ভিআইপি পরিসেবা ও জনদুর্ভোগের সংস্কৃতি

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬

ভিআইপি পরিসেবা ও জনদুর্ভোগের সংস্কৃতি

সুমনা গুপ্তা ৯:১৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০১৯

print
ভিআইপি পরিসেবা ও জনদুর্ভোগের সংস্কৃতি

বর্তমান সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ভোগান্তির নাম ‘ভিআইপি পরিসেবা’। এই ভিআইপি পরিসেবা এখন এমন আকার ধারণ করেছে যে, ঢাকা শহর বা এর আশপাশে শুধু ভিআইপি চলাচলের কারণে অনেক সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টার অপচয় হচ্ছে যাচ্ছেতাইভাবে। অমুক ভিআইপি আসবেন বলে একপাশের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া এখন মামুলি ব্যাপার। আবার এখন কোনো কারণে রাস্তায় জ্যাম হলেই ধরে নেওয়া হয় সেই সড়ক বা এর আশপাশের সড়কে ভিআইপি যাতায়াত করছেন। তাই রাস্তা বন্ধ। আর আমাদেরও জীবনযুদ্ধের রঙ্গমঞ্চে সব গা-সওয়া হয়ে গেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, যে দেশের রাজধানীতে যানজট সমস্যায় এমনিতেই মানুষ নাকানি-চুবানি খায় প্রতিনিয়ত সেখানে যে কোনো কাউকে ভিআইপি পরিসেবা দেওয়া এখন যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন ক্যান্সারের নাম। প্রথমেই নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। ঢাকার অদূরের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজের জন্য আমি এবং আমার আর একজন কলিগ মোটামুটি মানের একটি পাবলিক বাসে রওনা হই। আরিচার কাছাকাছি গিয়ে যখন পৌঁছেছি তখন গাড়ির জ্যামে অবস্থা খারাপ। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম, পুলিশের হুইসেলে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। কী ব্যাপার কী হলো! জিজ্ঞেস করতেই জানলাম, পেছনের গাড়িতে ম্যাজিস্ট্রেট স্যার আছেন। তিনি মহান দেশের মহান ভিআইপি তাই তাকে আগে ফেরিতে তুলে দিতে হবে।

প্রফেশনাল জায়গা থেকে নয়, এমনিতেই মনটা একটু খারাপ হলো। একজন সদ্য জয়েন করা ম্যাজিস্ট্রেট একটি দেশের ভিআইপি অথচ একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক সাধারণ মানুষ! আমার সঙ্গে যে সহকর্মী ছিলেন ওনার একাডেমিক এক্সিলেন্সি ও রেজাল্ট খুব ভালো। একটি প্রথম শ্রেণির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও এ ক্ষেত্রে কিন্তু তিনি সাধারণ। আর ক্ষেত্রবিশেষ ক্লাসের মিডিওকার স্টুডেন্ট শুধু বিসিএস নামের পরীক্ষার মাধ্যমে হয়ে গিয়েছেন ভিআইপি!

আসলে সমস্যাটা আমাদের সিস্টেমের। যাদের কাজ সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়া মানে সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি, আমলা অথবা প্রশাসনের কর্মকর্তারা তারা সাধারণ সুবিধাগুলোকে অসাধারণভাবেই পেতে চান অথবা তাই পেতে পেতেই অভ্যস্ত। আমি সবার কথা বলছি না, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেসস্টাডি এমন তথ্যই দেয়। তাই জনগণের সেবা করতে গিয়ে সাধারণ জনগণ যে অসাধারণ বিড়ম্বনায় পড়েন তা এসব ভিআইপি কালচারের জন্য। বোধকরি উনারা সেটা অনুধাবন করেন না অথবা বেমালুম ভুলে যান। ক্ষেত্র বিশেষে উনাদের গাড়ি আবার রংসাইড দিয়ে যাওয়ার কালচারকেও অনুপ্রাণিত করে।

বেশ কিছুদিন আগে টিভিতে দেখেছিলাম এক সচিবের গাড়ি রং সাইডে যাওয়ায় দায়িত্বরত পুলিশ সেই গাড়ি আটকে দিয়েছিলেন আর আমরা তাকে প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়েছিলাম। হয়তো এই অপসংস্কৃতির চর্চায় তার এই কাজ সত্যিকার অর্থেই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু ওই পুলিশটির পেশাগত কাজই কিন্তু সিস্টেমটাকে শ্রেণি ও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে ঠিক রাখা। তাই এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ স্থান থেকে দায়িত্ব পালনটাই বেশি খুব প্রয়োজনীয়।

গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পারলাম এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। শুধু নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ভিআইপি সুবিধা দিতে শত অনুরোধ সত্ত্বেও রোগীর গাড়িটিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আর এর পরিণতি এক করুণ ও নির্মম মৃত্যু। ৯৯৯-এ কল করেও যেখানে মেলেনি তার কোনো সমাধান। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এই ভিআইপির ক্যাটাগরি ভিন্ন। ক্ষমতার অপব্যবহার যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতিয়ার তখন সাধারণের মৃত্যু তো এক মামুলি ব্যাপার। এজন্য প্রতিনিয়ত বেঁচে থেকেও আমরা মরছি মননে। হায়রে স্বদেশ! এখানে জীবনের দাম খুব কম আর ভিআইপিরা এক একজন ক্ষমতার দাপুটে প্রভু। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব একটি পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ‘মন্ত্রীরা কোনো আলাদা সুবিধা নেন না। তারা একটা প্রটেকশন গাড়ি এবং গানম্যান নেন। তাদের রাস্তা বন্ধ করার নিয়ম নেই। এটা শুধু ভিভিআইপিদের জন্য আছে সেটা এসএসএফ আইন।’

যদি তাই হয়, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ভিআইপি প্রটোকল একটা মানুষের জীবনের দামের থেকে বেশি হয় কী করে? পরিশেষে, এই ভিআইপি কালচারের প্রাকটিস ও এর পুনর্মূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবি। প্রথমত, এর অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং এর জন্য সাধারণ জনগণের যে হয়রানি হচ্ছে, জনগণ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে তা অনুধাবন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস করি যেখানে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার উৎস জনগণ।

সুমনা গুপ্তা : সহকারী অধ্যাপক
ইংরেজি বিভাগ, জাবি