য নেই। জেগে ঘুমিয়ে গেলে যেমন জাগানো যায় না, আমাদের দশাও তাই।

প্রসেনজিৎ হালদার
সাংবাদিক ও কলামিস্ট