সংগঠিত হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬

সংগঠিত হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান ৮:১৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০১৯

print
সংগঠিত হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি

ঐক্যফ্রন্ট ছিল তাৎক্ষণিকভাবে গঠিত নির্বাচনী জোট। বিএনপির সমর্থকগোষ্ঠী আছে, কিন্তু তাদের নেতৃত্ব ছিল না। তাদের চেয়ারপারসন জেলে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন বিদেশে। নির্বাচনে জেতার জন্য তাদের একজন নেতার দরকার ছিল। কয়েকজন সাবেক নেতা, সাবেক নেতা এজন্য বলছি, তারা এক সময় নেতা ছিলেন, কিন্তু এখন যাদের কোনো অনুসারী নেই। ঐক্যফ্রন্টের নেতারা এই সুযোগ নিতে চেয়েছিল।

‘পলিটিক্স ইজ দ্য ওয়ে অব উইনিং পাওয়ার’ অর্থাৎ ক্ষমতা পাওয়ার জন্যই পলিটিক্সের বাইরে কেউ যদি বলে আমি একদম আল্লাহর রাস্তায় পলিটিক্স করি, ক্ষমতা চাই না, সেটা ভিন্ন ইস্যু। বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে চায়। তাদের নেতৃত্ব শূন্যতা ছিল। এই দলছুট এবং সাবেকরা কীভাবে আবার ক্ষমতার স্বাদ পেতে পারে, এটার একটা সম্মেলন করছিল জোট গঠনের মাধ্যমে। যেহেতু তারা কোনো আদর্শ মেনে চলে না। তাদের আদর্শে একেবারে চরম বৈপরীত্য। একদিকে কামাল হোসেন সংবাদ সম্মেলন শুরু করেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, আবার এর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জোটের আরেক নেতা সুলতান মনসুর সে মুজিব কোট পরেন। আবার কাদের সিদ্দিকী তার স্ট্যান্ডগুলোকে রেখে জামাত-বিএনপিকে এক করলেন। এই যে টোটাল একটা হযবরল অবস্থা, এইটা না টেকারই কথা এবং এর পরিণতি এখন যা হওয়ার তাই হয়েছে।

নির্বাচনে জিতলে আমরা কী কী করব, আবার নির্বাচনে হারার বিষয়টিও রয়েছে-তখন ঐক্যফ্রন্ট কি করবে, এটার কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। একদিকে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া আবার আরেকদিকে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরবার চেষ্টা, এই দুইটা তো একসঙ্গে হতে পারে না। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু বিরোধী বিপরীত ধারার লোকরাই তো জামায়াত-বিএনপিতে ছিল। সেখানে যদি কয়েকটা লোক আবার মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের কথা সামনে নিয়ে আসে-সেটা হতে পারে না। নির্বাচন পার হলে কী করবে এই জোটটি, এই চিন্তা ভাবনা তখনো তাদের ছিল না। অতএব এটা যা হওয়ার তাই হচ্ছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ স্বৈরশাসক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং স্বৈরশাসক তকমা নিয়েই চলে গেলেন। আমি বলছি এই চলে যাওয়াটা হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষিত হবে। এর রেশ কিন্তু বহুদিন থেকে যাবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান কায়েম করা হলো। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বকালে একেবারে পাকিস্তানিকরণের জন্য যা কিছু দরকার তাই করা হলো। আমাদের ধর্ম নিরপেক্ষতার চেতনা, যেটার ওপর ভিত্তি করে সাম্যের চেতনা-সবকিছুকে মিলিয়ে ধর্মীয় একটা লেবাস নিয়ে আসা হলো। এইটাকেই ধারাবাহিকভাবে আবার বিভিন্নভাবে পীর, মসজিদ এই যে বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় অনুষঙ্গকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রধর্ম হঠকারিতা-এগুলোর জন্য ইতিহাস তাকে একটা প্লাটফর্মে নিয়ে যাবে। জিয়াউর রহমান যে কাজটা আংশিক করেছেন, সেটা পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন কিন্তু এরশাদ করেছেন। এরশাদকে এভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। আর এই যে প্লাটফর্মটা এইটা কিন্তু একই প্লাটফর্ম। এখন কি হালচাল হবে? জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যত রকমের অপশক্তি ছিল, এটা বাম-ডান, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক, চাঁদাভিত্তিক সবগুলো মিলিয়ে এই প্লাটফর্মটা তৈরি করেছিল। আর এই প্লাটফর্মেই কাজী জাফর, মওদুদের মতো লোকগুলোর আসা-যাওয়া। একই ঘটনা এখন ঘটবে।

