বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বর্তমান প্রজন্ম

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬

বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বর্তমান প্রজন্ম

উমর ফারুক ৯:০৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০১, ২০১৯

print
বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বর্তমান প্রজন্ম

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ, দুটি ভিন্ন নাম কিন্তু ইতিহাস এক সুঁতোয় গাঁথা। মহাত্মা গান্ধী, মাও সেতুং, হো চি মিন, জর্জ ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়ে যেমন তাদের জন্মভূমির ইতিহাস লেখা যায় না, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসও অসম্ভব। তিনি বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। বাঙালি জাতির স্বপ্নমানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি জাতিকে স্বপ্ন দেখাতেন, যিনি শুধু দেশে নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বনামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি একটি দেশ তথা জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয়ে উঠলেন। আমাদের প্রিয় মুজিব তার নিজের জীবনের সবটুকু ভালোবাসার বিনিময়ে সোনা ফলালেন বাংলায়। সময়টা ১৯২০ সালের মার্চের ১৭, বাঙালি জাতির জন্য অধিকারের মশাল হাতে এ ধরায় আগমন ঘটল একজন মহানায়কের। বাঙালি তাকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ সম্মাননায় ভূষিত করলেন। টুঙ্গিপাড়ার খোকাবাবু এক সময় শেখ মুজিব নামে পরিচিত হলেন। রাজনীতিতে এসে হলেন শেখ সাহেব, ঊনসত্তরে বঙ্গবন্ধু, একাত্তরে স্বাধীনতার ঘোষক। আর পঁচাত্তরের পর দখল করলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির আসনটি।

আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি আর সমরনীতির জাঁতাকলে বারবার পিষ্ট হয়ে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। আবার কখনো বিকৃত হয়েছে বঙ্গবন্ধু তথা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস। ইতিহাস আর বইয়ের পাতা থেকে অপসারিত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্থান করে নিলেন বাঙালির মনে চিরদিনের জন্য। কিছু স্বার্থান্বেষী বারবার বিকৃত করল বঙ্গবন্ধুকে। কখনো বা অল্প দামে বেচে দিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নগুলোও। বঙ্গবন্ধুর শৈশব আর কৈশোরের দৃঢ় দেশপ্রেম তাকে একজন নিঃস্বার্থ নেতা হতে সাহায্য করেছিল।

১৯৩৪ সালে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হলো শেখ মুজিবের। পরাজিত না হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৩৭ সালে আবার শিক্ষা জীবন শুরু করলেন। মাত্র আঠারো বছর বয়সে সহযোদ্ধা হতে এলেন ফজিলাতুন্নেছা। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছে স্কুলের ছাদ মেরামতের দাবি তুলে শেখ মুজিব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন দাবির ব্যাপারে তার অকুতোভয় কণ্ঠস্বরের কথা। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। সে বছরই ৪ জানুয়ারি মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। খাজা নাজিম উদ্দিনের প্রস্তাবনা, ‘রাষ্ট্রভাষা উর্দু’- এর প্রতিবাদে সে বছরেরই ২ মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় তার ছোঁয়ায়। ১১ মার্চ রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালনকালে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে শেখ মুজিবও গ্রেফতার হন। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে সারা দেশের ছাত্রসমাজ। ছাত্রদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে সরকার ১৫ মার্চ শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। শুরু হয় একজন ছাত্রনেতার জননেতা হওয়ার গল্প।

দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন এবং এই আন্দোলনের জন্য বারবার গ্রেফতার হয়েছেন মুজিব। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। ১৯ এপ্রিল উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করার সময় তিনি গ্রেফতার হন। সে বছরই দেশে বিরাজমান খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করার সময় আবার গ্রেফতার হন মুজিব। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের আগমনের প্রতিবাদে মিছিল করার সময় ১৪ অক্টোবর তিনি আবার গ্রেফতার হন। ১৯৫২ সালে জেলে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে অনশন শুরু করেন। একটানা ১৭ দিন অনশনই তার দেশ তথা ভাষার প্রতি এক বিরল ভালোবাসার উদাহরণ। ১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। উপহার হিসেবে পান কৃষি ও বনমন্ত্রীর দায়িত্ব। ৩০ মে কেন্দ্রীয় সরকার মন্ত্রিসভা বাতিল করে দিলে করাচি থেকে ঢাকায় ফিরে পুনরায় গ্রেফতার হন মুজিব। ১৯৫৫ সালের ১৭ জুন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ২১ দফা ঘোষণা করা হয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন। গ্রেফতার হন মুজিব। মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে বারবার গ্রেফতার করা হয়। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর আবার জেলগেট থেকেই গ্রেফতার করা হয় তাকে। এভাবে প্রায় চৌদ্দ মাস তিনি কারাবাস করেন। ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জননিরাপত্তা আইনে তাকে আবারও গ্রেফতার করা হয়। চার বছরের সামরিক শাসনের অবসান হয় সে বছরের ২ জুন। ১৮ জুন মুক্তি লাভ করেন মুজিব। ১৯৬৫ সালে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় এক বছরের কারাদ- ভোগ করেন মুজিব। ১৯৬৬ সালে ঘোষিত হয় বাঙালির স্বপ্নের ৬ দফা। সে বছরই মার্চে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু মামলা আর গ্রেফতার তার পিছু ছাড়ল না। ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে ৩নং আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়। জন্মদিনে শেখ মুজিবুরকে মুক্তি দিয়ে আবার জেল গেটে আটক করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি জনগণের চাপে প্রত্যাহার করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এমনি করে গ্রেফতার, জেল আর জরিমানা দিতে দিতে পেরিয়ে গেল বঙ্গবন্ধুর জীবনের অনেকখানি সময়।

মধ্যবয়স পার করলেন মুজিব। শুরু হলো ‘বাংলাদেশ’ ভূমিষ্ঠ হওয়ার গল্প। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৮ প্রায় ১০ লাখ ছাত্র-জনতার সমাবেশে শেখ মুজিবুরকে দেওয়া হয় সংবর্ধনা। তোফায়েল আহমেদের প্রস্তাবে শেখ মুজিব ভূষিত হন বঙ্গবন্ধু উপাধিতে। ‘৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল জয়, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৬ মার্চ ঢাকায় ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক, ২৪ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ব্যর্থ বৈঠক এবং ২৫ মার্চ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বুলেট হামলা’-এ গল্পগুলো আমাদের বেশ পরিচিত। সব আলোচনা ব্যর্থ হলে ২৫ মার্চের রাত ১২টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন :
‘This may be my last message, from today Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh. Final victory is ours.’

ঘোষণাপত্রটি সারা দেশে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়। এতটা স্পষ্ট স্বাধীনতার ঘোষণাকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকার তাদের প্রয়োজনে বিকৃত করে। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার অপরাধে শেখ মুজিবুকে রাত ১টা ১০ মিনিটে তার ৩২নং বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়। বন্দি বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন সবার আরও প্রিয়ভাজন। বঙ্গবন্ধুর জন্য শুভকামনায় রোজা রাখলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। অন্য ধর্মালয়ে চলল প্রার্থনা। সংগ্রাম, সংকল্প আর অসংখ্য ত্যাগের বিনিময়ে বিনির্মিত হলো একটি রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’।

বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শনের পরিব্যাপ্তি ছিল বাঙালি জাতিসত্তায়। বাঙালি জাতিসত্তায় বিশ্বসী বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে ভীষণ ভালোবাসতেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশের মাটিতে পা রেখে সেই ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ছুটে যান গণমানুষের সমাবেশে। কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, ‘... আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলেম, যদি আমার মৃত্যু এসে থাকে, আমি হাসতে হাসতে যাব। ... তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না এবং যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান। ... আজ আমি বাংলাদেশে ফিরে এসেছি। আমার ভাইদের কাছে, আমার মা’দের কাছে। আমার বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন। বাংলার মানুষ আজ স্বাধীন।’ ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে শুরু করলেন বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজ। তখন ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এক জটিল প্রেক্ষাপট। শক্ত হাতে হাল ধরলেন বঙ্গবন্ধু। সে সময় তাকে অসংখ্য বিষয় ভাবতে হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া ১ কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, প্রশাসন গড়ে তোলা, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসন, অন্য বাহিনী নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা, সড়ক-সেতু ও রেললাইন পুনঃস্থাপন, ঘাতক-দালালদের বিচার করা, আন্ডারগ্রাউন্ড দলগুলোকে নিষ্ক্রিয়করণ, পাকিস্তানে আটকাপড়া সরকারি-বেসরকারি জনগণকে ফিরিয়ে আনা, পরিত্যক্ত সম্পত্তির নিষ্পত্তিসহ নানা জটিল বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকে নজর দিতে হয়েছিল। তিনি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এই জটিল কার্যক্রম শুরু করেন।

দেশ পরিচালনার জন্য সংবিধান দরকার, সেই নিরিখে তিনি জাতিকে চমৎকার একটি সংবিধান উপহার দিলেন। যখন বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন দেশের সিংহভাগেরও বেশি লোক কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের কথা চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না’। কৃষিকাজে বাংলার কৃষকদের ব্যাপকভাবে মনোনিবেশ করার জন্য বঙ্গবন্ধুর অবদান কম নয়। তিনি জানতেন কৃষকরা যদি সঠিকভাবে উৎপাদন করে তাহলে দেশের খাদ্যসমস্যা দ্রুত নিরসন হবে। শুধু কৃষি নয়, সব ক্ষেত্রে দক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সুখী-সমৃদ্ধ, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হাল ধরেছিলেন। সময় ডিঙিয়ে বাংলার আকাশ হলো রঙিন। স্বাধীনতার সূর্য আর তার সুফল ভোগ করতে জনগণের আয়োজন বাংলাকে ছন্দময় করে তুলল। পঁচাত্তরের আগস্টে শত্রুর ঘোলাটে চোখের কাছে পরাজিত হয়ে সপরিবারে দেশ-গড়ার স্বপ্ন থেকে ছিঁটকে পড়লেন বঙ্গবন্ধু। জাতি পুনরায় এক অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো।
ইতিহাসের পটে শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু হলেন। বাংলার সর্বস্তরের মানুষের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মীয় হলেন তিনি। নির্মম সেই রাতে ঘাতকের আঘাতে যখন মুজিব সপরিবারে নিষ্ঠুরভাবে শাহাদত বরণ করলেন, সমগ্র পৃথিবী তখন নীরব-নিস্তব্ধ। বঙ্গবন্ধু তার প্রিয় জন্মভূমিতে ঘুমিয়ে পড়লেন আর স্থায়ী নিবাস করে নিলেন সাধারণ জনগণের হৃদয়ে।
আমাদের বর্তমান সকল কর্মযজ্ঞ তারই স্বপ্নের পথে হেঁটে বেড়ায়। আমাদের সব সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু চিরস্মরণীয়।

