সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট নয়

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট নয়

মঞ্জুরুল আলম পান্না ৯:৪৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০১৯

print
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট নয়

‘আমি মেলা থেকে তাল পাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি...।’ আমাদের ছোটবেলায় পূজার সময় মন্দিরের মাইকগুলোতে যত গান বাজত সেগুলোর মধ্যে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন উদাস করা এই গানটি অনেক বেশি জনপ্রিয়। গানটা এমনিতেই অনেক বেশি স্মৃতি জাগানিয়া, এখন শুনলে আরও বেশি আবেগী আর স্মৃতিকাতর হয়ে উঠি। ছোট্টবেলার সেই দিনগুলোতে, সেই পূজা-পার্বণ কিংবা ঈদ উৎসবে ফিরে যেতে বুকের ভেতরটা কে যেন খামচে ধরে সজোরে।

আমরা ভাই-বোনসহ বন্ধু-বান্ধবরা ঘুরে বেড়াতাম এক মন্দির থেকে আরেক মন্দিরে। গরম পাঁপড় ভাজা খেতে খেতে পূজার মেলা থেকে কিনে আনতাম নানা ধরনের মাটির পুতুল, বেলুন লাগানো প্যাঁ-পু্যঁ বাঁশি, হাওয়াই মিঠাই, আরও কত কী....! তাই নিয়ে কেটে যেত দিনের পর দিন। পূজা এলেই হিন্দু বন্ধুদের বাড়ির নাড়ু খাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকতাম। ঈদে আমার মা বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার বিশেষ আয়োজন করতেন ওদের জন্য। এভাবেই বেড়ে উঠেছি আমরা আমাদের পরিবারে।

হিন্দু-মুসলমানে কোনো বিভেদ ছিল না, পারস্পরিক সদ্ভাব-সম্প্রীতি ছিল আমাদের সংস্কৃতি। এখনো নিশ্চয় তেমনটাই আছে। আমাদের সন্তানরাও সেভাবে বেড়ে উঠছে। এভাবেই দিনের পর দিন হাজার বছর ধরে অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করে আসছে এই ভূখণ্ড, এই বাংলাদেশ।

পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে কাঁধে কাঁধ রেখে যুদ্ধ করতে গিয়ে গড়ে ওঠে অবিনাশী এক স্লোগান ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে হঠাৎ হঠাৎ করেই যে এর ছন্দ পতন ঘটেনি, তা অবশ্য নয়। বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলেছে, এ কথা তো সত্য। ২০০১-এ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতনের চিত্রটা ছিল ভয়াবহ। কিন্তু সব সময়ই কি তেমনটা ঘটছে?

সুযোগ সন্ধানীরা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়েছে, আবার তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এদেশেরই মুসলমানরা সংঘবদ্ধভাবে। সাম্প্রতিক সময়ে রামুর বৌদ্ধবিহার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর কিংবা যশোরের মালোপাড়ায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বড় ধরনের যে হামলাগুলো হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে ছিল রাজনৈতিক ইন্ধন। কোনো অবস্থাতেই তা সাম্প্রদায়িক হামলা নয়। সংবিধানে ইসলামকে যে রাষ্ট্র হিসেবে বসানো হয়েছে সেটিও রাজনৈতিক। শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তার বিরোধিতা করে যাচ্ছেন ক্রমাগত।

কিন্তু ঢালাওভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের জিগির তোলার বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ের একটি তুলনা চিত্র উপস্থাপনের চেষ্টা করা যেতে পারে। ২০১৮ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন বলছে, ওই বছর রাজনৈতিক সংঘাত, বন্দুকযুদ্ধ এবং মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে মোট নিহতের সংখ্যা ৭৯২।

ধর্ষণের বিষয়ে সংগঠনটি বলেছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন। আর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ২০১৮ সালের হিসাবে দেখিয়েছে, সে বছর সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে হত্যার শিকার হয়েছেন ৯০ জন, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা ৪৮টি। আইন ও সালিশ কেন্দ্র নিশ্চয় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাদের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। তাহলে আসকের হিসাব থেকে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাবটা বাদ দিলে নিশ্চয় মুসলিমদের হিসাবটা বেরিয়ে আসে। সেই হিসাবকে তবে মুসলিম নির্যাতন হিসেবে দেখানো হবে? বিষয়টা তো তখন হাস্যকর হয়ে উঠবে।