জাতীয় পার্টি যে দলটা, এইটাও কোনো না কোনোভাবে অবস্থান গ্রহণ করবে। আমার ধারণা আরও অনেক ঘটনা ঘটবে এর মধ্যে। তাদের নর্থ বেঙ্গল বা রংপুরকেন্দ্রিক যে সাপোর্টা আছে, সেটা কোনদিকে যাবে-তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আর মনোজাগতিকভাবে এখনো কিছু লোক সেখানে রয়ে গেছে, যারা আসলে পাকিস্তানি ভাবধারার লোক। তবে এরশাদকে একটা বিষয়ের জন্য বাহবা দিতে হয়। আসলে বাহবা না ঠিক, ক্রেডিট দেওয়া যেতে পারে। জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর ওই গোষ্ঠীর (মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী) সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে থাকার যে প্রচেষ্টাটা ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা অবস্থান নেওয়াতে কিছুটা হলেও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির দিকে অবস্থান তাকে এত দিন ধরে ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা রাজনীতিতে থাকার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে বলে আমি অন্তত বিশ্বাস করি।

এরশাদ যদি আগের প্লাটফর্মটা সমর্থন করে একই অবস্থানে থাকতো, আমরা মুক্তিযুদ্ধের যে অর্জনগুলো ফিরিয়ে আনছি, তা অনেক কঠিন হতো। কারণ এরশাদ সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরশাদ অতীতে যে অপকর্ম করছেন, তা ঢাকা না দেওয়া গেলেও এই বক্তব্যের মাধ্যমে কিছু বেনিফিট, রাজনৈতিক ফায়দা যাকে বলা হয়- সেটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দিকে কিছুটা হলেও আসছে বলে আমার মনে হয়।

বাংলাদেশের বয়স ৪৮ বছর। আমাদের বাংলাদেশের যে লক্ষ্য উদ্দেশ্যটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে, সেই হিসেবে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত কিন্তু এটা বাংলাদেশ ছিল না। পুরো সময়টা পূর্বপাকিস্তানের যে সেটআপটা ছিল, সেই মেন্টালিটির ছিল। এরশাদ যখন শাসনে ছিলেন, ৬৪ জেলার মাঝে ৫৪ জেলার এসপি সামরিক বাহিনীর লোক ছিল। আমি শুধু একটা উদাহরণ দিলাম। আমরা কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে টানা ২০-২২ বছর হ্যাঁ-না ভোট দিয়ে আমাদের গণতন্ত্র চালিয়ে আসছি। আমাদের রাষ্ট্রপতি ক্যান্টনমেন্টে থাকতেন, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী ক্যান্টনমেন্টে থাকতেন।

পাকিস্তান যেভাবে চলছে, আমরা কিন্তু ক্যান্টনমেন্টভিত্তিক সেই ব্যবস্থার মধ্যে ছিলাম। সে হিসেবে আমাদের গণতন্ত্রের বয়স কিন্তু ৫০ বছর না। ওয়ান-ইলেভেনের পরের ঘটনা হচ্ছে, সেখানে যে লোকগুলো সক্রিয় তাদের মুখগুলো দেখলেই বোঝা যায়। জাতি যখন একেবারে বিপন্ন, পেছন থেকে সামরিক শাসকরাই চালাচ্ছিল দুই বছর। তখন দেখা গেছে এই লোকগুলো বিভিন্ন নামে যেমন, সৎ প্রার্থী খুঁজবে, যোগ্যপ্রার্থী আন্দোলন, ট্রুথ কমিশন গঠন করে। এই লোকগুলো যখন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থাকে, তখন এক ধরনের অস্বস্তি অনুভব করে। আর ওই সময় তারা (সামরিক শাসক) মুক্ত ফিল্ড পেয়ে যায়। যতবারই বাংলাদেশে সামরিক শাসন বা কিছু একটা আসছে, ততবারই কিন্তু কিছু লোক স্বস্তিবোধ করছে।

এই লোকগুলোর তালিকা করে দেখানো যাবে। আমি যদি শব্দটা বলি, এই লোকগুলো প্রাণ ফিরে পায় সামরিক শাসন বা ওই ধরনের কিছু এলে। আমাদের গণতন্ত্র চর্চার যে বয়স, সেখান থেকে মাঝখানের এই ২২-২৩ বছর বাদ দিতে হবে। যদি বাদ না দিয়ে বলেন আমাদের গণতন্ত্র ৪০ বছর ৫০ বছরের মধ্যে আসছে, ম্যাচিউরিটি আসছে-আসলে এটা কখনো হয়নি। সেজন্য আমাদের আরও সময় অপেক্ষা করতে হবে। আরেকটা কথা হলো The tradition form of democracy অর্থাৎ গণতন্ত্র ও গণতন্ত্র চর্চার যে রাজনীতি এর সঙ্গে যেসব বিষয় জড়িত ছিল। যেমন-জনসমাবেশ, জনগণকে একত্রিত করা, মিছিল করা, হরতাল-অবরোধ এগুলোর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে নেতিবাচক হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত হরতাল-অবরোধ রাজনীতির নামে এই অঞ্চলের মানুষ যা দেখছে, তাতে কোনোভাবেই এসব হরতাল-অবরোধে মানুষের সাড়া আর পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ নতুন কোনো পন্থা বের করতে হবে, পুরনো পন্থা দিয়ে রাজনীতি আর চলবে না।