বঙ্গবন্ধুকে বাংলা থেকে বারবার মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি বারবার বাংলার কোটি হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। দেশ-জাতি যখন সংকটে পড়ে তখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত নতুন প্রজন্ম আবার সঠিক ঠিকানা খুঁজে ফেরে। কাদের মোল্লার কারাদণ্ডের আদেশের পর নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে, দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসে। মুখে তুলে নেয় সেই পুরনো চির-সজীব বাণী ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। কেমন যেন এক উন্মাদনা, মিথ্যেকে ভেঙে চুরমার করার দৃঢ় প্রত্যয় আর সত্য প্রতিষ্ঠার এক বিপ্লবী ব্যাকুলতা আছে সেই অমর স্লোগানে। ‘জয়বাংলা’ স্লোগানে বাঙালি জাতিকে একসূত্রে গাঁথা সম্ভব হয়েছিল ১৯৭১ সালে আর আজ ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে সমগ্র তরুণসমাজকে আবার এক সূত্রে গাঁথা সম্ভব হয়েছে। সব অসুন্দর আর অপশক্তির প্রতি চোখ রাঙানি স্লোগান ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। বর্তমান তারুণ্য বঙ্গবন্ধুকে পাথেয় করে স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃৎ এবং বাঙালি জাতির এক অবিসংবাদিত নেতা। বঙ্গবন্ধু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট গঠন, আটান্নর সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ৬ দফা, ঊনসত্তরের নির্বাচন, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের গণ-আন্দোলন, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনসহ সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ কীর্তি। দেশ স্বাধীনের পর স্বল্পতম সময়ে দেশদ্রোহীদের ষড়যন্ত্রে অনেকখানি পরাজিত হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নযুদ্ধ। ’৭১ এ পরাজিত শক্তির দোসররা দখল করে বাংলার মাটি। যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে পতপত করে ওড়ে শহীদের রক্তে ভেজা পতাকা। স্বাধীনতার চার দশক পর আজও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা অবহেলিত। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, হাহাকার আর সঙ্গে শকুনের ঘোলাটে চোখের জন্য অনিদ্রায় জাগ্রত আমাদের চোখ। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন আজ অসম্ভব কিন্তু তার দেশপ্রেম আর স্বপ্নকে ধারণ করেই কেবল আধুনিক, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। চেতনায় জাগ্রত বঙ্গবন্ধু বাঙালির কাছে অবিস্মরণীয় এবং অবিসংবাদিত একটি সত্তা। বঙ্গবন্ধুর সব খুনি এবং তাদের দোসররা যত দ্রুত সাজা পাবে বাংলার নিঃস্বার্থ-আত্মা তত দ্রুত শান্তি পাবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দ্রুত কার্যকর ও স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়াই হতে পারে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ঔদ্ধত্যের জবাব।

বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বর্তমান প্রজন্ম এক এবং অবিচ্ছেদ্য। বলা যেতে পারে, একটি মুদ্রার দুটি ভিন্ন পিঠ। বাংলার স্বাধীনতা, ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু চিরকালের জন্য চিরজাগ্রত। তিনি বাঙালি জাতির জনক এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি অমর, তিনি অবিনশ্বর। তিনি একটি ভূখণ্ডের স্রষ্টা, তিনি একটি জাতির পথপ্রদর্শক এবং তিনি বর্তমান প্রজন্মের দিক-নির্দেশক।

বর্তমান সময় যদি পথ হারিয়ে ফেলে কিংবা আমাদের আগামী যদি ভুলপথ বেছে নেয় তাহলে বঙ্গবন্ধু তার আদর্শ দিয়ে বারবার জাতিকে স্পর্শ করবেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ভুলে যাওয়ার কিংবা অবহেলা করার জন্য নয়। তার দেশপ্রেমের আদর্শে জাতি সঠিক পথে পরিচালিত হবে সে প্রত্যাশা বর্তমান প্রজন্মের। স্বার্থপর ভুঁইফোঁড় সংগঠন অথবা ব্যক্তি যেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ব্যক্তিস্বার্থে পুঁজি করতে না পারে, দাবি বর্তমান প্রজন্মের। বঙ্গবন্ধু আজ আর কোনো দলের রাজনৈতিক সম্পদ নয় বরং বাংলার কোটি হৃদয়ে দেশপ্রেমের আদর্শে স্থান করে নেওয়া একটি প্রিয়ভাজন স্থায়ী অস্তিত্ব।

উমর ফারুক : শিক্ষক
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
faruque1712@gmail.com