২০১৬ সালে দিনাজপুরে ৪২ বছরের এক পাষ- ৫ বছরের ফুটফুটে শিশু পূজাকে ধর্ষণের পর নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের মন্তব্য ছিল- ‘পূজার জীবনে যা ঘটল, তা দেখে আমার আশঙ্কা হচ্ছে, অনেক হিন্দু পরিবার তাদের কন্যার নিরাপত্তার কথা ভেবে দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেবে।’ তসলিমা নাসরিনদের দৃষ্টিতে সেটিও না কি সাম্প্রদায়িক নির্যাতন! এখানে যখন আয়শা, তানহা’দের মতো ২-৩ বছরের অসংখ্য মুসলিম শিশুরা রেহাই পায় না ধর্ষকের হাত থেকে সেসব ঘটনাকে তবে কী বলব? হিন্দুদের কেন শুধু ‘হিন্দু’ হিসেবে দেখা হবে? সব ধর্মের মানুষ মিলেই তো আমাদের একক পরিচয়।

১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২২ শতাংশ, ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে ১৪ শতাংশ। ২০১১ সালের সেটা নেমে আসে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে। বিবিএসের জরিপে ২০১৫-তে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১ শতাংশে। টিআইবির একটি গবেষণা বলছে, বিভিন্ন সরকারের সময় সরকারি চাকরিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অংশগ্রহণের হার ওঠা-নামা করলেও গড়ে তা ছিল ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এখন এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদগুলোতে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যায় অবস্থান করছেন সংখ্যালঘুরা।

এরপরও হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মতো কোনো কোনো সংগঠন বা প্রিয়া সাহাদের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে অভিযোগ পৌঁছে যায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের। অন্য যে কোনো সরকারের সময়ের চেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য অনেক ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অথচ সেই সরকারের সময়েই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল ব্যাপকভাবে। এটিই আওয়ামী লীগের দুর্ভাগ্য। আরও মজার বিষয় হচ্ছে যে প্রিয়া সাহা মার্কিন মুল্লুকের অধিপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভয়ানক মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করলেন সেই প্রিয়া সাহাই অনেক বেশি সুবিধা নিয়েছেন এই দেশ এবং সরকারের কাছ থেকে। সুবিধা নিতে নানা ধরনের ভণ্ডামীর আশ্রয়ও নিয়েছেন। ব্যক্তিগত বিরোধের জায়গা থেকে হিন্দু ধর্মের প্রতিপক্ষ মানুষগুলোকে বিপদে ফেলতে নিজের ঘর নিজেই পুড়িয়েছেন। নিজে একটা এনজিও’র মালিক, একটি পত্রিকার সম্পাদক, স্বামী রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে, ভাই জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাস সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে অবসরে গেছেন।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে দু’দিন আগে প্রিয়া সাহাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সংগঠনটি। কিন্তু এতেই সংগঠনটির সব দায় শেষ হয়ে যায় না। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর আয়োজিত ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজক সংগঠন ফ্রিডম হাউজের তালিকার ১৮ নম্বরে নাম রয়েছে প্রিয়া সাহা বিশ্বাসের, যার পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।

কিন্তু এই সংগঠনটির নেতাদের দাবি, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে যে তিনজনের নাম পাঠানো হয়েছিল তাতে ওই মহিলার নাম ছিল না। তাহলে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নালিশ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রধান কার্যালয় ওভাল অফিসে সরাসরি ট্রাম্পের কাছে কী করে পৌঁছান তিনি, তা একটি বড় প্রশ্ন।

বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর সহায়তা ছাড়া কোনো দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে অখ্যাত কোনো ব্যক্তির পক্ষে মার্কিন অধিপতির দফতরে ব্যক্তিগতভাবে কারোর পৌঁছে যাওয়াটা অত সহজ নয়। অবশ্যই এর পেছনে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। সেটা খুঁজে বের করা দরকার। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা কিংবা সরকারকে বিব্রত করা অথবা আন্তর্জাতিকভাবে এই দেশকে নিয়ে আরও গভীর কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে প্রিয়া সাহাদের।

এ ঘটনার পর বাংলাদেশে প্রিয়া সাহা ফিরে আসবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ফিরে না এলেও সরকারি পর্যায়ে ঘটনাটি ভুলে গেলে চলবে না। তার ভূমিকার পেছনের ক্রীড়নকদের খুঁজে বের করাটা সরকারের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের বলে মনে করি।

প্রিয়া সাহার অসত্য, মিথ্যে, বানোয়াট, নির্লজ্জ রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্যকে দেশপ্রেমিক কোনো মানুষই সমর্থন করতে পারেন না। তার প্রমাণ এরই মধ্যে পাওয়া গেছে সারা দেশের মানুষের প্রতিক্রিয়ায়। কিন্তু এটিকে কেন্দ্র করে আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, বাঙালির আবহমানকালের ঐতিহ্য, আমাদের চির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।

মঞ্জুরুল আলম পান্না : সাংবাদিক
monjurpanna777@gmail.com