সম্পূর্ণ বিরোধী চিন্তা-চেতনার লোকদের ঐক্য ইতিহাসে নতুন কিছু না। ইতিহাসে এ রকম বহু ঘটনা আছে, চরম বৈরী বা পরস্পর একেবারে মুখোমুখি অবস্থানে থাকে। বৈপরীত্য অবস্থানে থেকে পরবর্তীতে একসঙ্গে রাজনীতিতে কাজ করার ঘটনা কিন্তু পৃথিবীতে বিরল না। যদি কেউ মনে করে যে, বিএনপি একটা দল যারা চরম অসংগঠিত হয়ে গেছে বা তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই-এমন ভাবনা ভুল। কারণ বিএনপি একটি প্লাটফর্ম। ১৯৪৭ বা তারও আগ থেকে একটা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী আমাদের রাজনীতিতে ছিল। যারা আমাদের ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্র সংগীত, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ছিল।

৭০ এর নির্বাচনে ২৩.৭৪ শতাংশ লোক ৬ দফার বিরোধিতা করেছিল। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাও করেছিল। এই সব শক্তির লোকের একটা প্লাটফর্ম এই বিএনপি। এখন জেনেটিক্যালি তাদের আওয়ামী লীগের বিপক্ষে থাকতে হবে। অর্থাৎ বিএনপি ইচ্ছা করুক বা না করুক তবুও তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে থাকবেই। বিএনপি অন্য যে কোনো নাম ধারণ করুক, অন্য কেউ নেতৃত্বে আসুক, তারপরও কোনো না কোনোভাবে বিরুদ্ধ শক্তির লোক সেখানে থেকে যাবে, এটাই বাস্তবতা। অর্থাৎ বাঙালির বাঙালিত্বে যত অনুষঙ্গ আছে সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটি শক্তি বাংলাদেশে ছিল।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বিরোধিতাকারীরা ছিল এই বাংলা ভাষা-ভাষিদের মধ্যেই। আমি মনে করি এই বিরুদ্ধ শক্তি মাঝে মধ্যে দুর্বল হয়, কিন্তু হয়তো লুকিয়ে থাকে। তারা আবার শক্তি সঞ্চয় করবে এবং সময়মতো এরা সংগঠিত হবে। এজন্য যারা প্রগতিশীল, বাঙালিত্ব, মুক্তিযুদ্ধ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতি করে, তাদের খুব বেশি স্বস্তিতে থাকার কারণ নেই। কেননা তারা যদি মনে করে, বিরুদ্ধ শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, জোট ভেঙে যাচ্ছে, দল ভেঙে যাচ্ছে বা তাদের নেত্রী তো জেলে আছে, এসব কারণে তারা যদি রিল্যাক্স মুডে চলে, এটা বিরাট ভুল হবে। কারণ এই শক্তিটা হচ্ছে চেতনাগত।

আমরা যতই বলি না কেন, এদের কোনো আদর্শ নেই, আসলে আদর্শ অবশ্যই আছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আদর্শ তাদের আছে। যার জন্য লাখো শহীদ রক্ত দিয়েছেন, যেটা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনা, আমাদের যে সাম্যের রাজনীতি এই সবকিছুর বিরুদ্ধাচারণ করে যারা আছে, আমি মনে করি তাদের সংখ্যা কমেনি। আরো বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুধু রেমিট্যান্স আসেনি, মরু কালচারও আসছে। আমি মনে করি আমাদের বাংলাদেশ সরকারের যত রকমের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার আছে, এর মধ্যে এমনটা হওয়া উচিত যাতে করে আমাদের লোককে কাজ করতে পশ্চাৎপদ কোনো দেশে যেতে না হয়।

আমরা মনে করি কিছু টাকা হয়তো পেয়ে গেলাম। কিন্তু ওই যে পাকিস্তান, ইসলাম, মুসলমান, সৌদি আরব, সাতচল্লিশের পর থেকে এই যে ঘটনা, তা এখনো সক্রিয়। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, অর্থনৈতিক ফ্লো, টাকা পয়সা ইত্যাদিতে তারা শক্তি সঞ্চয় করছে। এরা কখনো দমবে না। তাদের অস্তিত্বের কারণেই তারা এই বিরোধিতা করবে এবং সংগঠিত হবে। এই ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়